০৬ এপ্রিল ২০২০

চোখের ছানি পড়া রোগ ও এর আধুনিক চিকিৎসা

-

ছানি পড়া রোগ কী?
আমাদের চোখে স্বচ্ছ একটি লেন্স বা দর্পণ রয়েছে। যার ভেতর দিয়ে আলো গিয়ে চোখের পেছনের রেটিনায় বা দৃষ্টি সংবেদনশীল অংশে গিয়ে পড়ে এবং দৃষ্টির অনুভূতি তৈরি হয়।
কাচ যেমন অস্বচ্ছ হয়ে গেলে আর কাচের ভেতর দিয়ে কোনো কিছু দেখা যায় না, তেমনি চোখের লেন্স যদি অস্বচ্ছ হয়ে যায়, চোখের দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। ছানি রোগ হলো আমাদের দেশের রিভারসিবল বা নিবারণযোগ্য অন্ধত্বের প্রধান কারণ।
ছানি রোগ কেন হয়?
বয়সজনিত লেন্সের গঠন গত পরিবর্তন হলো ছানি রোগের প্রধান কারণ। এ ছাড়াও চোখের আঘাত, ঘনঘন চোখের প্রদাহ, অপুষ্টি, অনিয়ন্ত্রিত স্টেরইড বা হরমোন থেরাপি, ধূমপান ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন কারণেও ছানি রোগ হতে পারে।
কোন বয়সে ছানি রোগ হয়?
সাধারণত বয়স্ক লোকের চোখে ছানি পড়ে। তবে উপরোল্লিখিত কারণে যেকোনো বয়সে ছানি রোগ হতে পারে। পারিবারিকভাবে ছানি রোগের ইতিহাস থাকলে এবং গর্ভাবস্থায় টর্চ (ঞড়ৎপযব) জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে জন্মগত ছানি নিয়েও শিশুর জন্ম হতে পারে।
ছানি রোগের লক্ষণ কী?
ধীরে ধীরে দৃষ্টিক্ষমতা লোপ পাওয়া, চশমার পাওয়ার পরিবর্তন হওয়া, আলোর চার দিকে রঙধনু দেখা, একটি জিনিসকে দুই বা ততোধিক দেখা, দৃষ্টি সীমানায় কালো দাগ দেখা, আলোতে চোখ বন্ধ হয়ে আসা প্রভৃতি ছানি রোগের লক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়াও পুরনো ছানি পেকে চোখে ব্যথা বেদনা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ছানি রোগের কারণে চোখ টেরা হয়ে যেতে পারে।
ছানি রোগ প্রতিরোধে করণীয়
যেহেতু বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে ছানি রোগ হয়, সেহেতু বয়সজনিত ছানি রোগ প্রতিরোধে তেমন কিছু করার নেই। তবে নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রিত, চোখের প্রদাহের ত্বরিত চিকিৎসা, অনিয়ন্ত্রিত হরমোন জাতীয় ওষুধ ও ধূমপান বর্জনের মাধ্যমে ছানি রোগের সম্ভাবনা কমিয়ে আনা সম্ভব।
ছানি রোগের চিকিৎসা
মনে রাখতে হবে, কোনো ওষুধ সেবনে ছানি রোগের প্রতিকার হয় না। শুধু অপারেশনের মাধ্যমে ছানি অপসারণ করতে হয়।
সবচেয়ে যেটা আশার কথা, ছানি পড়া ছাড়া চোখে যদি আর কোনো সমস্যা না থাকে (বিশেষ করে রেটিনা ও ভিট্রিয়াসে) তা হলে অপারেশনের মাধ্যমে আবার আগের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ছানি অপসারণের পর কৃত্রিম লেন্স সংযোজন করা হয়; যা আগের স্বচ্ছ লেন্সের মতোই কার্যকর। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে ছানি অপারেশন এখন অনেক কম সময়ে এবং সেলাইবিহীন উপায়ে করা সম্ভব। এর একটি হলো স্মল ইনসিশন ছানি অপারেশন যা (এসআইসিএস) নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে মাত্র পাঁচ-ছয় মিলিমিটার কেটে, তার ভেতর দিয়ে ছানি অপসারণ এবং কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়। আরেকটি হলো ফ্যাকো ইমালসিফিকেশন টেকনিক। এটি আরো আধুনিক প্রক্রিয়া, যাতে আরো অল্প কেটে তার মাধ্যমে ফ্যাকো মেশিন ব্যবহার করে ছানি অপসারণ ও কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। ফ্যাকো সার্জারির সুবিধা হলো, রোগী অনেক তাড়াতাড়ি অপারেশন, পরে তার স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে পারে এবং অপারেশনের পর চশমার পাওয়ার পরিবর্তন অনেক কম হয়।
পরিশেষে বলতে হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সাত লাখ লোক অন্ধত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ছানিজনিত কারণে দৃষ্টিহীন। ছানি রোগ এবং এর চিকিৎসাবিষয়ক সম্যক জ্ঞানের অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব, চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাই হলো এর মূল কারণ। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই অন্ধত্ব নিবারণ সম্ভব।
লেখক : চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।


আরো সংবাদ