২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

গুজবে কান দেবেন না

পলোগ্রাউন্ডের বিশাল জনসভায় ব্যাংক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তৃতা করছেন : বাসস -

দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে তার দলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা আপনাদের দোয়া, সহযোগিতা ও ভোট চাই, যাতে যুদ্ধাপরাধী ও খুনিরা আবার ক্ষমতায় এসে জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। গতকাল বিকেল পৌনে ৪টায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ডের বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। এ ছাড়া ব্যাংকে টাকা নেই বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অপপ্রচার চলছে অভিযোগ করে তিনি গুজবে কান না দিয়ে সবাইকে বাস্তবতা বিচার করে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, যাওয়ার আগে আপনাদের কাছ থেকে শুধু চাই একটা ওয়াদা, আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন, সেভাবে সুযোগ পেয়েছি। আগামীতে আপনারা ভোট দেবেন নৌকা মার্কায়। হাত তুলে বলেন। এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা হাত তুলে নৌকায় ভোট দেয়ার ওয়াদা করেন।


এর আগে প্রধানমন্ত্রী ভাষণের শুরুতে বলেন, ‘আসলামু আলাইকুম। অনেরা ক্যান আছন? বেয়াগ্ঘুন গম আছন নি? তোয়ারার লাই আঁরতে পেট পুরের। ইতেল্লাই আই আইসিদি।’
পলোগ্রাউন্ড মাঠে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এই জনসভার আয়োজন করা হয়। বেলা ৩টার দিকে মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং কয়েকটি প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মো: আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া, আমিনুল ইসলাম, মোসলেম উদ্দিন আহমদ প্রমুখ জনসভায় বক্তব্য রাখেন।


চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জনসভা সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে একটানা সেই ২০০৯ থেকে ২০২২ গণতান্ত্রিক ধারা আছে বলেই বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এই বাংলাদেশকে আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলব। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকার নিয়ে বঙ্গবন্ধু আইন করে দিলেও বিএনপি সে আইন বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বিএনপির কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, কেন সে ব্যবস্থা নেয়নি জবাব চাই। তিনি বলেন, জিয়ার জন্ম হয়েছে কলকাতায়। পড়াশোনা করেছে করাচিতে। করাচি থেকে কমিশন পেয়ে সেনাবাহিনীতে ঢুকে বাংলাদেশে পোস্টিংয়ে এসেছিল। কাজেই এরা তো জানার কথা না। আর ওই জ্ঞানও তাদের নাই। একটা তো মেট্রিক ফেল, আরেকটা এইট পাস আর আরেকটা বোধ হয় ইন্টার পাস। এই তো? তারা জানবে কোত্থেকে বাংলাদেশ? আর সমুদ্রসীমা আইন তাইবা জানবে কোত্থেকে? আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর সমুদ্রসীমায় অধিকার নিশ্চিত করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


বিশ্বব্যাপী খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সঙ্কট চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে এখনো মজবুত। আমরা তারপরও চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের দেশের মানুষ যেন ভালো থাকে। তিনি বলেন, কিছু দিন বিদ্যুতের জন্য কষ্ট হয়েছে। আল্লাহর রহমতে আর কোনো কষ্ট ভবিষতে থাকবে না। কিন্তু আপনাদের একটা অনুরোধ- আপনাদের সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করতে হবে। জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই চট্টগ্রামের সাথে আমার অনেক স্মৃতি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন সমাবেশ করতে পারিনি। তাই আপনাদের কাছে ছুটে এলাম।


২৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এসব উন্নয়ন প্রকল্প আমার কাছ থেকে পাওয়া উপহার।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগই একমাত্র সরকার যারা বন্দরনগরীর ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। তিনি বলেন, আজকে খালেদা জিয়া কারাগারে কারণ বিদেশ থেকে এতিমের জন্য যে টাকা এসেছে তা এতিমের হাতে না গিয়ে নিজেরা পকেটস্থ করেছে। জিয়া অরফানেজের টাকা চুরি করেছে বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দায়ের করা মামলায় তার ১০ বছরের সাজা হয়েছে। আর তার ছেলে যে মারা গেছে (আরাফাত রহমান কোকো) সিঙ্গাপুর থেকে তার পাচার করা কিছু টাকা সরকার ফেরত আনতে পেরেছে। অপর সন্তান তারেক রহমানকে কুলাঙ্গার আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, সে এখন লন্ডনে বসে আছে। এই তারেকই ২০০৭ সালে সেই সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে আর কোনোদিন রাজনীতি করবে না বলে মুচলেকা দিয়ে বিদেশে পালিয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


শেখ হাসিনা বলেন, ওরা (বিএনপি) জানে নির্বাচন হলে জনগণ তাদের ভোট দেবে না। তাই তারা নির্বাচন চায় না, তারা চায় সরকার উৎখাত করে এমন কেউ আসুক, যারা একেবারে নাগরদোলায় করে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এটাই তারা আশা করে, তারা জনগণের তোয়াক্কা করে না। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, সেই ১০ ডিসেম্বর বিএনপির খুব প্রিয় একটা তারিখ। বোধ হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পদলেহনের দোসর ছিল বলেই ১০ ডিসেম্বর তারা ঢাকা শহর নাকি দখল করবে। আর আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করবে। অথচ পরাজয় নিশ্চিত জেনে এই ১০ ডিসেম্বর থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে, ইত্তেফাকের সাংবাদিক শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেনকে উঠিয়ে নিয়ে যায়।
বিএনপির আন্দোলনের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, তাদের আন্দোলন হচ্ছে মানুষ খুন করা। বিএনপির দুইটা গুণ আছে, ভোট চুরি আর মানুষ খুন, ওইটা পারে। বিএনপির ২০১৩, ১৪, ১৫ সালের আন্দোলনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অগ্নিসন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা, মানুষকে অগ্নিদগ্ধ করার জবাব এক দিন খালেদা জিয়া-তারেক জিয়াকে দিতে হবে, এর হিসাব এক দিন জনগণ নেবে।


ব্যাংক নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের সর্বনাশ করা এটাই কি বিএনপির জামায়াত-শিবিরের কাজ। নাকি তাদের সাথে চোরের সখ্য আছে, চোরকে চুরি করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বক্তব্যের শুরুতে প্রায় ৩৪ বছর আগে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় পুলিশের গুলির ঘটনা স্মরণ করেন। বলেন, ‘এরশাদের সময়ে ওই গুলির ঘটনায় দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাকে খালেদা জিয়া রেহাই দিয়েছিলেন। তার মানে হয়ত ওই গুলির ঘটনায় খালেদা জিয়াও জড়িত ছিল।’
চট্টগ্রামের উন্নয়নে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণসহ আগামীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ফোর লেন থেকে সিক্স লেন করে দেয়ার পাশাপাশি সেখানে মেট্রো রেল করার জন্য সমীক্ষা হচ্ছে, ভায়াবল হলে তা করে দেয়া হবে বলেও উল্লেখ করে দেশের সমুদ্র বিজয়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জনসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি নেতারা বলছে সরকারের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সরকারের ঘুম নষ্ট হয়নি। ঘুমটা নষ্ট শেখ হাসিনার। দেশের মানুষের জন্য, মানুষকে বঁাঁচানোর জন্য, গরিব মানুষকে, দুঃখী মানুষকে বাঁচানোর জন্য শেখ হাসিনাকে রাত জাগতে হয়। তিনি বলেন, কি খেলা হবে, হবে খেলা? বীর চট্টলা তৈরি। প্রস্তুত আছেন? খেলা হবে। ফখরুল সাহেব, আমীর খসরু সাহেব দেখে যান এখানে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বলেছিলেন। দেখে যান, কত লোক হয়েছে, আপনাদের আটটা সমাবেশের সমান লোক হয়েছে আজকের পলোগ্রাউন্ড মাঠে। ওবায়দুল কাদের বলেন, শেখ হাসিনাকে মারতে এখনো চক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে মারতে এখনো চক্রান্ত করছেন সেটি জানি। বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের দিবাস্বপ্ন ভুলে যান, হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূত মাথা থেকে নামিয়ে ফেলেন।


১০ তারিখে বিএনপি আত্মসমর্পণ করবে : তথ্যমন্ত্রী
এ দিকে জনসভায় বক্তৃতাকালে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ ঢাকায় পাকিস্তানিরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করেছিল। বিএনপি ১০ ডিসেম্বর নাকি ঢাকা দখল করবে। ১০ তারিখে বিএনপি ও অগ্নিসন্ত্রাসীরা ঢাকার বুকে আত্মসমর্পণ করবে ইনশা আল্লাহ, যেইভাবে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছিল। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আজকে সমগ্র চট্টগ্রাম শহরে মানুষের ঢেউ জেগেছে। সমুদ্রপাড়ের চট্টগ্রামের সাথে যেন জনতার ঢেউ একাকার হয়ে গেছে। আর পলোগ্রাউন্ডে রঙবেরঙের বর্ণিল ছটা যেন আজকে রংধনুর ছটায় পরিণত হয়েছে। এই জনসভায় যত না মানুষ তার চেয়ে আট-দশ গুণ লাখ লাখ মানুষ এই জনসভার বাইরে অবস্থান করছে।

 


আরো সংবাদ


premium cement