০৯ মার্চ ২০২১
`

নিরাপদ মাতৃত্ব মায়ের অধিকার

-

শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। একজন সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং সন্তানটিকে লালন পালন, শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা মায়ের দায়িত্ব।
সন্তান জন্মদানে মায়ের অনেক অসুবিধা বা জটিলতা দেখা দিতে পারে, এগুলোর চিকিৎসা যা সঠিক সময় ব্যবস্থা নেয়া পরিবারের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।
বাংলাদেশে এখন বছরে ৭৩০০ মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে জটিলতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। উন্নত দেশগুলোয় এমনকি শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেখানে প্রায় শতভাগ মানুষ শিক্ষিত ও ৯৮ ভাগ মায়ের সন্তান প্রসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে হাসপাতালে, দক্ষ প্রসবকারী এমনকি বিশেষজ্ঞ হাতে, তাই সেখানে মাতৃমৃত্যু অনেক কম।
আামাদের দেশ গত দশ বছর অনেক এগিয়েছে তবে এখনো ৬৮ শতাংশ ডেলিভারি হচ্ছে অদক্ষ প্রসবকারীর হাতে এবং বেশির ভাগ গ্রামের ঘরে ঘরে। এই অবস্থান থেকে আমরা কিভাবে বেড়িয়ে আসতে পারি।
সমাজের প্রতিটি মানুষের সচেতনতাÑ মাতৃমৃত্যুর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে কিছু ধারণা দিতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সচেতনতাই পারে এই অবস্থার উত্তরণের। গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারেন। সেখানে প্রসবকারীকে হাসপাতালে নেয়া, গাড়ির ব্যবস্থা করা, প্রয়োজন মতো টাকা-পয়সার জোগান দেয়া, রক্তদাতার সন্ধান ও ব্যবস্থা করা। নিরাপদ মাতৃত্বের লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন করে। এবারো তা পালিত হতে যাচ্ছে।

হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ব্যবস্থা : ২০১৫ সালের মধ্যে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব যদি ৫০ শতাংশ ডেলিভারি হাসপাতালে করানো যায়। হাসপাতালের সংখ্যা, বিছানা বাড়ানো, সার্বক্ষণিক ডাক্তার বা নার্সের ব্যবস্থা ওষুধপত্রসহকারে জরুরি প্রসূতিসেবা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়িতে দক্ষ প্রসবকারীর হাতে নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা করতে হবে। এ লক্ষ্যে সিএসবি এদের ট্রেনিং দেয়া হয়েছে, যদিও এদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনা অর্ধেক (দেশে ১৪ হাজার লাগবে আছে সাত হাজার) সরকারি ও বেসরকারি সিএসবিএ’রা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রসবসেবা দিবেন এদের প্রধানত কাজ।
গর্ভবতীর সেবা দেয়া।
নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা করা।
প্রসব পরবর্তী সেবা ও নবজাতকের সেবা দেয়া।
পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেয়া।
যেকোনো জটিলতায় রেফার করা।
ঘরে ঘরে গিয়ে, আলাপ আলোচনায় এবং উঠান বৈঠকের মধ্যে বিস্তারিত জানাবেন, সমাজের প্রাপ্ত বয়স্কদের স্বাস্থ্যজ্ঞান দিবেন। প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীর মোবাইল নম্বর প্রয়োজনের জন্য সযতেœ রেখে দিতে হবে যা বিপদের সময় কাজে লাগবে।

মাতৃমৃত্যুর কারণ : আমাদের দেশে যেসব কারণে মা মারা যান সেই কারণগুলো হচ্ছেÑ
রক্তক্ষরণÑ প্রসবের পর অধিক রক্তক্ষরণ ৩১ শতাংশ মা মৃত্যুবরণ করেনÑ সন্তান জন্মের পর স্বাভাবিক নিয়মে জরায়ু বা ইউটেরাস সঙ্কুচিত হয়। যদি কোনো কারণে শিথিল থাকে সঙ্কুচিত হতে পারে না বা গর্ভফুলের অংশ ভেতরে থেকে যায় তবে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। যদি ৫০০ মিলি এর অধিক রক্তক্ষরণ হয় তবে তাকে আমরা পিপিএইচ বা প্রসব-পরপবর্তী রক্তক্ষরণ বলি। এ ছাড়া যোনিপথে আঘাত বা ছেঁড়ার কারণেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। মায়ের রক্তক্ষরণ সম্পর্কিত রোগ জন্ডিস, ডেঙ্গুজ্বর যেখানে রক্ত জমাট বাঁধে না ইত্যাদি কারণ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থায় জরায়ু শিথিলতার প্রতিরোধ হিসেবে প্রসবের পরপরই মাকে দুটি ইনজেকশন অক্সিটোসিন (১০ ইউনিট) মাংসে দিতে হবে (আইএম) যদি ইনজেকশনের ব্যবস্থা না থাকে দুটি মিজোপ্রস্টল বড়ি (৪০০ মি: গ্রা:) মুখে খাওয়ানো যেতে পারে। বাংলাদেশে প্রতিটি প্রসবের পরে যাতে এই রকম ব্যবস্থা নেয়া যায় সেই লক্ষ্যমাত্রায় আমাদের এগোতে হবে।
খিঁচুনি বা একলাম্পশিয়া : এটি মাতৃমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ, রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে মায়ের খিঁচুনি হয়, নানারকম জটিলতা, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, কিডনি ফেইলিওর, জন্ডিস, লিভার ফেইলিওর, প্রভৃতি হয়ে মায়ের মৃত্যু হতে পারে। গর্ভবতীর চেকআপ (কমপক্ষে ৪ বার) রক্তচাপ ১৪০-৯০ এর বেশি হলে তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে বা হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। রক্তচাপ ১৬০-১১০ যাকে আমরা সিভিয়ার প্রি-একলাম্পশিয়া বলি। সেখানে অবশ্যই মাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। এই সময় বা খিঁচুনি দেখা দিলে ইনজেকশন ম্যাগনেশিয়াম সালফেট একটি ভালো ওষুধ যা মাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারে।
বাধাপ্রাপ্ত প্রসব বা বিলম্বিত প্রসব : আগে পানি ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি খারাপ লক্ষণ। ১২ ঘণ্টার বেশি প্রসব ব্যথা থাকলে তাড়াতাড়ি মাকে হাসপাতালে নিতে হবে। না হলে গর্ভবতী ও গর্ভস্থ শিশু উভয়েরই বিপদ এমনকি মৃত্যু হতে পারে।
অপারেশন সংক্রান্ত জটিলতা : ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত এবরশন ও এবরশন পরবর্তী ইনফেকশন মায়ের মৃত্যুও কিছু কারণ হতে দেখা যায়। এগুলো যাতে না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য মেডিক্যাল রোগ যাতে গর্ভবতীর ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়, ভালো হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যান্য কারণ : প্রতিটি গর্ববতীকে রেজিস্ট্রেশন করে চেকআপের ব্যবস্থা, নিরাপদ ও প্রসবোত্তর সেবার সাথে জরুরি প্রসূতিসেবা দিয়ে একমাত্র মাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। সন্তান নেয়া বা না নেয়ার মতামত নারীকে অর্জন করতে হবে। স্বামী ও শাশুড়ির কথায় বারবার সন্তান নিতে হবে এমনটি হতে পারে না। নারীর ভালোর জন্য প্রতিটি মেয়েকে শিক্ষিত হয়ে নিজ ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
সংসারের সুখের জন্য ছোট পরিবার গড়ে তুলতে চাইলে ১টি বা ২টি সন্তান নিলেই যথেষ্ট। যাদের ঘন ঘন সন্তান হয় তাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটে, রক্তশূন্যতা থাকেÑ ঘন ঘন সন্তান নেয়ার কারণে গর্ভ ও প্রসবজনিত জটিলতা বেশি হয়। জরায়ু মুখের ক্যান্সার, জরায়ু নেমে যাওয়া, ইনফেকশন, প্রসবের বিভিন্ন রোগ ও স্ত্রীরোগ বেশি হতে দেখা যায়।
কম সন্তান, সুস্থ মা ও স্স্থু শিশু এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। সংসার গোছানো, স্বামীকে বেশি সঙ্গ দেয়া এমনকি সমাজের আরো ১০টি কাজ করা সব কিছুই সম্ভব যদি ছোট পরিবার বা সুখী পরিবার থাকে তবেই।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (সাবেক), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড মিটফোর্ড হাসাপতাল, ঢাকা।



আরো সংবাদ