২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি চীন-ভারত

-

ইউক্রেনের ৪ অঞ্চল সংযুক্তির নিন্দা প্রস্তাব

-পুতিনের হুমকিতে ভীত নয় যুক্তরাষ্ট্র : বাইডেন
-রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের
-রাশিয়ার পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন : তুরস্ক
-সংযুক্ত অঞ্চলে হামলা রাশিয়ার ওপর আঘাত : ক্রেমলিন
-লাইম্যান ঘাঁটিতে হাজার হাজার রুশ সৈন্যকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেন

ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চলগুলো একীভূত করার কাজকে নিন্দা জানাতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি খসড়া প্রস্তাবে রাশিয়া তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করায় তা বাতিল হয়ে যায়। ক্রেমলিনের সাম্প্রতিক তৎপরতায় নিন্দা জানিয়ে তৈরি এই প্রস্তাবে মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন ও ভারত ভোট প্রদানে বিরত থাকে। শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত লিন্ড থমাস গ্রিনফিল্ড। যেখানে ইউক্রেনের জন্য খারাপ হয় এমন কোনো বিষয়কে স্বীকৃতি না দিতে এবং রাশিয়াকে অধিকৃত অঞ্চল থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে আহ্বান জানানো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও আলবেনিয়ার যৌথভাবে করা এ নিন্দা প্রস্তাবে ইউক্রেনের রুশ-দখলকৃত অংশে অনুষ্ঠিত ‘অবৈধ’ গণভোটের নিন্দা এবং সব রাষ্ট্রের প্রতি ইউক্রেনের সীমানায় কোনো পরিবর্তনের স্বীকৃতি না দেয়ারও আহ্বান জানানো হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ১০টি দেশ এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে চীন, গ্যাবন, ভারত ও ব্রাজিল ভোটদানে বিরত থাকে। ভোটদানে বিরত থাকা মানে রাশিয়ার পক্ষ নেয়া নয় মন্তব্য করেন থমাস গ্রিনফিল্ড। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, একটি দেশও রাশিয়ার পক্ষে ভোট দেয়নি। ভোটদানে বিরত থাকা মানে রাশিয়ার পক্ষ পরিষ্কার করে না।
জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া প্রস্তাবের বিপক্ষে একমাত্র ভোটটি দেন। এ সময় তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে অঞ্চলগুলো মস্কো দখল করেছে এবং যেখানে এখনো লড়াই চলছে, তারা রাশিয়ার অংশ হতে ভোট দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত সার্গেই কিসলিতস বলেছেন, প্রস্তাবের বিপক্ষে একটিমাত্র ভোট পড়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় রাশিয়া বিচ্ছিন্ন। রাশিয়ার বাস্তবতা অস্বীকার করার মরিয়া প্রচেষ্টার সাক্ষ্য দিয়েছে।


যুক্তরাজ্যের দূত বারবারা উডওয়ার্ড বলেছেন, রাশিয়া ‘তার অবৈধ কার্যকলাপকে রক্ষা করতে এ ভেটোর অপব্যবহার করেছে’। ইউক্রেনের চারটি এলাকা রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির ‘কোনো আইনি বৈধতা নেই’। এর আগে শুক্রবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড দখলের ঘটনায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল, যা মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৫ শতাংশ, রাশিয়ার সাথে একীভূত করার ঘোষণা দেন।
পুতিনের হুমকিতে ভীত নয় যুক্তরাষ্ট্র : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনের চারটি অধিকৃত অঞ্চলকে সংযুক্তি ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পুতিনের হুমকিতে ভীত নয় যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বক্তব্যকে বেপরোয়া ও হুমকি অভিহিত করে বাইডেন বলেন, ‘আমাদের ভয় দেখাবেন না। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ভয় পাবে না।’ ন্যাটোর ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ‘মিত্রদের সাথে নিয়ে জোটের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও রক্ষা করতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।’
ইউক্রেনের কাছ থেকে দখলকৃত চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত করার ঘটনায় মস্কোর ওপর ক্ষুব্ধ পশ্চিমা দেশগুলো। এরই মধ্যে এ ঘটনায় রাশিয়ার ওপর নতুন করে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার সমরাস্ত্র শিল্প কমপ্লেক্স, দু’টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতের প্রধান তিনজন নেতা এবং কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের এবারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া রুশ পার্লামেন্টের ২৭৮ জন সদস্যের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। রাশিয়ার বাইরে থেকে রুশ বাহিনীকে সহায়তা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। একই সাথে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডকে রাশিয়ার সাথে যুক্ত করার প্রচেষ্টায় যারা সমর্থন দেবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেবে ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন : ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ায় সংযুক্তিকরণের কঠোর সমালোচনা করেছে তুরস্ক। গতকাল শনিবার তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে এ বিষয়ে দেশটির অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, মস্কোর সিদ্ধান্ত ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতির গুরুতর লঙ্ঘন। এটি অগ্রহণযোগ্য।’ এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড।


আঙ্কারা বলছে, মস্কোর এই পদক্ষেপ তারা প্রত্যাখ্যান করছে, যেভাবে ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলকেও তুরস্ক স্বীকৃতি দেয়নি। মস্কো কর্তৃক ইউক্রেনের ১৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখলের ঘটনায় কিয়েভের পক্ষে জোরালো সমর্থনের কথাও জানিয়েছে তুরস্ক। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তুরস্ক ২০১৪ সালে অবৈধ গণভোটে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলকে স্বীকৃতি দেয়নি; বরং সব সময় ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি জোরালো সমর্থনের ওপর জোর দিয়েছে।’
সংযুক্ত অঞ্চলে হামলা রাশিয়ার ওপর আঘাত : ইউক্রেনের কাছ থেকে সংযুক্ত যেকোনো অঞ্চলে হামলাকে রাশিয়ার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করবে মস্কো। এমন মন্তব্য করেছেন রুশ প্রেসিডেন্টের দফতর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। পুরো পূর্ব দনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে রাশিয়ার লড়াই অব্যাহত রাখারও অঙ্গীকার করেন দিমিত্রি পেসকভ।
লাইম্যান ঘাঁটিতে রুশ সৈন্যদের ঘেরাও : ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাইম্যানে অবস্থিত মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক ঘাঁটিতে হাজার হাজার রুশ সৈন্যকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা। গতকাল শনিবার ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন, ওই ঘাঁটিতে অভিযান চলমান রয়েছে, এ খবর জানিয়েছে রয়টার্স। দোনেৎস্ক অঞ্চলের উত্তরে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনায় রসদ সরবরাহ এবং পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে রাশিয়া।
সেই শহরে ইউক্রেনের সৈন্যরা রুশ সৈন্যদের ঘাঁটি ঘিরে ফেলার এ ঘটনা ক্রেমলিনের দনবাসের সমগ্র শিল্পাঞ্চল দখলের পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের নতুন ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের মুখপাত্র সের্হি চেরেভাতি বলেছেন, ‘লাইম্যান এলাকায় রাশিয়ার সৈন্যদের ঘাঁটি ঘিরে রাখা হয়েছে’। তিনি বলেন, ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের মুক্তির পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে লাইম্যান শহরটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এ শহরের মাধ্যমে ক্রেমিনা ও সিভিয়েরোদনেৎস্কে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এ শহরটির অবস্থানও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চেরেভাতি বলেছেন, লাইম্যানে রাশিয়ার প্রায় পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার সৈন্য আছে। কিন্তু অভিযান চলমান থাকায় এবং কিছু সৈন্য ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করায় সেখানে রুশ সৈন্যদের সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে। তিনি বলেন, রুশ সৈন্যরা ঘেরাও থেকে বেরিয়ে আসার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করছে। রুশ সৈন্যদের অনেকে নিহত ও আহত হয়েছেন। অভিযান এখনো শেষ হয়নি।


আরো সংবাদ


premium cement