০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

বিএনপির সমাবেশের মূল্যায়ন

বিএনপির সমাবেশের মূল্যায়ন -

দীর্ঘদিন পর বেশ কয়েকটি ইস্যুতে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিশাল সমাবেশ করেছে বিএনপি। যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মুখে বেশ আলোচনা চলছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি যে ক’টি সমাবেশ করেছে তন্মধ্যে সেদিনের সমাবেশে লোকসমাগম ছিল লক্ষণীয়। সাধারণত বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করলে মাইক লাগানো হতো ৪-৫টি বা তারও কম। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ওই সমাবেশ উপলক্ষে পাঁচটি ট্রাক একত্রিত করে উন্মুক্ত মঞ্চ বানানো হয়। বেলা ২টায় শুরু হওয়া সমাবেশ শেষ হয় বিকেল ৬টায়। ঢাকার বিজয়নগর পানির ট্যাংকি, কাকরাইল মোড়, ফকিরাপুল মোড়, শান্তিনগর মোড় এমনকি আরামবাগ পর্যন্ত পুরো সড়কে ও ফুটপাথে হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সমাবেশটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এসব এলাকায় পিলারে লাগানো হয় প্রায় ৫০টি মাইক। যদিও সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ঢাকা মহানগর ও পার্শ¦বর্তী নরসিংদী, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ জেলার কয়েক হাজার নেতাকর্মী বিএনপির সমাবেশে জমায়েত হয়েছিলেন। তারা অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সরকারের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের নজিরবিহীন লোডশেডিং, গণপরিবহনের ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, পুলিশের গুলিতে ভোলা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূরে আলম ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আব্দুর রহিম হত্যার প্রতিবাদে এই সমাবেশের ডাক দেয় বিএনপি। এসব দাবিতে আগামী ২২ আগস্ট থেকে সব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ-সমাবেশ করবে বিএনপি। সর্বশেষ ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে সমাবেশ করেছিল দলটি।

সমাবেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপির সমাবেশের মাধ্যমে তৃণমূলে একটি বার্তা গেছে সেটি হলো- বিএনপি এখনো সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ। আমাদের নেতাকর্মীরা সবাই আশাবাদী। তিনি বলেন, সেদিনের সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ ও নেতকর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে বিএনপি বাংলাদেশের সুসংহত, বৃহত্তর, গণতান্ত্রিক ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়েও বিক্ষোভ সমাবেশ হবে। জনগণের ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগে বাধ্য হবে ইনশাআল্লাহ।

বৃহস্পতিবারের মহাসমাবেশ প্রসঙ্গে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ড. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিল নয়া দিগন্তকে বলেন, সম্প্রতি বিএনপি যে কয়েকটি সমাবেশ করেছে তন্মধ্যে বৃহস্পতিবারের সমাবেশটি ছিল ভিন্ন। যা রূপ নিয়েছিল মহাসমাবেশে। অনেকেই ভেবেছে যে, বিএনপি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু সেদিনের মহাসমাবেশে ঢাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে, বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল, ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক, জনপ্রিয় ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এই সমাবেশটি সরকারের জন্য এই বার্তা বহন করছে যে, বিএনপি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। দেশের মানুষ সরকারকে বিদায়ে ঐক্যবদ্ধ। সরকারের পতন পর্যন্ত এমন কর্মসূচি চালু রাখার মত দেন তিনি।

নেত্রকোনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা: আনোয়ারুল হক বলেন, বর্তমান সরকার যে ভোট ডাকাত সেটা ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। এই সরকার ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতায় থেকে যা খুশি তাই করছে। তারা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে জনগণকে আরো বেশি কষ্টে ফেলেছে। আমি মনে করি এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা ভোট ডাকাতির সুযোগ পাবে না। জনগণই তাদেরকে প্রতিহত করবে। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বিএনপির সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে বিএনপি এদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। আমরা তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছি এবং যেকোনো আন্দোলনে থাকব ইনশাআল্লাহ।

সমাবেশে অসংখ্য লোকসমাগম দেখে নোয়াখালী জেলা বিএনপির উপদেষ্টা প্রকৌশলী মো: আমিরুল মোমিন (বাবুল) নয়া দিগন্তকে বলেন, ক্ষমতাসীন ‘অবৈধ ফ্যাসিস্ট’ সরকারের দুঃশাসনে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। এমনিতেই করোনার ছোবলে জনগণ ছন্নছাড়া। উপরন্তু জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে মানুষ এখন অসহায়। এ জন্য তারা এখন বাঁচার পথ খুঁজছে। আর বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছে। জনকল্যাণে কাজ করছে। বৃহস্পতিবার বিএনপির মহাসমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে দেশের মানুষ এক মুহূর্তও ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সুতরাং সরকারের উচিত অবিলম্বে পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফেরদৌস মুন্না তার ফেসবুকে লিখেছেন- বৃহস্পতিবার স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয়েছে নয়াপল্টনে। আশা জাগানিয়া ব্যাপার হলো সমাবেশে আসা কর্মীরা আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তাদের কথা একটাই এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না, হয় বাঁচার মতো বাঁচবো না হয় রাজপথেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব। এই প্রত্যয়কে ‘ক্যাপিটালাইজ’ করার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই করতে হবে। অতীতের মতো ভুল করা যাবে না। দেশের ৮০ ভাগ জনগণই এই দুঃশাসন থেকে মুক্তি চায়। লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থপাচার দেশেটাকে সত্যিকার অর্থেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বানিয়েছে। যার নিদর্শন কিন্তু অলরেডি জনগণ দেখতে পাচ্ছে। আশঙ্কার ব্যাপার হলো এরপর যারাই আসুক তাদের দেশ পরিচালনাটা দুঃসাধ্য কাজ হবে। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকেই বাকশালীরা ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বড় বড় কথা আর কাল্পনিক উন্নয়নের গল্প দেশের জনগণ আর শুনতে চায় না।

নরসিংদী জেলা বিএনপির সদস্য মো: রফিকুল আমিন ভুঁইয়া রুহুল নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যত অন্যায় অপকর্ম করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত তাদেরকে দিতে হবে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়িয়ে তারা জনগণের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারকে তছনছ করেছে। জনগণ এই সরকারকে বিদায়ের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। বিএনপির নেতৃত্বে দেশের জনগণ এখন প্রস্তুত। বিএনপির সমাবেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ সেই ইঙ্গিতই বহন করে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি না মানলে রাজপথেই এর ফয়সালা হবে।

 


আরো সংবাদ


premium cement

সকল