১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১, ৭ মহররম ১৪৪৬
`

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারো মাথাচাড়া তাজউদ্দিন পরিবারের বিরোধ

-


আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে ঐতিহ্যবাহী তাজউদ্দিন পরিবারের বিরোধ আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। চাচাকে মোকাবেলার পর এবার ফুফাতো ভাইকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীনের মেয়ে সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমিকে। সেই সাথে এবার নতুন যোগ হয়েছে দলীয় বিরোধ। সবমিলিয়ে এবার আওয়ামী লীগের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য সিমিন হোসেন রিমি গাজীপুর-৪ আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।
সাধারণ ভোটারদের মতে, গত দু’টি সংসদ নির্বাচন ও একটি উপনির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ার সুযোগে সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পেরেছিলেন সিমিন হোসেন রিমি। তবে এবার প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নিলেও রিমিকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দিচ্ছেন না তারই ফুফাতো ভাই বিশিষ্ট শিল্পপতি ও কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের উপদেষ্টা আলম আহমেদ। দলীয় মনোনয়ন লাভের আশায় তারা দু’জনেই ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও তৎকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি। প্রায় প্রতিবারই সংসদ নির্বাচনগুলোতে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। ঐতিহ্যবাহী এ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রায় প্রতিবারই মনোনয়ন প্রতিযোগিতাও লক্ষ করা যায়। এবারো দলীয় মনোনয়ন পেতে এ পরিবারের ভেতর ইতোমধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সৈয়দ তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি ও ভাগিনা আলম আহমেদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও মনোনয়ন প্রতিযোগিতা নিয়ে উত্তাপ বিরাজ করছে।
তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রি. জে. আ স ম হান্নান শাহর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জোহরা তাজউদ্দীনের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ করেন তাজউদ্দিন আহমেদের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আফসার উদ্দিন আহমেদ খান। তিনি সে বছর জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আমলে জোহরা তাজউদ্দীন নিজ বাড়ির পাশে দরদরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি অনুষ্ঠান করতে গেলে দেবর-ভাবির বিরোধের জেরে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি হয়। পরবর্তীতে ২০০১ সালের নির্বাচনে আফসার উদ্দিনের সাথে দলীয় মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন রাজনীতিতে একেবারেই নতুনমুখ তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। চাচা-ভাতিজার তীব্র মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় সে বছর চাচাকে হারিয়ে নৌকার টিকিট লাভ করেন সোহেল তাজ। ওই নির্বাচনে তিনি বিজয় লাভ করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সোহেল তাজকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী করা হয়। দায়িত্ব পেয়ে খুব অল্প সময়ে সোহেল তাজ ব্যাপক আলোচনায় আসেন। একপর্যায়ে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে সাড়ে তিন বছরের মাথায় সোহেল তাজ প্রথমে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পরে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে এ আসনে ২০১২ সালে উপনির্বাচন হয়। উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে সোহেল তাজের বড় বোন সিমিন হোসেন রিমিকে বেছে নেয় আওয়ামী লীগ। ওই উপনির্বাচানে রিমির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হন তাদের চাচা আফসার উদ্দিন আহমেদ খান। তখন চাচাকে হারিয়ে সিমিন হোসেন রিমি জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সিমিন হোসেন রিমি বিজয়ী হন। এবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এবারো দল তাকেই বেছে নিতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। অপর দিকে এলাকাবাসীর কাছে এ পরিবারের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় আলোচিত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রিমির ছোট ভাই তানজিম আহমদ সোহেল তাজ আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন বলে আগে গুঞ্জন শোনা গেলেও তিনি এখন প্রার্থী হচ্ছেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

আলম আহমেদের সমর্থকদের মতে, রিমি টানা এক যুগ বা প্রায় আড়াই মেয়াদে সংসদ সদস্য থাকার সুবাধে বিগত দিনে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আমানত হোসেন খান, সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আনিছুর রহমান আরিফসহ অনেক ত্যাগী নেতাকে দূরে সরিয়ে পছন্দের নেতাদের কমিটিতে স্থান দিয়ে নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজের অনুসারী গুটিকয়েক নেতাকে বিভিন্নভাবে প্রাধান্য দেয়ায় তার ওপর দারুণ নাখোশ দলের অনেক প্রবীণ, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারা। এসব উপেক্ষিত ও বঞ্চিত নেতাদের কাছে টেনে নিয়েছেন কৃষকলীগ নেতা আলম আহমেদ। তিনি কৃষক লীগের একাংশ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধা ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের নিয়ে দলীয় নানা কর্মসূচি পালন, গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের মাঝে একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তার সাথে থাকা নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন মোল্লা, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা আবদুর রশিদ সরকারসহ আরো অনেকে। এ ছাড়াও মূল দলে নানাভাবে উপেক্ষিত ও বঞ্চিত অনেক নেতা গোপনে ও নেপথ্যে আলম আহমেদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে তার পক্ষে কাজ করছেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে এবার মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন এলাকায় বেশ আলোচিত। উভয়ের কর্মী সমর্থকেরা রাজনীতির মাঠে বক্তব্য দিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর মনোনয়ন নিশ্চিত বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ দুই মনোনয়ন প্রতিযোগীকে প্রকাশ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা রকম বক্তব্য-বিবৃতি দিতেও দেখা যাচ্ছে।
আলম আহমেদ বলেন, আমি প্রায় এক যুগ ধরে কাপাসিয়ার প্রতিটি এলাকায়, গ্রামের আনাচে কানাচে প্রচার-প্রচারণা গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছি। এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিটি দলীয় কর্মসূচি সফল করা ছাড়াও সব জাতীয় দিবস নিয়মিত পালন করেছি। জাতীয় শোক দিবস, জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকী, শেখ রাসেল, শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী অথবা বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসসহ সব দিবসে কৃষক লীগের পক্ষ থেকে আমি কাপাসিয়ায় হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে গণভোজ, আলোচনা ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করে থাকি। গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য নেতাদের সাথে নিয়ে কাপাসিয়ায় প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছি। আমি মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।
তিনি বলেন, রিমির কারণে কাপাসিয়ায় আওয়ামী লীগে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে অধিকাংশ নেতাকর্মী আমার সাথে রয়েছেন। সিমিন হোসেন রিমি যে কয়বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, প্রতিদ্বদ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে লড়ে বিজয়ী হননি। অনেকট খালি মাঠের সুযোগ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনটি নানা কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। এ নির্বাচনে রিমির পক্ষে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। আমার সব রকম প্রস্তুতি, সামর্থ্য ও সক্ষমতা রয়েছে, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্বাচন করে জয়লাভ করার। তিনি আরো বলেন, সিমিন হোসেন রিমি কাপাসিয়ার বিশেষ কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি। তিনি দেখাতে পারবেন না বড় কোনো প্রকল্প এনে কাপাসিয়ায় বাস্তবায়ন করেছেন। যা এলাকার মানুষের উপকারে আসছে। যা উন্নয়ন হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রীর সারা দেশের উন্নয়নেরই চলমান অংশ। তিনি আরো বলেন, আমি দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি। আশা করি নেত্রী মাঠের অবস্থা যাচাই করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমাকে মনোনয়ন দেবেন।

সিমেন হোসেন রিমি বলেন, আমি কাপাসিয়ার মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমি কাপাসিয়ায় স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশে একমাত্র উপজেলা কাপাসিয়া যেখানে গত ৬ বছর ধরে মাতৃমৃত্যুশূন্য। আমি কাপাসিয়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপন করেছি, যার দ্বারা শুধু কাপাসিয়া নয় আশপাশের উপজেলার মানুষও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রত্যন্ত পল্লী এলাকায় পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে আমি সব সময় মানুষের পাশে থেকেছি। করোনার কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লকডাউন হয়ে গেলে বেসরকারি হাসপাতালে নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। এমনকি শত শত নারীর সিজারের অপারেশন বিনা খরচে করার ব্যবস্থা করেছিলাম। প্রতিটি মানুষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে তাদেরকে সব রকম সহযোগিতার চেষ্টা করেছি। কাপাসিয়ার সর্বত্র বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষার প্রসারে বই পড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। যুবসমাজকে নীতিবান হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কাপাসিয়ায় এখন আওয়ামী লীগ ও এর সব অঙ্গসংগঠন তৃণমূল পর্যন্ত সবাই আমার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। উপজেলা আওয়ামী লীগে কোথাও কোনো বিরোধ নেই। আমি বিশ্বাস করি, দল-দলীয় নেতাকর্মী এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আমার এসব অবশ্যই মূল্যায়ন করবেন। তিনি বলেন, আমি মনোনয়ন নিয়ে চিন্তিত নই। আমি বিশ্বাস করি মানুষের ভালোবাসা আমার বিজয়ের চাবিকাঠি। কাপাসিয়াবাসী অতীতে যেমন আমার সাথে ছিলেন এবারো তারা আমার সাথে থাকবেন।
এ দিকে এলাকাবাসীর মতে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এবং সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত অংশ নিলে সার্বিক চিত্র পাল্টে যেতে পারে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুল হান্নান অথবা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন সেলিম এমনকি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহ উদ্দিন আইউবী বা তাদের কোনো একজন প্রার্থী হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হতে পারে।

 


আরো সংবাদ



premium cement