০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

জিনেদিন জিদান : 'পারফেক্ট ম্যাজিশিয়ান'

জিনেদিন জিদান : 'পারফেক্ট ম্যাজিশিয়ান' - ছবি : সংগ্রহ

ফুটবল বিশ্বে কিংবদন্তির অভাব নেই। তবে আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? মাথায় প্রথমে দুটিই নাম আসবে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে এবং আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো মারাডোনা। দুজনের মধ্যে কে সেরা তা নিয়ে বিতর্ক লেগেই রয়েছে। পেলে-মারাডোনার পর ফুটবল বিশ্ব যখন আর এক কিংবদন্তির জন্য অপেক্ষা করছিল ঠিক তখনই ফুটবলের ইতিহাসে আবির্ভাব হয় এক 'পারফেক্ট ম্যাজিশিয়ানের'- জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান।

ফুটবলের জন্ম চীনে হলেও বিশ্বকাপ ফুটবলের ধারণাটা কিন্তু আসে একজন ফরাসির মাথা থেকে। তবে টানা ১৫টি আসর কেটে গেলেও বিশ্বকাপের স্বাদ পাচ্ছিল না ফরাসিরা। অবশেষে সেই স্বপ্নপূরণ হয় ১৯৯৮ সালে। আর এই জয়ের নেপথ্যে যার ভূমিকা অপরিসীম, তিনি আর কেউ নন, 'পারফেক্ট ম্যাজিশিয়ান' জিদান।

১৯৭২ সালের ২৩ জুন ফ্রান্সের মার্শেই শহরে জন্মগ্রহণ করেন জিদান। তিনি আসলে ছিলেন আলজেরিয়া বংশোদ্ভূত। জিদানের পরিবার আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্স চলে আসে। তারা ছিলেন অভিবাসী। প্রথমে জিদানের আলজেরিয়ার হয়ে ফুটবল খেলার কথা থাকলেও দলে নেয়া হয়নি তাকে। তার কারণ জিদান নাকি যথেষ্ট গতিসম্পন্ন ছিলেন না।

ছোটো বেলা থেকেই ফুটবলই তার প্রাণ। মাত্র ১০ বছর বয়সেই মার্শেইর ইউএস সেন্ট হেনরি ক্লাবের জুনিয়র দলের হয়ে তার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়। তারপর অনেকগুলো ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলার সুযোগ পান। ১৯৯৪ সালের ১৭ আগস্ট ফ্রান্সের হয়ে চেক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিষেক ঘটে জিদানের। এরপর প্রায় দেড় দশক দেশের জার্সি গায়ে মাঝমাঠে রাজত্ব করেছেন তিনি। ১৯৯৮ ও ২০০৬ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স। আর দু'বারই দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন জিদান। ৯৮-বিশ্বকাপের ফাইনালে তার দুটি হেডারের সুবাদে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারায় ফ্রান্স এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বাদ পায় ফ্রান্স। ২০০০ সালে ফ্রান্সকে ইউরোপ সেরার মুকুট এনে দেয়ার অন্যতম কারিগরও ছিলেন তিনি। ইউরোতে টুর্নামেন্ট সেরা হন জিদানই।

১৯৯৬ সালে জিদান তিন মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফি'র মাধ্যমে যোগ দেন জুভেন্তাসে। ১৯৯৬-৯৭ ও ১৯৯৭-৯৮ পরপর দুই সিজনে সিরি এ জিতেন তিনি। ১৯৯৬-৯৭ সিজনে সিরি এ-এর সেরা বিদেশী খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন জিদান। ২০০১ সালে ইতালি ছেড়ে স্পেনে আসেন তিনি। তখনকার রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি'র বিনিময়ে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে ৫ বছরে তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, লা-লীগাসহ ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ও উয়েফা সুপার কাপ জিতেছিলেন।

ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে জিদান একটি যুগ। তাকে ছাড়া ফ্রান্সের ফুটবল অপূর্ণ। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি অসংখ্য একক পুরস্কার পেয়েছেন, তন্মধ্যে রয়েছে ১৯৯৮, ২০০০, ও ২০০৩ সালে ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় এবং ১৯৯৮ সালে ব্যালন ডি'অর, ১৯৯৬ সালে তিনি বর্ষসেরা লিগ ওয়ান খেলোয়াড়, ২০০১ সালে বর্ষসেরা সিরি এ ফুটবলার, এবং ২০০২ সালে লা লিগা সেরা বিদেশী খেলোয়াড় হিসেবে ভোটে নির্বাচিত হন।

২০০৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের আমন্ত্রণে বাংলাদেশেও এসেছিলেন ফুটবল বিশ্বের নক্ষত্র জিনেদিন জিদান। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তরুণ ফুটবলারদের সাথে ফুটবলও খেলেন জিদান।

ফুটবল থেকে অবসর গ্রহণের পর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িত রাখেন জিদান। পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হবার অনেক ইচ্ছা ছিল তার। তাই কোচ হবার জন্য কোচিংয়ের উপর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ২০১৩-১৪ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩-১৪ মৌসুমে কার্লো আনচেলত্তির সহকারী হিসেবে মাদ্রিদের লা ডেসিমার সাক্ষী ছিলেন জিদান। পরের সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ কোন ট্রফি না পাওয়ায় কার্লো আনচেলত্তিকে স্যাক করা হয় এবং রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হন রাফা বেনিতেজ। রিয়াল মাদ্রিদের বাজে পার্ফমেন্সের জন্য অর্ধেক মৌসুমে রাফা বেনিতেজকেও স্যাক করা হয় এবং জিদানকে মাদ্রিদের কোচের দায়িত্ব দেয়া হয়।

প্রথম ধাপে মাত্র আড়াই বছর রিয়াল মাদ্রিদের কোচিং এর দায়িত্ব পালন করে ৩১-০৫-২০১৮ রিয়াল মাদ্রিদের কোচের পদ থেকে সরে দাড়ান। মাত্র আড়াই বছর কোচিং করিয়ে যে কোন কোচের চেয়ে সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয় করার রেকর্ড গড়েন। গড়েছেন টানা ৩ বার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা জয়ের রেকর্ড! এছাড়াও লা-লীগায় টানা ১৬ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড করেন যৌথভাবে। স্প্যানিশ টিম হিসেবে গড়েন টানা ৪০ ম্যাচ আনবিটেন থাকার রেকর্ড! করেছেন টানা ৭৩ ম্যাচে স্কোর করার রেকর্ড! রিয়ালের হয়ে প্রথম ধপায় ৯টি শিরোপা জয় করেন :

* ৩টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ
* ২টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ
* ২টি উয়েফা সুপার কাপ
* ১টি লা-লীগা
* ১টি স্প্যানিশ সুপার কাপ
* ২০১৭ সালের বেস্ট কোচও নির্বাচিত হন জিদান!

২০১৯-এ ফের দ্বিতীয় ধপায় রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেন জিদান, একটি লা-লীগা এবং একটি স্প্যানিশ সুপার কাপ জয় করেন। জিদান রিয়াল মাদ্রিদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১১টি) শিরোপা জয়ী কোচ। ২০২১-এ রিয়াল মাদ্রিদের কোচের দায়িত্ব ছেড়ে এখন একধরনের অবসর সময়ই কাটাচ্ছেন জিদান।

ফুটবল বিধাতা তাকে দিয়েছেন দু'হাত ভরে! খেলোয়াড় বা কোচ- উভয় ক্ষেত্রেই!

শুভ জন্মদিন জিনেদিন জিদান, ফুটবল প্রেমীদের প্রিয় জিজু।


আরো সংবাদ


premium cement