০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯, ৯ রজব ১৪৪৪
ads
`

গুলি-টিয়ারে রণক্ষেত্র নয়াপল্টন

নিহত ১ : রিজভী-আমান-এ্যানী-সালাম ও শিমুলসহ গ্রেফতার কয়েক শ’
নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে পুলিশের আক্রমণ। ইনসেটে মৃত্যুর আগে গুলিবিদ্ধ মকবুলকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে দলীয় কর্মীরা : নয়া দিগন্ত -

রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সাথে বিএনপি কর্মীদের তুমুল সংঘর্ষে একজন নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগামী ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশ কর্মসূচি সামনে রেখে দলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে জড়ো হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সাথে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলি ও টিয়ার শেলের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। একপর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে আশ্রয় নিলে পুলিশ কার্যালয় লক্ষ্য করে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে অবরুদ্ধ নেতাকর্মীদের অনেকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও সিনিয়র নেতা শিমুল বিশ্বাসসহ কয়েক শ’ নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ সময় বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলকে তুলে নেয়া হয়েছে বলে বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন। সন্ধ্যার একটু আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে রাস্তায় অবস্থান নেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ পুরো এলাকা ঘেরাও করে রেখেছে। কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত রাস্তায় পুলিশ তারকাঁটা দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। ভেতরে সাঁজোয়া যান সাইরেন বাজিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ দিকে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনের দু’দিকের রাস্তা অবরুদ্ধ করে ফেললে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে ঘটনার সূত্রপাত হয়।


১০ ডিসেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের অবস্থান বেড়ে যায়। গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তা পেরিয়ে সেই অবস্থান রাস্তার অপর পাড়ে চলে যায়। এতে উভয় দিকের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী কামাল হোসেন জানান, সকাল থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতির পাশাপাশি পুলিশের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। সাথে সাঁজোয়া যান, জল কামান, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, প্রিজনভ্যানেরও উপস্থিতি ছিল। ছিল সাদা পোশাকের বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্য। এরই মধ্যে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে যাচ্ছিলেন। বেলা যত বাড়তে থাকে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও তত বাড়তে থাকে। বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের রাস্তা ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়। তারা হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে থাকে রাস্তা ছেড়ে দেয়ার। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের জোরপূর্বক রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করলে বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণ শুরু করে। এতে বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকেই আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। অনেকে দৌড়ে গিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান নেন। বাকিরা প্রধান সড়ক ছেড়ে বিভিন্ন অলিগলিতে আশ্রয় নেন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে অলিগলিতে ঢুকে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় বিভিন্ন বাসা-বাড়িতেও টিয়ার শেলের আঘাত লাগে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে সেখানে অবরুদ্ধ নেতাকর্মীরা গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আটকে পড়া নেতাকর্মীদের জানালার ফাঁক দিয়ে টিয়ার শেল নিক্ষেপ না করার জন্য পুলিশকে অনুরোধ করতে দেখা গেছে। একপর্যায়ে পুলিশকে গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়তে ছুড়তে নাইটিঙ্গেল মোড় ও ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত যেতে দেখা যায়।


এ দিকে আহতদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য রিকশায় তোলা হলে পুলিশ পথে পথে বাধা দেয়। পুলিশকে অনুরোধ করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
আমাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রতিনিধি জানান, হাসপাতালে অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মীকে নেয়া হয়। এর মধ্যে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আরো ২০ জনকে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যাদের আহত অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগই গুলিবিদ্ধ। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পথচারীও রয়েছেন। সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিহত যুবকের নাম মকবুল হোসেন (৩০)। তিনি পল্লবী থানা এলাকার ৫নং ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী। তার লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহতের কোনো স্বজন হাসপাতালে আসেননি।


ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনরা হলেন- বোরহান উদ্দিন কলেজ ছাত্রদলের কর্মী আনোয়ার ইকবাল, পল্টন থানা যুবদলের কর্মী মো: খোকন, মো: মনির হোসেন, মো: রাশেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবি জসীমউদ্দীন হলের ছাত্রদল নেতা মো: ইয়াসির আরাফাত, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের নেতা মো: সুমন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা মো: জহির হাসান, রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো: শামীম, কদমতলী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো: হানিফ, মো: হৃদয়, মো: কামাল হোসেন, রবিন, কাউছারও রনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো: ফারহান আরিফ, শাহবাগ থানা যুবদল নেতা মো: নূরনবী, মনির, শাহ আলী থানা যুবদলের নেতা মো: সুলতান আহমেদ, শেরেবাংলা নগর যুবদলের নেতা মো: আমিনুল ইসলাম, গুলশান থানা ছাত্রদলের নেতা আশরাফুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের বিপ্লব হাওলাদার, মো: আসাদুজ্জামান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতা মো: মেহেদী হাসান নয়ন।
এ দিকে এই ঘটনায় বিএনপির সিনিয়র নেতাসহ কয়েক শ’ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানা গেছে। বিকেল ৪টা ২৪ মিনিটে ডিএমপি কমিশনারের সাথে কথা বলে তার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বের হন বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল। তাদের গ্রেফতার করে নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর একটি মাইক্রোবাসে পুলিশ তাদের মিন্টু রোডের দিকে নিয়ে যায়।


বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযানে ঢুকে পুলিশ। এরপর বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে বিএনপি নেতা শিমুল বিশ্বাসকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর স্কাউট ভবনের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে তাকে তুলে নেয় পুলিশ। এ সময় তাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করেন শিমুল বিশ্বাস। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে গ্রেফতারের নিন্দা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
সন্ধ্যা ৫টা ২০ মিনিটে বিএনপি কার্যালয় থেকে বের করে আনা হয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীসহ একাধিক নেতাকর্মীকে। তাদের প্রিজনভ্যানে তুলে নেয়ার সময় রিজভী বলেন, এটা অন্যায়। জনগণ ১০ডিসেম্বরের গণসমাবেশে এই অন্যায়ের জবাব দিবে।


সন্ধ্যা ৬টার দিকে কার্যালয় থেকে বের করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খাইরুল কবির খোকনকে। তাদের প্রিজনভ্যানে তোলার সময় তারা বলেন, আমাদের গণসমাবেশ বানচাল করতে এই ফ্যাসিস্ট সরকার এই নোংরা খেলায় লিপ্ত হয়েছে। আমরা এই কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা প্রত্যাশা করছি সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। ১০ তারিখের আগে সবাইকে ছেড়ে দিবে। আমাদের সমাবেশ করতে দিবে।
এর কিছুক্ষণ পর বিএনপি কার্যালয় থেকে বের করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান ও সহ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলসহ অর্ধশত নেতাকর্মীকে। এ সময় প্রিজনভ্যানে তোলার সময় আমান উল্লাহ আমান বলেন, আমাদের এই হাসিনা সরকার গ্রেফতার করে সমাবেশ বানচাল করতে চায়। সমাবেশ জনগণ সফল করবে। এই সমাবেশ সফলের মাধ্যমে জনগণ সরকারকে ধিক্কার জানাবে।
সন্ধ্যায় ছাত্রদলের ১নং জয়েন্ট সেক্রেটারি রাকিবুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর একে একে কয়েক শত নেতাকর্মীকে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়।

 


আরো সংবাদ


premium cement
পুনরায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তীব্র প্রতিবাদ বিএনপির জাপার বিদ্রোহীরা রওশনের নেতৃত্বে ২০১৪ সালের নির্বাচনে যায় : চুন্নু জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে খন্দকার মাহবুব হোসেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ বিদেশে শ্রমিক নিয়োগের বিধি-বিধান শক্তিশালী করতে হবে : মোরালেস এমপি রহমতুল্লাহ’র পকেটে আহলে হাদিসের দুই কোটি ভোট মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ২ আসামি গ্রেফতার দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : তথ্যমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ উপ-নির্বাচন ঘিরে ’নাটকীয়তা’ বিপিএলে ইতিহাস গড়ে জয় কুমিল্লার খেলার মাঠে দেয়াল দিয়ে প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে

সকল