২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯, ১ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ডলার সঙ্কটে চাল আমদানিতে ভাটা

১০ লাখ ১০ হাজার টনের বিপরীতে চাল এসেছে ৩৪ হাজার টন; ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা
-

বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ বাড়াতে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের ৪ মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ১০ লাখ ১০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছিল খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে। এ হিসাবে প্রতিদিন ৮ হাজার ৪১৭ টন করে ৪২ দিনে (১ জুলাই-১১ আগস্ট) ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টন চাল আমদানির কথা। কিন্তু এই সময়ে দেশে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করেছেন মাত্র ৩৪ হাজার টন। এটা লক্ষ্যমাত্রার ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ৪২ দিনের লক্ষ্যমাত্রার ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। চাল আমদানির এ চিত্র সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা জানান, একদিকে ডলারের দাম অস্থিতিশীল, অপরদিকে সঙ্কট। পাশাপাশি ভারতের বাজারে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সবমিলেই চাল আমদানির পর সে অনুযায়ী সঠিক দামে বিক্রি করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই অনুমোদন পেয়েও চাল আমদানির ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বেশির ভাগ ব্যবসায়ী। ইতোমধ্যে যারা আমদানি করেছেন তারা বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনেছেন। তারা বলছেন, বড় আমদানিকারকরা এলসি খুলতে পারলেও ছোট বা মাঝারি ধরনের ব্যবসায়ীরা তো ডলার সঙ্কটে এলসিই খুলতে পারছেন না। চাল আনা তো পরের কথা। সবমিলেই চাল আমদানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে চাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৮৫ কোটি ৯ লাখ ডলার, সেখানে বিদায়ী অর্থবছরে (২০২১-২২) চাল আমদানি হয় ৪২ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের। এ হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরে চাল আমদানি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আর মাস হিসাবে সর্বশেষ গত জুন মাসে চাল আমদানি হয়েছে মাত্র ৫ হাজার টন। এর মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে ১ হাজার টন। চাল আমদানিতে অনিহার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা জানান, যখন এলসি খোলা হয়, তখন প্রতি ডলার ছিল ৯৪ টাকা। আর এখন আমদানিতে প্রতি ডলারের জন্য ব্যয় হচ্ছে ১১৪ টাকা। এক মাসে ডলারের মূল্য বেড়েছে ২০ টাকা। এর সাথে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। সবমিলে দেশের বর্ধিত বাজারের চেয়েও আমদানি চালের মূল্য বেশি পড়ছে।

দেশের অন্যতম চাল আমদানিকারক মজুমদার এন্টারপ্রাইজের মালিক সুব্রত মজুমদার গতকাল সোমবার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার ৪টি কোম্পানি মিলে প্রায় ২২ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন পেয়েছিলাম। প্রায় ৯ হাজার ৭০০ টনের মতো চাল আসছে, মাল এখনো ঢোকেনি। তিনি বলেন, ডলার সঙ্কটটাই এখন বড়। আমরা ৯৪ টাকায় (প্রতি ডলারে) এলসি খুলেছি। এখন বিল পেমেন্ট করতে হচ্ছে ১১২ টাকায়। সুতরাং প্রতি ডলারে ১৮ টাকা বেশি। চাল আনতে আমাদের বহু টাকা লোকসান হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তো কোনো পার্টি মাল আনতে চাইবে না। তারপরও যতটুকু পারা যায় করছি। তিনি বলেন, আজকে ডলারের দাম এক, কালকে আরেক। চাল এনে কত টাকায় বিক্রি করতে পারবো, তাতো জানি না।

তাহলে কি ডলার সঙ্কটের কারণেই চাল আনছেন না বা আনতে পারছেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই আমদানিকারক বলেন, ‘সে রকমই’। তিনি বলেন, ছোটখাটো যারা চাল আমদানির বরাদ্দ পেয়েছিল তাদের কেউই এলসি খোলেনি। যাদের টুকটাক সুযোগ ছিল এলসি খোলার, তারাই কিছুটা আনছেন। ব্যাংক এলসি দিচ্ছে না তো? সব ব্যাংক তো এলসি দেবে না। ডলারের ক্রাইসিস। ছোট ব্যবসায়ীরা পারছেন না। এলসির জন্য বরাদ্দ পেয়েছি ঠিক, কিন্তু চাল আনবো কেমনে?

জয়পুরহাট পাঁচবিবির হেনা এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল হাকিম মণ্ডল বলেন, আমাদের তিন হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন পর্যন্ত এসেছে প্রায় ৩০০ টন। তিনিও ডলার সঙ্কটের কথা জানান। বলেন, ডলারের দাম বেশি। সঙ্কটের কারণে ব্যাংকে এলসি করতে পারছি না। ইন্ডিয়াতেও চালের দাম বেশি। বিভিন্ন রকম সমস্যা আছে।
এক হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি পাওয়া চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ওমর আজম বলেন, চাল আমদানিতে ব্যাংকের মার্জিন দিতে হচ্ছে ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ এক লাখ টাকার ঋণপত্রে ৭৫ হাজার টাকা আমদানিকারককে নগদে দিতে হবে। এই টাকা জোগাড় করে চাল কিনতে গিয়ে দেখা গেল, ভারতে চালের দাম বাড়তি। তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে সরু চাল আমদানিতে শুল্কসহ টনপ্রতি খরচ ৫৬০ ডলার। এখন আমি চালগুলো ট্রাকে করে হিলি দিয়ে আনব, কিন্তু সেই বন্দরে এই চাল খালাস করতে কমপক্ষে এক মাস লাগবে। এখন এই এক মাসে তো ডলারের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ডলারের বাড়তি বিনিময়মূল্য চালের দামে যোগ করলে পরতা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, এর চেয়ে দেশে চালের দাম কম। ’

আমদানিকারকরা বলছেন, ডলারের অস্থিতিশীলতা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে ফেলেছে তাদের। ৯৪ টাকা ডলার দরে চাল কিনে দেশে আসার পর ব্যাংকে টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে দেখা গেল, ডলারের দর ১১৪ টাকা বা আরো বেশি। এই বাড়তি টাকা চালের দামের সাথে যোগ হয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। এখন ওই দামে চাল বিক্রি করতে পারবেন কি না তা অনিশ্চিত। ফলে এই ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না তারা।

আমদানির অনুমতি অকেজো : আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ভারত থেকে বেসরকারি উদ্যোগে চাল আমদানির অনুমতি দিলেও ডলারের অস্থিতিশীলতায় তা কাজে আসছে না। লোকসানের আশঙ্কায় চাল আমদানিতে গো সো নীতি অনুসরণ করছেন আমদানিকারকরা। ফলে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নির্ধারিত পরিমাণ চাল আমদানি হবে কি না তা অনিশ্চিত।
সূত্র জানায়, ভারতে মোটা চালের দাম এখন টনপ্রতি ৩০০ ডলার। অথচ মোটা চালের দাম দেশে এর চেয়ে কম। ফলে সেই চাল আনার সুযোগ নেই। আর সরু চাল আমদানিতে শুল্কসহ খরচ সাড়ে ৫০০ ডলারের বেশি। ডলার মূল্যের অস্থিতিশীলতার কারণে প্রকৃত আমদানি খরচ নির্ধারণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

আমদানিকারকরা জানান, ভারতের বিকল্প হিসেবে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডে চালের জোগান থাকলেও সেখান থেকে চাল আমদানিতে খরচ ভারতের চেয়েও বেশি। এর বাইরে মিয়ানমার থেকেও দেশটির অস্থিরতার কারণে চাল আমদানির সুযোগ নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের আমদানিকারক মাইশা এন্টার প্রাইজের মালিক আবদুল হান্নান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘৯৫ টাকা ডলার রেট ধরে ৩০০ টন চাল আমদানি করেছি। ভেবেছিলাম ডলার রেট ১০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু ডলার রেট পৌঁছল ১২০ টাকায়। ফলে ওই ৩০০ টন চাল আমদানিতেই ১৫-২০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন বলে তিনি জানান। এই ব্যবসায়ী বলেন, আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময়মূল্য নির্দিষ্ট করে না দেয়া হলে চাল আমদানি করে ব্যবসায়ীদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। ডলারের রেট ফিক্সড করা ছাড়া বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ডিউটি তুলে নিলে কোনো লাভ হবে না, বরং সে ক্ষেত্রে ভারত রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দেবে, ফলে দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 


আরো সংবাদ


premium cement