১৩ আগস্ট ২০২২
`

পশুহাটে বাড়ছে বিক্রি

রাজধানীতে গরু, ছাগল, মহিষের পাশাপাশি দুম্বার দেখা মিলছে -

রাজধানীর পশুহাটে গরু-ছাগলের বিক্রি বেড়েছে। তবে এখনো জমেনি হাট। আজ থেকে হাটে পশু বিক্রি বাড়তে পারে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা। রাজধানীর প্রতিটি হাটেই গরু-ছাগল প্রচুর এসেছে। এসব গবাদিপশুর বেশির ভাগই যতœ করে কোরবানির সময় বিক্রির জন্য লালন-পালন করা। স্বাস্থ্যবান এসব পশুর দামও তাই বেশ চড়া। হাটে ছোট পশু খুবই কম। সেগুলোরও দাম ৭০-৮০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। মাঝারি আকারের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে দেড় থেকে তিন লাখ টাকা। এ ছাড়া বৃহৎ আকারের গরু ৬ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকাও চাওয়া হচ্ছে। তবে রাজধানীতে পশু কেনার পর রাখা ও যতœ করার পরিবেশ না থাকায় বেশির ভাগ ক্রেতাই ঈদের দুয়েক দিন আগে কোরবানির পশু কিনে থাকেন। এ কারণে গত কয়েক দিনে হাটে পশু এলেও তেমন বিক্রি হয়নি। কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল বিকেল থেকে হাটে ক্রেতার সমাগম বাড়তে থাকে। তবে সকালের বৃষ্টির কারণে হাটে কাদাপানিতে ক্রেতাদের চলাচলে বিঘœ হচ্ছে। এর মধ্যেও এ দিন কিছু পশু বিক্রি হয়েছে। তবে এখনো আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে না। ঈদের আর মাত্র তিন দিন বাকি থাকায় আজ থেকে বিক্রি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিক্রেতারা।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে পশু লালন-পালন খরচ বেড়ে যাওয়া ও যতেœর কারণে গরুর আকার বড় হওয়ায় দাম বেশি চাচ্ছেন বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন। তবে বেশি দামে গরু কেনার মানুষ খুবই কম। মাঝারি আকারের গরুর দিকেই নজর বেশি সবার। ক্রেতারা মনে করছেন মাঝারি গরুর দাম এখনো বেশি চাচ্ছেন বিক্রেতারা। সময় যত বাড়বে দামও কমতে পারে। আর হাটে এত পরিমাণ গরু-ছাগল এসেছে দাম না কমালে শেষ দিকে গরু নিয়ে বিপদে পড়তে পারেন দূরের জেলা থেকে আসা বিক্রেতারা।

উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সঙ্ঘের মাঠে স্থাপিত হাটে এবার গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি পশু এসেছে। গরুর পাশপাশি ছাগলের জন্যও আলাদা স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ওই হাটে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে হাটের মাঝপথে কাদাপানিতে একাকার অবস্থা। এর মধ্যেই কিছু ক্রেতা গরুর দাম যাচাই-বাছাই করছেন। শাহিনুর রহমান নামে একজন ব্যবসায়ী ৯৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কেনেন। তিনি বলেন, হাটে গরুর দাম অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগই লাখের ওপর দাম। অনেক দরদাম করে এই গরুটি ৯৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি। সাথে হাসিলও দিতে হচ্ছে পৌঁনে পাঁচ হাজার টাকা। ফলে প্রায় এক লাখ টাকায় পড়ে গেল।

শাজাহানপুর হাটের বিক্রেতা লিমন জানান, তিনি দুই দিন হলো বাজারে গুরু নিয়ে এসেছেন। এখনো একটাও বিক্রি করতে পারেননি। তার ভাষ্য, মানুষ এখন শুধু বাজার ঘুরে দেখছেন। যারা আসেন তারা দাম শুনেই চলে যান। দরদামও করেন না। দামের বিষয়ে তিনি বলেন, এবার দাম একটু বেশি। কারণ গরুর খাবারের দাম বেড়েছে। ফলে দামও বেড়েছে।

ঝিনাইদহ থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী কালাম বলেন, হাটে বিক্রি এখনো জমেনি। দু-একটি মাঝে মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার মানুষের গরু রাখার জায়গা নেই। তাই আগেভাগে কেনে না। একজন এক লাখ ৩২ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছেন। তিনি ৩২ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। কিন্তু গরু নিয়ে যাননি। বাকি এক লাখ টাকা দিয়ে পরে নিয়ে যাবেন। একইভাবে আরেকটি গরু একজন এক লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে রেখে গেছে। কিছু টাকা দিয়ে গেছে। কিন্তু গরু নিয়ে যাননি। পরে টাকা দিয়ে নিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন।

ছাগলের হাটেও দেখা যায় ক্রেতার তেমন সমাগম নেই। বেশির ভাগ ছাগল ১০ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা দাম চাচ্ছেন বিক্রেতারা।

গতকাল আফতাবনগর হাটে দেখা যায়, গরুর বিক্রি আগের তুলনায় বেড়েছে। পশু নিতে ক্রেতাদের উপস্থিতিও বেড়েছে আগের তুলনায় যথেষ্ট। তবে বেশির ভাগ ক্রেতাই দরদাম করছেন। কিনছেন খুব অল্প সংখ্যক লোকই।
কুষ্টিয়া থেকে দু’টি বড় গরু নিয়ে রাজধানীর এ হাটে এসেছেন জাকির হোসেন। প্রতিটি গরুর দাম হাঁকছেন সাড়ে ৮ লাখ টাকা। অনেক আশা করে হাটে দু’টি গরু নিয়ে এলেও কাক্সিক্ষত ক্রেতা মিলছে না। তবে ঈদের আগের দুই দিন শুক্র ও শনিবার কাক্সিক্ষত ক্রেতা মিলবে বলে আশা করছেন তিনি।

গাবতলী হাট ঘুরে দেখা গেছে, এখানে বড় গরুর ক্রেতা কম। যেসব ক্রেতা আসছেন তারাও আশানুরূপ দাম বলছেন না। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে গাবতলীর হাটে একটি বড় গরু তুলেছেন আব্দুর রহিম। তার দাবি, বড় গরুর দাম আশানুরূপ বলা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ১৫ লাখ টাকা দামের গরু বলা হচ্ছে খুবই কম, যা বলার মতো নয়। তবে সামনে বড় গরুর ক্রেতা হাটে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেন আব্দুর রহিম।

মেহেরপুর থেকে ১০টি বড় গরু হাটে তুলেছেন সাজেদুল হক। গরুভেদে দাম হাঁকা হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। তবে এখনো গরু বিক্রি করতে পারেননি তিনি। সাজেদুল বলেন, ঢাকায় বড় গরু কিনে রাখা (জায়গা) সমস্যা। ঈদের আগে শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি, তখন ক্রেতা পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে হাটে মাঝারি আকারের গরু বিক্রি হচ্ছে। ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডু থেকে ২৫টি গরু নিয়ে এসেছেন আসলাম। তিনি বলেন, আমার গরুর দাম এক লাখ ২০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে। গত তিন দিনে চারটি গরু বিক্রি করেছি। এগুলোর দাম এক লাখ ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে। আগামী দুই দিনে বাকি পশুগুলো বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ভাঙ্গা মসজিদ এলাকায় সাদেক এগ্রো ফার্মে বড় আকারের গরুর পাশাপাশি এবার গোলাপী রঙের মহিষ বিক্রি হচ্ছে। ভারত থেকে আনা এসব মহিষের দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। বিক্রেতারা জানান, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি মহিষ বিক্রি হয়েছে। আরো ১০টির মতো মহিষ বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে দুম্বাও রয়েছে। প্রতিটির দাম চাওয়া হচ্ছে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা।

কমলাপুরে গরু নিয়ে আসা ব্যাপারি শরিফ জানান, বাজারে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। কারণ যারা এখন আসছেন তারা না কিনলেও ছোট গরুর দাম জানতে চাইছেন। আর বড় যেগুলো সেগুলোর ক্রেতা এখনো আসেননি।
এ বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় স্থায়ী হাট সারুলিয়া ছাড়াও অস্থায়ী আরো ১০টি হাট বসেছে। অন্য দিকে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় গাবতলী হাট ছাড়াও ৯টি হাট বসেছে। এর মধ্যে ডিএনসিসির গাবতলী, বছিলা, আফতাবনগর, ভাটারা, কাওলা ও উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের পশুহাটসহ ছয়টিতে ডিজিটাল লেনদেনের জন্য বুথ বসানো হয়েছে।

সিলেটে পশুর হাটে ক্রেতা নেই
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যার ঘাটতি রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা পশুর ঘাটতি হবে না জানিয়ে বলছেন, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মজুদ রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০৩টি। এ ছাড়া এবার ঘর থেকে আরো দেড় লক্ষাধিক পশু কোরবানির কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে সিলেটে এবার কোরবানি হবে প্রায় চার লাখ পশু। গেল বছর সিলেট বিভাগে এই সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার। এর বিপরীতে পশুর চাহিদা উল্লেখ করা হয় ৪ লাখ ৫০ থেকে ৫৫ হাজার। আর ওই সময়টাতে সিলেট বিভাগে কোরবানি হয়েছিল চার লাখ আট হাজার ৯৮০টি পশু। সেই হিসাবে সিলেট বিভাগে কোরবানির পশু গেল বছর থেকে কমেছে এক লাখ ৭৯ হাজার ৭৯৪টি। আর পশুর ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। যদিও যথাসময়ে এ চাহিদা পূরণ হবে বলে মনে করছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগের দায়িত্বশীলরা।

এক দিকে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত সিলেট অঞ্চলের লোকজন। তার ওপর বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে প্রাণিসম্পদের। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী বন্যায় মারা গেছে পশু, মহিষ ও ছাগল-ভেড়াসহ গৃহপালিত প্রায় ২১ হাজার পশু। এখনো পানিতে নিমজ্জিত গ্রামীণ জনপদ। ধীরে ধীরে পানি নামলেও বানের পানি এখনো সহনীয় পর্যায়ে নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার অপেক্ষায় উন্মুখ বানযুদ্ধের লাখ লাখ মানুষ। এমতাবস্থায় দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।

বন্যায় ক্ষতির শিকার হয়েছেন খামার মালিকরাও। তবে আসন্ন কোরবানির ঈদেও স্বস্তি নেই খামারিদের মনে। নিজ খামারের ২৩টি গরু নিয়ে এভাবেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিলেট নগরীর কাস্টঘরের খামারি জসিম উদ্দিন। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ধারদেনা করে ২৩টি গরু আট মাস ধরে খামারে রেখে পরিচর্যা করছেন তিনি। খামারে রয়েছে তিনজন শ্রমিক। কিন্তু তৃতীয় দফার বন্যায় পানিতে তলিয়ে যায় জসিম উদ্দিনের গরুর খামার। অগত্যা খামারের গরুগুলো মেইন রাস্তার পাশে একটি ত্রিপল টাঙিয়ে স্থানান্তর করেন তিনি। কিন্তু ঈদের মাত্র পাঁচ দিন হাতে থাকলেও দুশ্চিন্তার অন্ত নেই জসিমের। যে হাটে তিনি গরুগুলো বিক্রির জন্য তুলবেন। নগরীর বৃহত্তম সেই হাট কাজিরবাজারে শনিবার পর্যন্ত পশুর সংখ্যা ছিল হতাশাজনক। সেখানে এখনো বিক্রেতার সাক্ষাৎ পাননি তিনি।

দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালবাজার এলাকার খামারি আব্দুস সাত্তার প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে খামার গড়ে তুলেছেন। সেখানে এখন বিক্রির জন্য উপযুক্ত গরু আছে ৪০টি। ঈদে সেগুলো বিক্রি করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু এখনো হাট না বসায় তিনি লোকসানের শঙ্কায় আছেন।

কাজিরবাজার পশুর হাটের ব্যবস্থাপক শাহাদাত হোসেন লোলন জানান, সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার খামারি ও ব্যবসায়ীরা ট্রাকে করে পশু নিয়ে আসেন। এবার বন্যায় বেশির ভাগ সড়ক তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে কেউ পশু নিয়েও আসতে পারছেন না। তবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুয়েক দিনের মধ্যে হাটে পশুর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আনাগোনা বাড়বে ক্রেতা-বিক্রেতারও।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, তিন দফা বন্যার পরও সিলেটে ঘাটতি হবে না কোরবানিযোগ্য পশুর। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সিলেটের বাইরে থেকে প্রতিবারই প্রচুর পরিমাণ পশু সিলেটে আসে। যে কারণে চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে এ বছর কোরবানিও কমতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

সিলেট জেলা ও মহানগরে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৪১টি কোরবানির পশুর হাট বসার অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন।


আরো সংবাদ


premium cement