১৮ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১, ১১ মহররম ১৪৪৬
`

বাংলা ব্লকেডে অচল সারা দেশ

সড়কের পাশাপাশি কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা রেলপথও অবরোধ করেন। এতে গতকাল সারা দেশে রেল চলাচল কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিল : নয়া দিগন্ত -

- আজও ৩টা-৬টা বাংলা ব্লকেড
- সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল ঢাকা
- সাড়ে ৫ ঘণ্টা বন্ধ রেল যোগাযোগ

সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল রায়ের বিরুদ্ধে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিতে গতকাল অচল হয়ে পড়ে সারা দেশ। সব জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকে মূলত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাজধানী ঢাকা। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় থমকে যায় রাজধানী। পদে পদে মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। ব্লকেডে প্রথমবারের মতো সাড়ে ৫ ঘণ্টা বন্ধ থাকে রেল যোগাযোগ। মেট্্েরারেল চালু থাকায় সেখানেও চরম ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা। হিমশিম থেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল রায়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এই বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বলেন, সরকারি নির্বাহী বিভাগ থেকে আশ্বাস পেলে রাজ পথ ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যাবো। ২০১৮ সালের পরিপত্র ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ কমিশন গঠনের মাধ্যমে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক মাত্রায় কোটা রেখে অন্য সব কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করতে হবে। শুধু পরিপত্র জারির মধ্যেই আমাদের দাবি সীমাবদ্ধ নয়। সে সাথে কোটাসংস্কারপূর্বক সংসদে আইন পাস করে দাবির বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবারও সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করবেন শিক্ষার্থীরা। এ দিন বেলা সাড়ে ৩টা থেকে এই কর্মসূচি শুরু হবে। এবারো সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করা হবে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শাহবাগ মোড় থেকে অবরোধ তুলে নেয়ার আগে কর্মসূচি ঘোষণা করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, আজ বেলা সাড়ে ৩টা থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি পালিত হবে। সারা দেশে সড়ক ও রেলপথে আমাদের শিক্ষার্থীরা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হবেন এবং সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এসে শাহবাগ ব্লকেড করবেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা কোটাহীন মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র অর্জন করেছি। কিন্তু গত ৫ জুন আমাদের সেই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। তার পর থেকে আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেতে আমরা আন্দোলন করছি। আমাদের কর্মসূচিকে অনেকে জনদুর্ভোগের কারণ বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু আমাদের এই আন্দোলন সবার অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

সাড়ে ৫ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ : কোটা বিরোধী আন্দোলনে গতকাল রেল যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিলো। এতে রেলের যাত্রীরা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থানে রেললাইন অবরোধ করলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
কোটাবিরোধী আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ ছাড়িয়ে এখন পুরো রাজধানীকে অচল করে তুলেছে। গতকাল বুধবার তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে রেললাইন অবরোধ। রেললাইন অবরোধের কারণে পুরো দেশের সাথে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গতকাল। কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর কাওরানবাজার ও মহাখালী আমতলী রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টায় শিক্ষার্থীরা রেললাইনে অবস্থান নেয়। এতে কমলাপুর থেকে কোন ট্রেন ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি এবং কমলাপুরেও কোনো ট্রেন আসেনি।
কমলাপুর রেলের স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা ২০ পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে ৫টা ২০ মিনিটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ সময় ৬টা ট্রেন আটকা পড়ে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা রেললাইন থেকে অবরোধ তুলে নেয়ায় বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। এখন আর কোনো সমস্যা নেই। নির্বিঘেœ ট্রেন চলাচল করতে পারছে।

নির্বাহী বিভাগ আশ্বাস দিলে টেবিলে ফিরবো
ঢাবি প্রতিনিধি জানান, কোটাবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বলেছেন, সরকারি নির্বাহী বিভাগ থেকে আশ্বাস পেলে রাজপথ ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যাবো। ২০১৮ সালের পরিপত্র ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ কমিশন গঠনের মাধ্যমে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক মাত্রায় কোটা রেখে অন্য সব কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করতে হবে। শুধু পরিপত্র জারির মধ্যেই আমাদের দাবি সীমাবদ্ধ নয়। সে সাথে কোটা সংস্কারপূর্বক সংসদে আইন পাস করে দাবির বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল শাহবাগে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। দিনব্যাপী এই ব্লকেড কর্মসূচিতে ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, বাংলা মোটর, আগারগাঁও, গুলিস্তান, পল্টন, কাঁটাবন মোড়, কাকরাইল মোড়, মৎস্য ভবন এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। অবরোধকালীন সম্পূর্ণরূপে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা শুরু করে। যদিও অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নির্বিঘেœ জায়গা করে দেয় শিক্ষার্থীরা।
কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীর অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্রটি গত ৫ জুন উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করে কোটা পুনর্বহালে রায় দিয়েছেন। সেটির বিপক্ষে আপিল করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। আজকে সেটির শুনানি ছিল। শুনানি আবার পেছানো হয়েছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে মনে করছি, পরবর্তী শুনানিতে গত ৫ জুনের রায়টি আবার যদি স্থগিত করা হয়, অথবা আঠারোর পরিপত্রতে পুনর্বহালে আমরা সন্তুষ্ট হবো না। আগের পরিপত্রটি উঠিয়ে নিয়ে নির্বাহী বিভাগের কমিশন গঠনের মাধ্যমে নতুন করে ত্রুটিহীন পরিপত্র জারি করতে হবে। শুধু পরিপত্র নয় সংসদে আইন পাস করার মাধ্যমে দাবির বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমরা বৈষম্যবিরোধী এক দফা দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলনটি করছি। কোটা প্রথা শুধু প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীতে নয়, তৃতীয় এবং চতুর্থসহ সরকারি চাকরির সব গ্রেড পর্যন্ত অনগ্রসরদের জন্য যৌক্তিক মাত্রায় কোটা রেখে অন্য সব কোটা বাতিল করতে হবে।
সারজিস আলম বলেন, ২০১৮ সালের যে পরিপত্রে কোনো কোটা নেই। সংবিধান অনুযায়ী যারা অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী তাদের জন্য একটু সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী আমরা তাদের এখনো অনগ্রসরের কাতারে মনে করি। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কয়েকজন সদস্য রিট করার পর ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ হয়ে যায়। এখন বাকি যে দুইটি জনগোষ্ঠী রয়েছে এদের মধ্যে কেউ রিট করবে না বা রিট করলে মহামান্য হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমার দাবি, সরকারকে দ্রততম সময়ের মধ্যে কোটা সংস্কারের আশ্বাস দিতে হবে। সরকারের নির্বাহী বিভাগ কোটা কমিশন গঠন করে কোটার যৌক্তিক সংস্করণ করতে হবে। সেটি ৫ শতাংশের বেশি প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি না। এটা সরকারের নীতিগত সিন্ধান্ত। আমরা চাই পরিপত্র পরিপত্র খেলা বন্ধ করে সংসদেও আইন পাস করার মাধ্যমে আমাদের দাবির বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জাহাঙ্গীরনগর বিশবিদ্যারয়ের প্রধান ফটকে (ডেইরি গেট) গতকাল অবস্থান নিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোটা সংস্কারের দাবিতে অবরোধ করে রাখে আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচির কারণে ব্যস্ততম মহাসড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা কোটা না মেধা, মেধা মেধা, আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম- এসব স্লোগান দেন। শিক্ষার্থীদের অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ব্যস্ততম মহাসড়কে যাতায়াতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। তবে রোগী বহনকারী গাড়ি ও জরুরি সেবার গাড়ি ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কোটা সংস্কার আন্দোলনের সদস্যসচিব মাহফুজ ইসলাম মেঘ নয়া দিগন্তকে জানান, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে কোটা আইন পাস করতে হবে। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, সংবিধানে উল্লেখিত অনগ্রসর গোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫% কোটা রেখে মেধায় সরকারি চাকরির সব গ্রেডে ৯৫% চাকরির কোটা থাকবে। আমাদের আন্দোলন আদালতের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। জাতীয় সংসদে ৫% কোটা রেখে মেধায় সরকারি চাকরির সব গ্রেডে ৯৫% চাকরির কোটা আইন পাস করলে আমরা কেবল আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াব। তা না হলে আমাদের আন্দোলন চলবেই।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালসহ চার দফা দাবিতে গতকাল বুধবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার মোড়, টাইগারপাস ও দেওয়ানহাট রেল লাইনের উপর অবস্থান নেন। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের গণজোয়ার নামে রাস্তায়। প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, বই-খাতা নিয়ে স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ কম্পিত হয়ে ওঠে। দুপুরে কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলন প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগর এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা সোয়া ১টার দিকে নগরীর লালখান বাজার-টাইগারপাস সড়কে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে, বেলা সাড়ে ১১টায় দেওয়ানহাট রেললাইন অবরোধ করেন তারা। টাইগারপাস সড়ক অবরোধের কারণে নগরীর লালখান বাজার, দেওয়ানহাট, আমতল ও নিউমার্কেট সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কোনো উপায় না পেয়ে অনেক চালককে গাড়ি ঘুরিয়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া অনেক যাত্রীকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যেতে দেখা গেছে। এ সময় পুলিশের গাড়িকেও আটকাতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের।
এ দিকে আন্দোলনকারীদের বাধার ফলে তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন চট্টগ্রামে আটকা পড়ে। তার মধ্যে দু’টি চট্টগ্রামগামী ট্রেন রয়েছে, একটি কক্সবাজারগামী। বুধবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস পাহাড়তলী স্টেশনে ও ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ফৌজদারহাট স্টেশনে আটকে থাকে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম স্টেশনে আটকা পড়ে।

খুলনা ব্যুরো জানায়, বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির অংশ হিসেবে খুলনায় গতকাল শিক্ষার্থীরা রাজপথ-রেলপথ অবরোধ করেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে কোটা সংস্কার বাস্তবায়নে নগরীর সাচিবুনিয়া বিশ্বরোড মোড়ে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে রূপসা ব্রিজের দিকে যায়। তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত এ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। এর আগে সকাল সোয়া ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীর খালিশপুর নতুন রাস্তা মোড়ে খুলনা সরকারি বিএল কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। এ সময় নতুন রাস্তা মোড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ছাত্রদের অবরোধের মুখে পড়ে যশোরগামী একটি ট্রেন।
রাবি প্রতিনিধি জানান, কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। এ সময় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেন।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।
এর আগে, বেলা ১১টার দিকে সব হল থেকে প্যারিস রোডে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। পরে এক বিশাল মিছিল নিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। এ সময় রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সব যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।
বাকৃবি প্রতিনিধি জানান, সরকারি চাকরিতে কোটা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেছে আপিল বিভাগ। এই রায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যমূলক সর্বপ্রকার কোটা প্রত্যাহারের এক দফা দাবিতে গতকাল চতুর্থ দিনের মতো চলমান ট্রেন থামিয়ে আন্দোলন করছেন বাকৃবি শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন চলাকালীন রায় স্থগিতের ওই সিদ্ধান্ত প্রচারিত হলে ওই রেললাইনের উপরেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে ইরান মিয়া জানান, সংসদে আইন পাস করে সরকরি চাকরির সব গ্রেডে শুধু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে সবধরনের বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করতে হবে। এই দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কার্যক্রম চলবে। রায় স্থগিত করে শিক্ষার্থীদের ধোঁকা দেয়া চলবে না। ছাত্রসমাজ কোনো ধোঁয়াশার মধ্যে থাকবে না। সুস্পষ্ট রায় চায় শিক্ষার্থীরা।
কোটা সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল বেলা ১০টায় বাকৃবির মুক্তমঞ্চ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি আব্দুল জব্বার মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটি আটকে দেয় তারা। ট্রেন অবরোধ করে আব্দুল জব্বার মোড় সংলগ্ন রেললাইনে অবস্থান করছেন শিক্ষার্থীরা।

ইবি সংবাদদাতা জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশব্যাপী চলমান ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর ব্যানারে বেলা ১১টায় অবরোধ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এসময় বিভিন্ন প্রতিবাদী গান, কবিতা ও অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেদের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। পরে বিকেল পৌনে ৪টায় অবরোধ ছেড়ে দেন তারা।
দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা অবরোধের ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হলে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। এদিকে অবরোধের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে অবরোধ কর্মসূচিতে মিলিত হন।
বশেমুরবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, এটা শুধু কোটাবিরোধী আন্দোলন নয়, ‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’ লেখা টানিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ও গোপালগঞ্জ শহর-ঘোনাপাড়া সড়ক দু’টি অবরোধ করেন তারা। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি বাতিলের দাবিতে সারা দেশের মতো বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে মেতে ওঠেন।
গতকাল ষষ্ঠ দিনে বিকেল ৩টায় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণ করে বিক্ষোভ মিছিল করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাংলা ব্লকডের অংশ হিসেবে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। পাশাপাশি গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া সড়কটিও অবরোধ করেন তারা। প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে এ কর্মসূচি। এসময় শিক্ষার্থীদের শরীরে কোটাবিরোধী বিভিন্ন লেখা দেখা যায়।

এর আগে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করলেও ক্যাম্পাসের সামনের সড়ক গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া বাইপাস সড়কটিও অবরোধ করেন তারা। ফলে অন্যদিন এই বাইপাস সড়কটি দিয়ে দূরপাল্লার কিছু যানবাহন চলাচল করলেও গতকাল ঢাকার সাথে খুলনা অঞ্চলের যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এতে ভোগান্তিতে পড়েন অসংখ্য যাত্রী।
ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধকালে একপাশে একটি কাগজ ঝুলতে দেখা যায়। কাগজে লেখা ‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে সাময়িক অসুবিধা এর জন্য দুঃখিত’।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এই কর্মসূচি পালিত হয়। এ উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের কলেজ গেট, কালিবাড়ি মোড়, টি.এ রোডসহ প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
কর্মসূচিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়কারী ফাহিম মুনতাসির, সানিউর রহমান, আইরিন মৃধা, প্রহর আচার্য্য, সুস্মিতা দাসসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এতে বক্তারা বলেন, তাদের এই আন্দোলন সরকার বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। বরং মেধাবীদের যোগ্য স্থানে ঠাঁই দিতেই তারা আন্দোলনের মাঠে নেমেছেন। তারা বলেন, কোটাব্যবস্থার কারণে মেধাবীরা বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বৈষম্যের শিকার। এতে করে দেশে মেধার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তাই মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কোটা সংস্কার করে ৫ শতাংশ নিয়ে আসা এবং কর্মসংস্থানের দাবি জানান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা আন্দোলনের মাঠে থাকার কথা জানান।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনায় গতকাল সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যানারসহ স্লোগান দিতে দিতে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় আন্দোনকারীরা বৈষম্যবিরোধী সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি জানিয়ে নতুন পরিপত্র ঘোষণা করে জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে আইন পাস করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।


আরো সংবাদ



premium cement