১৩ আগস্ট ২০২২
`

বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছেই দুর্ভোগ কমছে না সাধারণের

-

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের গতকালও তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের দিনের মতোই গতকালও রাজধানীসহ সারা দেশেই লোডশেডিং হয়েছে। তবে কোনো কোনো এলাকায় তুলনামূলক কম হলেও অন্য এলাকায় বেশি হয়েছে। যদিও পিডিবির হিসাব অনুযায়ী গতকাল সর্বোচ্চ চাহিদা ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ঘাটতি দেখানো হয়েছিল প্রায় আড়াই শ’ মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি না হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, গতকাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা ছিল ২৫২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে ৮৭ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে সরবরাহের ঘাটতি ছিল ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৬১ ভাগ। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ। যেখানে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৫২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস দিয়ে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের গ্যাসের রিজার্ভ ফুরিয়ে আসছে। এত দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যতটুকু জোর দেয়া হয়েছিল, বিদ্যুতের প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চয়তার জন্য গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে ততটা জোর দেয়া হয়নি। এটাই দেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, করোনা পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সবধরনের জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। ঘাটতি পূরণের জন্য দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প এলএনএজি আমদানি করতে হচ্ছে উচ্চমূল্যে। এমনিতেই রফতানি ও রেমিট্যান্সের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে মার্কিন ডলারের ওপর। ইতোমধ্যে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে পণ্যমূল্যের ওপর। এখন উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যার প্রভাবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। আর এরই প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সাথে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের দিকে সমানতালে জোর দেয়া হলে আজকের পরিস্থিতির হয়তো সম্মুখীন হতে হতো না।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এক বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানানোর সাথে সাথে জ্বালানি খাতের অনেক বিষয়ই স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আমাদের বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের উৎপাদন ২৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বাকি বৃহৎ অংশ এলএনজি আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময়ও গ্যাসের উৎপাদন ছিল মাত্র দৈনিক ১৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখান থেকে আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছিলাম দৈনিক ২৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমরা এ সক্ষমতায় গ্যাস উৎপাদন করেছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের খনিগুলোর রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণে আমাদের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, এলএনজি আমদানির জন্য কাতার ও ওমানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমরা এলএনজি পাচ্ছি। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি আমদানি করতাম। কোভিড-১৯ এর আগে আমরা এক ইউনিট এলএনজি ৪ ডলারেও আমদানি করেছি কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা ৪১ ডলারও ছাড়িয়ে গেছে। এত উচ্চমূল্যে আমদানি করলে আমাদের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ তৈরি হবে। শুধু গ্যাসের দামই না। বেড়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ডিজেল ব্যারেল প্রতি ৭৭ ডলার ছিল সেটা এ বছরের জুনে ১৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
নিজস্ব জ্বালানির অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান কূপগুলোতে আরো গভীরে খনন করে গ্যাসের অনুসন্ধান কাজ চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী ৩ বছরের একটা আপগ্রেডেশন, ওয়ার্কওভারের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি যাতে করে ৪৬টি কূপ থেকে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নতুন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
এ দিকে এমনিতেই ভ্যাপসা গরম, এর ওপর বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিত্তবানরা নিজস্ব উদ্যোগে বিকল্প বিদ্যুৎ হিসেবে আইপিএস ব্যবহার করে লোডশেডিংয়ের সময়ে সাময়িক অসুবিধা মিটাচ্ছেন, কিন্তু বেশির ভাগই লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন। ইতোমধ্যে সারা দেশের বিভিন্ন জেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তার ওপর ঈদের পর ছাত্রছাত্রীদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় মন বসাতে পারছে না। এ দুর্ভোগ কবে কাটবে তারও কোনো উত্তর মিলছে না বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে।
নোয়াখালী অফিস জানায়, লোডশেডিংয়ের কবলে নোয়াখালীর লাখ লাখ মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এবং সেই সাথে ভ্যাপসা গরমে জীনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতের ছয় লক্ষাধিক গ্রাহকের দুর্ভোগের শেষ নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় কলকারখানায় উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া নষ্ট হচ্ছে। এক সময় শুধু সন্ধ্যায় ও প্রথম রাতে লোডশেডিং হলেও সম্প্রতি দিনরাত সমানে চলছে লোডশেডিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে মাসের শেষে মিনিমাম চার্জ দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এদিকে প্রচণ্ড গরমে হাঁফিয়ে উঠছেন এলাকাবাসী। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।
নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জি এম গোলাম মোস্তফা লোডশেডিংয়ের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তাদের ১৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তাই লোডশেডিং করা হচ্ছে।
দিনাজপুর সংবাদদাতা জানান, উত্তরের জেলা দিনাজপুর হঠাৎ ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অসহনীয় দিন-রাত পার করছে মানুষ। দীর্ঘ দিন বিদ্যুতের এমন সমস্যা ছিল না। হঠাৎ কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো তার কোনো সদুত্তর মিলছে না। জেলাজুড়ে গত ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে এই ভয়াবহ বিপর্যয়। একবার বিদ্যুৎ গেলে আসার কোনো সময় থাকছে না। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ১২-১৪ ঘণ্টা। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ব্যাপারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণ বিভাগ কোনো সঠিক কথা বলতে পারছে না। কেবল দিনাজপুর জেলা নয়, আশপাশ জেলাগুলোতেও বিদ্যুতের এমন নাকাল অবস্থা চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
দিনাজপুরসহ এ অঞ্চলের জেলাগুলোতে চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না নর্দান ইলেকট্রিসিটি পাওয়ার কোম্পানি (নেসকো) লিমিটেড। এতে অফিসে-আদালতের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। জেনারেটর, আইপিএস ও ইউপিএস কোনো কিছু দিয়েই অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, দোকানপাট ও বাসাবাড়ি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। পচতে শুরু করেছে বাড়ির ফ্রিজের মাছ-গোশত, শাক-সবজি ও ফলমূল। ভোর নেই, সকাল নেই, দুপুর নেই, সন্ধ্যা নেই, রাত নেইÑ বিদ্যুতের আসা-যাওয়া চলছে আধা ঘণ্টা পরপর। কোনো কোনো এলাকায় আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দিচ্ছে নেসকো।
নেসকো সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১২০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৬০ মেগাওয়াট। দিনাজপুর নেসকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর মোট চাহিদা ২০ মেগাওয়াট আর সরবরাহ পাচ্ছে ১১ মেগাওয়াট। একইভাবে দিনাজপুর নেসকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর মোট চাহিদা ২২ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে ক’দিন ধরে জেলায় সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেক বা তার থেকেও কম। ফলে দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলেও বাকি অর্ধেক সময় বিদ্যুৎহীনই থাকছে।
দিনাজপুর নেসকো লিমিটেডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম শাহাদত হোসেন জানান, এটি দিনাজপুরের একক সমস্যা নয়, জাতীয় সমস্যা। জ্বালানি সঙ্কটের কারণে এই বিদ্যুৎসঙ্কট। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। কবে নাগাদ এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তারও কোনো সঠিক উত্তর জানা নেই। তাই তাদেরকে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ এক ঘণ্টা অন ও এক ঘণ্টা অফ রাখতে হচ্ছে। সেই হিসেবে দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাই থাকছে লোডশেডিং। সমস্যাটা কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে সে প্রশ্নে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেনÑ সেটা তারাও জানেন না।
সিলেট ব্যুরো জানায়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশব্যাপী লোডশেডিং দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এলাকাভিত্তিক রুটিন করে নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিং দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ দিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিলেটে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর আওতাধীন এলাকাগুলোতে লোডশেডিংয়ের সময় নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে এর বাইরেও লোডশেডিং হতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
লোডশেডিংয়ের সময় নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিউবো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শামস-ই আরেফিন বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা এলাকাভিত্তিক প্রাথমিক একটি রুটিন করেছি। উৎপাদনে বেশি ঘাটতি না হলে আমরা চেষ্টা করব এই রুটিন ফলো করতে। তবে ঘাটতি বেশি হলে এই সময়েরও ব্যত্যয় ঘটতে পারে। অথবা ঘাটতি কম হলে তার চাইতেও কম সময় লোডশেডিং হতে পারে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করে লোডশেডিং অনেকটা এড়ানো সম্ভব। সিলেটে পিডিবি-২ দফতরের আওতায় ৬০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। যদি পিক আওয়ারে প্রত্যেকে গড়ে ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ বন্ধ রাখেন তাহলে মোট ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। ফলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমে আসবে। এমতাবস্থায় সব গ্রাহক পিক সময়ে অন্তত একটি ফ্যান এবং অপ্রয়োজনীয় বাতি বন্ধ রেখে জাতীয় সঙ্কট মুহূর্তে সহযোগিতা করবেনÑ এটাই আশা করছি।


আরো সংবাদ


premium cement