২৮ অক্টোবর ২০২১
`

দৃষ্টিশক্তি ও দৃষ্টি সমস্যা শিশুদের বেলায় করণীয়

-

দৃষ্টিশক্তিÑ চোখের মাধ্যমে দেখার বিষয়টি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রথমত আলোকরশ্মি চোখে আপতিত হয়ে রেটিনাতে মিলিত হয়। দ্বিতীয় ধাপে রেটিনাতে আপতিত আলোকরশ্মি এক ধরনের মিথষ্ক্রিয়ার অবতারণা করে। এটিকে বলা হয় ফটোক্যামিকেল রিয়েকশন। ফটোক্যামিকেল রিয়েকশনের ফলে রেটিনার স্নায়ু বা ফটোরিসেপ্টর উজ্জীবিত হয় এবং এক ধরনের ইলেকট্রিকেল সিগনাল (অ্যাকশন পটেনশিয়াল) তৈরি হয়। এই সিগনাল বা অ্যাকশন পটেনশিয়াল অপ্টিক নার্ভ নামক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। সর্বশেষ মস্তিষ্ক এই সিগনালকে বিশ্লেষণ করে বস্তুর ইমেজ বা অবয়ব তৈরি করে। ফলে আমরা দেখতে পারি। কোনো কিছুকে দেখতে পারার এই সক্ষমতাকে বলা হয় দৃষ্টিশক্তি।
দৃষ্টি সমস্যা বা রিফ্রেক্টিভ এররÑ আলোকরশ্মি সর্বদা সমান্তরালে চলে। আলোকরশ্মি যখন চোখে আপতিত হয় তখন প্রথমে কর্ণিয়া এবং পরে চোখের অভ্যন্তরে বিদ্যমান প্রাকৃতিক লেন্সে দিক পরিবর্তন করে রেটিনাতে মিলিত হয়। স্বচ্ছ কোনো মাধ্যমের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় আলোর এই দিক পরিবর্তনকে বলা হয় প্রতিসরণ বা রিফ্রেকশন। কর্ণিয়া ও বিদ্যমান প্রাকৃতিক লেন্সের পৃষ্ঠতলের বক্রতা (কার্বেচার) এবং ঘনত্ব (রিফ্রেক্টিভ ইনডেক্স) মূলত চোখের রিফ্রেকশন এ মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। দৃষ্টি সমস্যা বলতে রিফ্রেকশনে কোনো ধরনের ত্রুটি বা এররকে বোঝায়।
রিফ্রেকশনের ত্রুটি বা এররের কারণে আলোকরশ্মি আপতিত হয়ে রেটিনার উপরে মিলিত না হয়ে সামনে অথবা পেছনে মিলিত হয়। আপতিত আলোকরশ্মি যখন রেটিনাতে মিলিত হয় এটি হলো স্বাভাবিক অবস্থা; সামনে মিলিত হলে মায়োপিয়া এবং পেছনে মিলিত হলে হাইপারমেট্রোপিয়া। মায়োপিয়ারতে মাইনাস পাওয়ারের লেন্স বা চশমা এবং হাইপারমেট্রোপিয়াতে প্লাস পাওয়ারের লেন্স বা চশমা ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়াও এক ধরনের রিফ্রেকটিভ এরর বা ত্রুটি আছে যেখানে কিছু মিলিত বিন্দু রেটিনার সামনে এবং কিছু মিলিত বিন্দু রেটিনার পেছনে থাকে। এই সমস্যাকে বলা হয় এস্টিগমাটিজম। এ ক্ষেত্রে সিলিনড্রিকেল লেন্স ব্যবহার করতে হয়।
পারিবারিক প্রভাব ও জাতী গোত্র ইত্যাদির প্রভাব দৃষ্টি সমস্যায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়াও পরিবেশের প্রভাব যেমনÑ দীর্ঘ সময়ব্যাপী কাছের কাজ যেমন পড়াশোনা, ছবি আঁকা ইত্যাদি শিশুদের ক্ষেত্রে দৃষ্টি সমস্যার কারণ বলে মনে করা হয়। বাইরে খেলাধুলায় সময় ব্যয় করা দৃষ্টিশক্তির জন্য সহায়ক। প্রিমেচুর বেবি বা সময়ের আগেই ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানদের মায়োপিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
দৃষ্টি সমস্যায় লক্ষণ : প্রধান লক্ষণ ঝাঁপসা দেখা। শিশুদের বেলায় স্কুলে বোর্ডের লেখা, টিভির স্ক্রলের লেখা বা স্কোর দেখা, রাস্তার পাশে সাইনবোর্ডে লেখা বা ছবি ঝাঁপসা দেখা; খুব কাছ থেকে টিভি দেখা; পড়তে পড়তে লেখা ঝাঁপসা হয়ে আসা; চোখ ব্যথা বা মাথা ব্যথা বা চোখ জ্বালাপোড়া ইত্যাদি লক্ষণ থেকে অনুমান করা হয়, শিশুর দৃষ্টিসমস্যা থাকতে পারে।
দৃষ্টি পরীক্ষা : দৃষ্টি সমস্যা মনে করলে অবশ্যই দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করতে হবে। বয়স্কদের বেলায় বিষয়টি সহজ হলেও শিশুদের বেলায় বিষয়টি একটু জটিল। কেননা, প্রি-স্কুল শিশুদের অনেকেই পড়তে জানে না। সেই সমস্ত শিশুদের জন্য ছবি বা সাইন সম্বলিত ভিশন চার্ট আছে। শিশুদের রিফ্রেক্টিভ এরর বা দৃষ্টিসমস্যা পরিমাপ করার জন্য অটোরিফ্রেক্টোমিটারের চেয়ে রেটিনোস্কোপি অধিকতর উপযোগী। পাঁচ-ছয় বছরের নিচে শিশু বা যাদের ট্যারা চোখের সমস্যা বা হাইপারমেট্রোপিয়ার সমস্যা তাদের ক্ষেত্রে সাইক্লোপ্লেজিক রিফ্রেকশন প্রয়োজন।
সাইক্লোপ্লেজিক রিফ্রেকশনÑ
০.১ শতাংশ এট্রোপিন ড্রপ এক ফোটা করে দিনে তিন বার তিন দিন দুই চোখে দিয়ে চতুর্থ দিন রিফ্রেকশন বা দৃষ্টি সমস্যা পরিমাপ করা হয়। একবার চোখে এট্রোপিন ড্রপ দিলে তিন সপ্তাহ এর অ্যাকশন থাকে বিধায় তিন সপ্তাহ পর চশমা দিতে হয়। এই সময়টিতে স্বাভাবিক দেখা বিশেষ করে কাছের দেখা বিঘিœত হয়। ফলে সাইক্লোপ্লেজিক রিফ্রেকশনের জন্য ছুটির সময়টি বেছে নিতে পারলে ভালো। সাক্লোপ্লেজিক রিফ্রেকশনে ব্যবহৃত এট্রোপিনের কারণে অনেক সময় শিশুর হালকা উপসর্গ যেমনÑ জ্বর, মুখে ও গলায় শুষ্কভাব ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। হালকা জ্বরের জন্য সাময়িক একটু পেরাসিটামল সিরাপ দিয়ে জ্বর নিয়ন্ত্রণ করলেই পরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
দৃষ্টি সমস্যা থাকলে ছোট-বড় সবারই উচিত চশমা ব্যবহার করা। বিষয়টি শিশুদের বেলায় অধিকতর জরুরি। কারণ শিশুদের দৃষ্টি সমস্যায় চশমা ব্যবহার না করলে অনেক সময় এমব্লায়োপিয়া বা স্থায়ী দৃষ্টি সমস্যা এবং ট্যারা চোখ বা স্কুইন্টের মতো দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশুদের বেলায় এসব দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে উত্তম দৃষ্টিসমস্যা শনাক্ত হলে সাথে সাথে চশমা ব্যবহার শুরু করা এবং ৬ থেকে ১২ মাস অন্তর নিয়মিত দৃষ্টি পরীক্ষা করিয়ে নেয়া।
লেখক : এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমএস (চক্ষু)
প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল এবং কনসাল্টেন্ট আইডিয়াল আই কেয়ার সেন্টার , ৩৮/৩-৪, রিং রোড, আদাবর, ঢাকা, ফোন : ০১৯২০৯৬২৫১২



আরো সংবাদ