০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

কর্মসূচিতেই থাকছে বিএনপি ঢাকায় ১৬ পয়েন্টে সমাবেশ

-

সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় দলীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও কয়েকজনকে হত্যা, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন আরো বেগবান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এরই মধ্যে জেলা-উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশগুলোয় নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সন্তুষ্ট দলের হাইকমান্ড। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও চাইছেন কঠোর কর্মসূচি। এ অবস্থায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সমাবেশ করা হবে। এভাবে সারা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ফের সমাবেশের একপর্যায়ে আবারো ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচির ডাক আসতে পারে। এ ছাড়া পুলিশের গুলিতে নিহত, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় মামলা করতে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ে লিগ্যাল সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। গত সোমবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। এ দিকে দলীয় কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। গত বুধবার ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনার এবং বৃহস্পতিবার কানাডিয়ান হাইকমিশনারের সাথে বৈঠক করেছে বিএনপির প্রতিনিধিদল।
বিএনপির দফতর সূত্র জানায়, গত ২২ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশ বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নরসিংদী, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, গাইবান্ধা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, যশোর, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর ও ময়মনসিংহে দলীয় কর্মসূচি পালনের সময় ক্ষমমতাসীন দল ও পুলিশি হামলা হয়েছে। সারা দেশে নিহত হয়েছেন তিনজন, আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি নেতাকর্মী। গ্রেফতারের সংখ্যা দুই শতাধিক। সারা দেশে নামোল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে প্রায় চার হাজার ৮১ জনের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এবং অজ্ঞাত আসামি প্রায় ২০ হাজার। সারা দেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হঢেছে ২০-৩০টি স্থানে ও বাড়িঘর, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে ৫০টি স্থানে।
কঠোর কর্মসূচি চায় তৃণমূল : জানা গেছে, হামলা-মামলার পরও বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং কঠোর কর্মসূচির দাবি জানাচ্ছেন। কয়েকটি জেলার বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আলাপকালে জানান, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন ক্ষমতাসীন দলের দাপট এবং মামলা ও পুলিশি হয়রানির ভয় বা ঝুঁকি নিয়েই মাঠে নামছেন। জ্বালানি তেল ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবে মানুষের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকার কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন কঠোর কর্মসূচি চাইছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহ-সম্পাদক প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, হামলা-মামলা নির্যাতন করেও আমাদের দমাতে পারেনি। গুম-খুনের মধ্যেও সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীরা এখন আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে। আমরা জীবনবাজি রেখে দেশনায়ক তারেক রহমানের যেকোনো আহ্বানে রাজপথে অবস্থান নেবো ইনশা আল্লাহ। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শেরপুর-১ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা: সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে দলীয় কর্মসূচি পালনের জন্য কেন্দ্র থেকে তাদেরকে বার্তা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে এবং সেই দাবিতেই আমাদের নেতাকর্মীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলের এখন একটাই বার্তা হলোÑ আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ কর্মসূচিগুলোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দাবি আদায় ও যুগপৎ আন্দোলন তৈরি করা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সদস্য রাজিব আহসান চৌধুরী পাপ্পু বলেন, দেশের মানুষ অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কারণ নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি দলের সীমাহীন লুটপাটে অতিষ্ঠ জনগণ এখন চায় পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের চাবি কিন্তু বিএনপির হাতেই। সুতরাং এ সরকারকে বিদায় করতে হলে জীবনবাজি রেখে রাজপথে কঠোর সংগ্রামের বিকল্প নেই। সাবেক মন্ত্রী মরহুম মাইন উদ্দিন ভূঁইয়ার ছেলে ও নরসিংদী জেলা বিএনপির সদস্য রফিকুল আমিন ভূঁইয়া রুহেল বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া হবে আত্মঘাতী। মাফিয়া সরকারকে হটিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হলে কঠোর কর্মসূচির বিকল্প নেই। সারা দেশের তৃণমূল এখন প্রস্তুত। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। তিনি যখনই ডাক দিবেন ইনশা আল্লাহ সবাই রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
আজ থেকে ঢাকায় সমাবেশ : ঢাকা মহানগরীর উত্তর ও দক্ষিণের ১৬টি স্পটে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। আজ শনিবার থেকে শুরু হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সমাবেশ হবে। এর মধ্যে জোড় তারিখে দক্ষিণ বিএনপি ও বিজোড় তারিখে উত্তর বিএনপি কর্মসূচি করবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লোডশেডিং, গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নারায়ণগঞ্জে যুবদল নেতা শাওন এবং ভোলায় ছাত্রদল নেতা নুরে আলম ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রহিম হত্যার প্রতিবাদে এ সমাবেশ হবে। একই দাবিতে এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালনকালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দল ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহিংসতায় ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আজ থেকে অনুষ্ঠেয় সমাবেশের জন্য গত বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে অবহিত করে চিঠি দিয়েছে ঢাকা উত্তর বিএনপি। বৃহস্পতিবার দক্ষিণ বিএনপিও চিঠি দিয়েছে। এসব সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সিনিয়র নেতাদের অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক গতকাল শুক্রবার নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিকে আটটি জোনে ভাগ করেছি। প্রতিটি জোনে একটি সমাবেশ হবে। কোন জোনে কবে সমাবেশ করা হবে, এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারকে অবহিত করে চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে একসাথে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করা হবে।
ডিএমপি কমিশনারকে দেয়া চিঠিতে উত্তর বিএনপি জানিয়েছে, আগামী ১১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিটি সমাবেশ বেলা ৩টা থেকে শুরু হবে। চিঠিতে এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনারের সহযোগিতা চেয়েছে উত্তর বিএনপি। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং মাইক ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইদুর রহমান মিন্টু জানান, ধারাবাহিক সমাবেশসংক্রান্ত একটি চিঠি বৃহস্পতিবার ডিএমপি কমিশনারকে দেয়া হয়েছে। দক্ষিণের প্রতিটি সমাবেশ জোড় তারিখে হবে। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সমাবেশ চলবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আটটি জোন হলোÑ মতিঝিল-পল্টন, শাহবাগ-রমনা, সূত্রাপুর-গেণ্ডারিয়া-ওয়ারি, লালবাগ-চকবাজার-কামরাঙ্গীরচর, কদমতলী-শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা, ধানমন্ডি-কলাবাগান-হাজারীবাগ-নিউমার্কেট এবং সবুজবাগ-খিলগাঁও-মুগদা। ঢাকা মহানগর উত্তরের আটটি জোন হলোÑ উত্তরা পূর্ব-উত্তরখান-দক্ষিণখান, উত্তরা পশ্চিম-তুরাগ-বিমানবন্দর-খিলক্ষেত, পল্লবী-রূপনগর-ভাসানটেক, বাড্ডা-ভাটারা-রামপুরা, মিরপুর-শাহআলী-দারুসসালাম-কাফরুল, মোহাম্মদপুর-আদাবর-শেরেবাংলা নগর, গুলশান-বনানী-ক্যান্টনমেন্ট এবং তেজগাঁও-তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল-হাতিরঝিল।


আরো সংবাদ


premium cement