০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯, ১০ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`
টিকে থাকার সংগ্রাম উদ্যোক্তাদের

গ্যাস সঙ্কটে শিল্পে উৎপাদন হ্রাস

-

বিদ্যুতের লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে ত্রাহি অবস্থা শিল্প মালিকদের। এর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের প্রেসার কমে যাওয়া। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গড়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা গ্যাসের প্রেসার না থাকায় শিল্প কারখানায় উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে গেছে। একই সাথে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। এমনি পরিস্থিতিতে টিকে থাকার লড়াই করছেন উদ্যোক্তারা। তারা জানিয়েছেন, লোকসান কত দিন দিতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পরিস্থিতি শিগগিরই উন্নতি না হলে লোকসানের ধকল সামলাতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিকেএমইএ ভাইস প্রেসিডেন্ট ফজলে শামীম এহসান এ বিষয়ে বলেন, বিদ্যুতের এক ঘণ্টা লোডশেডিং করার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে স্থানভেদে লোডশেডিং হচ্ছে ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। এর ফলে আগে যারা জেনারেটর বন্ধ রেখেছিল তারা ডিজেল পুড়িয়ে লোডশেডিং সমন্বয় করছে। এ জন্য শুধু তার তিনটি কারখানায় প্রতিদিন দেড় লাখ টাকার ওপরে ব্যয় বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং বাস্তবায়নের কয়েক দিন পরই জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটি ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য আরো বড় আঘাত আসে। লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর ফলে পরিবহন ভাড়াসহ সব কিছুরই দাম বেড়ে যায়। এতে যারা ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুতের লোডশেডিং সমন্বয় করে আসছিলেন তাদের ব্যয় আরো বেড়ে যায়। তিনি বলেন, বিদেশী ক্রেতাদের ধরে রাখতে লোকসান দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।
ফজলে শামীম এহসান আরো বলেন, বর্তমান নতুন করে আরেক সঙ্কট দেখা দিয়েছে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া। সারাদিনই শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। এমনও এলাকা আছে যেখানে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা গ্যাসের চাপ থাকে না। সাধারণত গ্যাসের চাপের বার সর্বনিম্ন তিন থাকলে বয়লার চালানো যায়, কিন্তু এ চাপ তিনের নিচে নামলে বয়লার বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, দিনে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা গ্যাসের চাপ ১ এ নেমে আসে। তখন বয়লার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে উৎপাদনও আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি এক পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন, এখন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে গেছে। যাদের বয়লারের ডুয়েল বার্নার আছে তারা ডিজেল পুড়িয়ে বয়লার চালু রাখেন। এভাবে একজন উদ্যোক্তার গ্যাসের চাপ কমে গেলে ডিজেল চালিয়ে বয়লার চালু রাখতে দিনে ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। তিনি জানান, এর পরও তারা ভবিষ্যতের আশায় বর্তমানে লোকসান দিয়ে হলেও টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। এটি কত দিন সম্ভব হবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, লোকসান সমন্বয় করা যত দিন যার সামর্থ্য আছে তত দিন দেবে। এর পরও পরিস্থিতি উন্নতি না হলে শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনোই পথ থাকবে না বলে তিনি মনে করেন।
গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্যান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে তারা ১৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেতেন। কিন্তু এখন তারা পাচ্ছেন ১৬০ কোটি ঘনফুট। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ হওয়ার পর তারা গ্যাস কম পাচ্ছেন। এমনিতেই আগেই চাহিদার চেয়ে কম গ্যাস পেতেন এর ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যে গ্যাস পাচ্ছেন তাতে ঘাটতি আরো বেড়ে গেছে। এখন যে গ্যাস পাচ্ছেন তাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বড় একটি অংশ সরবরাহ করতে হচ্ছে। এর ফলেই শিল্প কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। তিনি মনে করেন, এটা সাময়িক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ১৮ আগস্ট দেশে ২৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে ৫৭ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানিসহ দেশে মোট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে ২৮৭ কোটি ঘনফুট। এ থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ওই দিন সরবরাহ করা হয়েছে ১০২ কোটি ঘনফুট, যেখানে চাহিদা ছিল ২২৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেকও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। ওই দিন সার কারাখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ১৭ কোটি ঘনফুট, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩২ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ সার কারখানাগুলোতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
এ দিকে শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, একে তো বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে, অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর ওপর শুরু হয়েছে ভয়াবহ গ্যাস সঙ্কট। সবমিলেই শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। একজন শিল্প উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, তৈরী পোশাকের ক্রয়াদেশ ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। এক দিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অপর দিকে কমছে ক্রয়াদেশ। ফলে পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। এতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনছেন প্রত্যেক শিল্প মালিকরা। এ লোকসান কত দিন দিতে পারবেন তা বলতে পারছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই বাড়বে। একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।


আরো সংবাদ


premium cement