২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯, ১ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

উঁচু জোয়ারে ডুবছে আরো বহু গ্রাম ভাঙছে বেড়িবাঁধ

-

উপকূলীয় এলাকায় টানা বৃষ্টির পাশাপাশি অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে বিপাকে পড়া মানুষের দুর্ভোগ কাটছে না। নতুন করে নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরের উচ্চ জোয়ার ও নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। এতে অনেক স্থানের নিম্নাঞ্চল কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। প্লাবিত হওয়া গ্রামের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কোনো কোনো উপজেলায় পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন বহু মানুষ। অভিযোগ উঠেছে, দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা কোনো ত্রাণও পাচ্ছেন না। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অন্য দিকে একের পর এক ভাঙছে ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরনো সব বেড়িবাঁধ। ফলে নতুন করে বসতি আর ফসলের জমি হারাচ্ছেন ভুক্তভোগী মানুষ।


মনপুরায় ২ কিমি বেড়িবাঁধের ক্ষতি
ভোলা সংবাদদাতা জানান, জেলার মনপুরায় নিম্নচাপ, ঝড়ো বাতাসে মেঘনার পানি বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়ে মূল ভূখণ্ডের ভেতরে ও বাইরে জোয়ারে প্লাবিত হয়। এতে পানির চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের। উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নে ২ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন হাওলাদার।
এ দিকে গতকাল সোমবার উপজেলার হাজিরহাট, ১ নম্বর মনপুরা ও উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের ১০ গ্রামে বেড়ির ভেতরে ও বাইরে জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে ছয় দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে উপজেলার ১০ গ্রামের ২০ হাজার বাসিন্দা। দুর্গত এলাকায় সরকারিভাবে এখনো ত্রাণকার্যক্রম শুরু না করায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে উপকূলজুড়ে। পানিবন্দী থাকার পরও ত্রাণ না পেয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন দাসেরহাট গ্রামের কুলসুম, রহিমা, শাহজাহান, বাছেদ, জয়দেব, রানী দাস। তারা জানান, ছয় দিন পানিবন্দী থাকার পরও ত্রাণ পাইনি। কেউ খোঁজখবর নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের পূর্ব আন্দিরপাড়, পশ্চিম আন্দিরপাড়, কাউয়ারটেক, ঈশ্বরগঞ্জ, কূলাগাজী তালুক গ্রাম ও হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট, সোনারচর, চরযতিন, চরজ্ঞান গ্রাম ও উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের আলমনগর ও মাস্টারহাট এলাকার বেড়ির বাইরে ও ভেতরে ২-৩ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত অবস্থায় রয়েছে। হাজিরহাট ছাড়াও মনপুরা ও উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানরা। এ ব্যাপারে হাজিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন হাওলাদার জানান, বেড়িবাঁধের ক্ষতি ছাড়াও জমির ফসল ও বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে।
এ দিকে গতকাল বেলা ৩টায় মেঘনার পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর প্রবাহিত হয় বলে জানান পাউবো ডিভিশন-২ এর উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুর রহমান। তিনি জানান, জোয়ারের পানির চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের। জোয়ারের পানি কমে গেলেই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের সংস্কার করতে কাজ শুরু করা হবে। তিনি জানান, জোয়ারের পানির চাপে ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে। তবে জোয়ারের পানি কমতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।


দশমিনার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
দশমিনা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, সাত দিন ধরে অবিরাম বর্ষণ আর জোয়ারের পানিতে দশমিনায় তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর পানিতে উপকূলসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে আছে। ওই দুই নদীর বুকচিরে জেগে ওঠা চরবোরহান ইউনিয়ন ৩-৪ ফুট পানিতে ডুবে রয়েছে। এতে ওই ইউনিয়নের ৩০ হাজার মানুষ গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
গতকাল সোমবার সকালে সরেজমিনে চরবোরহান ইউনিয়ন ঘুরে এরকম চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় ইউপি ভবন পানিতে ডুবে থাকায় কার্যক্রমে বিঘœ ঘটছে। এ ছাড়াও পানিতে ডুবে রয়েছে ১১টি প্রাথমিক ও ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তলিয়ে রয়েছে পাগলা বাজার, সেন্টার বাজার ও চরশাহজালাল বাজারসহ কয়েকটি হাটবাজার। চরবোরহান ইউনিয়নে বিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রধান সড়কের সংযোগ সড়ক না থাকায় কলার ভেলা ও নৌকায় করে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এলেও পানির ভয়াবহতা দেখে বিদ্যালয় বন্ধ রাখেন শিক্ষকরা। এ ছাড়াও পাঁচ শতাধিক পুকুর ও মাছের ঘের এবং ২০ হাজার একর জমির আমন বীজতলা ডুবে আছে পানিতে।
চরবোরহান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো: নজির আহমেদ সরদার জানান, প্রতি বছরই দুর্যোগ মোকাবেলা করে বেঁচে আছে এলাকার মানুষ। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারি আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ছুটেছি কোনো কাজ হয়নি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আল হেলাল বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং চরবোরহানে পানিবন্দী মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


পাইকগাছায় বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত
পাইকগাছা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, পাইকগাছায় শিবসার অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে পাউবোর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে কয়েক শ’ ছোট-বড় মৎস্য ঘের। বহু বসতবাড়িতে ঢুকে পড়েছে লোনাপানি। গত রোববার দুপুরে প্রবল জোয়ারে উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নের পাউবোর ২৩ নম্বর পোল্ডারের বয়ারঝাঁপা এলাকার ভাঙ্গাহাড়িয়া নামক স্থানে প্রায় ৩০ ফুট বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বাঁধ নির্মাণ সম্ভব না হলে রাতের জোয়ারে এ ইউনিয়নের পাঁচ গ্রাম লোনাপানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। আরেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান গাজী জানান, তার ইউনিয়নাধীন শিবসা নদীর তীরবর্তী বয়ারঝাঁপার ভাঙ্গাহাড়িয়া নামক স্থানে ওয়াপদার দুর্বল বেড়িবাঁধটি ভেঙে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো: রাজু হাওলাদার জানান, উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধটি প্রাথমিকভাবে মেরামত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম জানান, বৈরী আবহাওয়ায় শিবসা নদীর প্রবল জোয়ারের উগরে দেয়া পানিতে পাউবোর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।


মোরেলগঞ্জে প্লাবিত ২০ গ্রাম
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, মোরেলগঞ্জে পূর্ণিমার জোয়ারের অতিরিক্ত পানিতে দিন-রাতে দু’বার পানির নিচে তলিয়ে যায় মোরেলগঞ্জ পৌর বাজারসহ নিম্নাঞ্চলের ২০টি গ্রাম। বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচ শতাধিক মাছের ঘেরে ঢুকেছে পানি। ভেঙে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি ও রাস্তা। ফেরির গ্যাংওয়ে তলিয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় যানবাহন ও মানুষ চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে স্থবির হয়ে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
শহরের কাপুডিয়াপট্টি সড়ক, কাঁচাবাজার, কেজি স্কুল সড়ক, ফেরিঘাটসংলগ্ন কালাচাঁদ মাজার এলাকা, সানকিভাঙ্গা, বারইখালী, গ্রাম প্লাবিত হয়ে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৩-৪ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। দুপুরের রান্না হচ্ছে না বারইখালী ফেরিঘাট এলাকা ও খাউলিয়া ইউনিয়নের নিশানবাড়ীয়া গ্রামে। মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের অনেক পরিবার তাদের ঘরে তালা দিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এ বিষয়ে বাগেরহাট-৪ আসনের এমপি আমিরুল আলম মিলন বলেন, খাউলিয়া ইউনিয়নের কুমারখালী হয়ে বহরবুনিয়া ইউনিয়নের ঘষিয়াখালী পর্যন্ত নদী প্রটেকশন ওয়াল করার প্রস্তাবটি একনেক সভায় পাস হয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে।

 


আরো সংবাদ


premium cement