১৩ আগস্ট ২০২২
`

সারা বছরই মিলবে আমসহ সুমিষ্ট ঔষধিগুণের ফল

হর্টিকালচারগুলোতে ৯৬ জাতের আম, এক গাছেই ৮ জাতের আম; আগামী দিনের সম্ভাবনায় দামি ঔষধিগুণসম্পন্ন ফল লংগান-রাম্বুটান ও অ্যাভোকাডো
-

ছোট একটা আমগাছ। প্রত্যেক ডালেই রয়েছে নানা রকম আম। এর কোনোটা পাকা পাকা ভাব; কোনোটা অল্প সময়ের মধ্যেই পাকবে; কোনোটা আবার একেবারেই ছোট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের নামের সাথে মিল রেখে এরকমই উদ্যোগ দেখা গেল মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে। বারো মাসেই এই গাছ থেকে পাওয়া যাবে সুমিষ্ট আম। হর্টিকালচার সেন্টারের উপসহকারী উদ্যান কর্মকর্তা মো: ইব্রাহিম খান জানালেন, প্রকল্পের নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যাতে এক গাছ থেকেই সারা বছর আম পাওয়া যায়, সেজন্যই একটি মাতৃগাছে আট জাতের আমের কলম সংযোজন করা হয়েছে। যেখানে বারি-১১ জাত, যেটা নাবি জাত, পাকবে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। রয়েছে কাটিমন, সেটাও নাবি জাতের। এ ছাড়া গুরমতি, কিউজাই, আপেল স্টার, ব্রুনাই কিং,আ¤্ররুপালি এবং এ সময়ের সবচেয়ে দামি মিয়াজাকি আমও রয়েছে এই গাছে। শীত, গ্রীষ্ম কী বর্ষাÑ সব মৌসুমেই এই গাছটি থেকে মিলবে আম।
সম্প্রতি সরেজমিনে মাদারীপুর, পটুয়াখালী ও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর হর্টিকালচার সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে আমসহ নানা রকম ফলের সমাহার চোখে পড়ে এ প্রতিবেদকের। যাদের মধ্যে অনেক ফলই রয়েছে, যা বাংলাদেশে একেবারেই নতুন। যেগুলোর দামও অনেক বেশি। আগামী দিনের ফল হিসেবে মাতৃগাছ সম্প্রসারণের কাজ চলছে হর্টিকালচার সেন্টারগুলোতে। এর মধে দেশজুড়ে লিচু জাতীয় থাই/ ভিয়েতনামী লংগান, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো ফলের বিস্তারে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এই ফলগুলো যেমন বেশি মূল্যের, তেমনি এগুলো পুষ্টিসমৃদ্ধ। পাশাপাশি ক্যান্সাসহ রোগ প্রতিরোধী ও ঔষুধি গুণসম্পন্নও বটে।
বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ জানান, দেশে বর্তমানে ৭৩টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। যেখানে শুধু আমের জাতই রয়েছে ৯৬টি। এর মধ্যে বিদেশী জাত রয়েছে ১৬টি। মিয়া জাকির মতো বিশ্ববিখ্যাত এবং দামি আমের জাতও রয়েছে। তিনি বলেন, আগাম আম, নাবি আম, বারো মাসি আমÑ সব ধরনের আমের জাতই সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বারো মাসে তথা ৩৬৫ দিনের যেকোনো দিন কেউ যদি মনে করে আজ এক মণ আম চাই, তা তারা পাবেন। এমন পরিকল্পনা নিয়ে নানা জাতের আমের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। শুধু আম নয়, লিচু জাতীয় নানা ফলসহ অন্যান্য দেশী-বিদেশী ফলও মিলবে সারা বছরই।
পৃথিবীতে পুষ্টিকর ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম অ্যাভোকাডো। ফলটির নানান ঔষুধি গুণাগুণের পাশাপাশি আছে আকাশচুম্বী দাম। অ্যাভোকাডো সম্পর্কে কৃষিবিদরা বলছেন, এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি ফল। অর্ধযুগ আগে দেশে অ্যাভোকাডোর গাছ হাতেগোনা কয়েকটি থাকলেও বর্তমানে তা অনেক গুণ বেড়েছে। এই ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে গিয়ে অ্যাভোকাডো গাছের দেখা মেলে। বৃহৎ আকারের গম্বু^জ আকৃতির চির সবুজ গাছ। গাছে ছোট ছোট হালকা সবুজ রঙের থোকায় থোকায় ফল ধরেছে। দেখতে অনেকটা আমের মতো। ফলের মধ্যে বেশির ভাগ মূলত কার্বোহাইড্রেট থাকে। তবে অ্যাভোকাডোতে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পরিমাণ বেশি। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ বিদেশী ফলটিতে ভিটামিন সি, মিনারেল, শর্করা ও প্রোটিন বিদ্যমান। অ্যাভোক্যাডোর অভ্যন্তরীণ হলুদ-সবুজ মাংসল অংশ খাওয়া হয়, তবে খোসা এবং বিচি ফেলে দেয়া হয়। এতে ২০ রকমের ভিটামিন এবং খনিজসহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। মূলত আফ্রিকান দেশে এই অ্যাভোকাডোর চাষ বেশি হয়ে থাকে। এই ফলের চাহিদা পৃথিবীজুড়ে। ডিএই এর হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর মাধ্যমে অ্যাভোকাডোসহ অন্যান্য চড়া দামের যেসব ফল ও ফসল রয়েছে সেগুলোর সম্প্রসারণ নিয়ে কাজ করছে। স্বাস্থ্য ও রূপচর্চাবিদরা বলছেন, পাকা অ্যাভোকাডো ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে যা ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে পুষ্টি জোগায়। এ ছাড়া পেন্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি৫) প্রায় প্রতিটি ত্বক এবং চুলের যতেœর তৈরি প্রসাধনীতে থাকে। অ্যাভোকাডোতে প্যান্টোথেনিক অ্যাসিডের ৪৫ শতাংশ আরডিএ থাকে। যা ত্বক ময়েশ্চারাইজ করতে সহায়তা করে এবং ত্বকে লাবণ্য আনতে সাহায্য করে। সব ধরনের ত্বকেই অ্যাভোকাডো ব্যবহার করা যায়।
ফল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশবাসীর পুষ্টির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্প গ্রহণ করে। যদিও এই প্রকল্পটি এখন শেষের দিকে। এই প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, এই চারা আমরা ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে এনেছিলাম। সাধারণত কলমের চারায় পাঁচ বছর পর ও বীজের চারায় আট বছর পর ফল ধরে। আমরা বলছি ভবিষ্যতের সবচেয়ে দামি ফল এই অ্যাভোকাডো। পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র সুগার লেস ফুড এই অ্যাভোকাডো।
সরেজমিন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি হর্টিকালচার সেন্টারে গিয়ে লংগান ফলের দেখা মেলে। সেখানে ১০টি গাছের মধ্যে কমপক্ষে সাতটি গাছে থরে থরে এই ফল চোখে মেলে। বাকি গাছগুলোতে ফুল এসেছে। অর্থাৎ সেগুলো কিছুটা নাবি। ওই সেন্টারের উপসহকারী উদ্যান অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান, বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় থাইল্যান্ড থেকে এই লংগান গাছের চারা নিয়ে আসেন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ। চারা রোপণের দুই বছর পরেই ফল ধরা শুরু করে। দেশী আশফলের মতোই দেখতে। তবে এটা আকারে বড়, বিচি ছোট। মাংস বেশি, রসালো এবং মিষ্টতা বেশি। তিনি বলেন, এটাতে রোগব্যাধির আক্রমণ হয় না। প্রচুর ফল ধরে। বাজারমূল্যও অনেক। খুলনাতে দেখেছি থাইল্যান্ড থেকে আসা লংগান ফল ১০০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে। খুব বেশি পরিচর্চার প্রয়োজন হয় না। চারা লাগিয়ে রাখলেই হয়ে যায়। সারও বেশি লাগে না। এটি খুবই পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল। এটা খেলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ক্যান্সার প্রতিরোধী ফল। অন্যান্য ফলের চেয়ে ভিটামিন সি’র পরিমাণও বেশি। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, লিচু ফল দ্রুতই পচে যায়। লংগান হার্ভেস্টের ১২-১৫ দিন পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে রাখা যায়, নষ্ট হয় না। একটি মধ্যবয়সী লংগান গাছে ৭০-১০০ কেজি পাওয়া যায়। অর্থাৎ মধ্যবয়সী একটি গাছ থেকে লাখ টাকার লংগান পাওয়া সম্ভব। চারা প্রাপ্তির সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হর্টিকালচার সেন্টারে লাগানো লংগান ফল থেকে চারা হবে, সেখান থেকে গ্রাফটিং করা হবে। কলম করে আগে সরকারি উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হবে। তার পর বাণিজ্যিকীকরণ।
কাশিয়ানি ছাড়াও যশোর, মাগুরা ও মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে লংগান গাছ রয়েছে। সেখান থেকেও চারা পাওয়া যাবে। কাশিয়ানি হর্টিকালচারের ১০টি গাছ থেকে এ বছরই ১০ হাজার লংগান গাছের কলম/চারা করার
প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ঠিকভাবে পরিচর্জা করতে পারলে ২০-৩০ বছরও একটা গাছে ফল আসে। পরিচর্জাটা খুব স্বাভাবিক উল্লেখ করে বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো: মেহেদী মাসুদ জানান, অনেকটা লিচু গাছের মতোই। বছরে দুইবার সার দিতে হয়। জৈব সার, ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ , জিপসাম এবং অন্যান্য সার সুষম মাত্রায় দিতে হবে। তাহলে ফলন বৃদ্ধি পাবে।
প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, লিচু জাতীয় ফল এক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। আমরা চিন্তা করলাম লিচু জাতীয় ফল, একই ফ্যামিলির যেগুলো যেমন রাম্বুটান ও লংগান। আমরা রাম্বুটান ও লংগান গাছের চারা ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে কলম আমদানি করি। গত ১৫ জুন কথা হয় তার সাথে। লংগান ফল দেখিয়ে তিনি বলেন, লিচু আর লংগানের পাতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। লিচু জুনে শেষ হয়ে যাবে। ১৫ জুলাই থেকে লংগান পাকা শুরু হবে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটা থাকবে। সেপ্টেম্বরে যখন লংগান শেষ হবে তখন রাম্বুটান পাকা শুরু করবে। এটা অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া যাবে। এই যে, লিচু জাতীয় ফল একেবারে মধু মাস থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া যাবে। এই যে লিচু জাতীয় ফলের হার্ভেস্ট টাইম সম্প্রসারণ হলো, এটাই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
তিনি জানান, দেশে পিংপং ও রেড, এই দুই জাতের লংগানের গাছ রয়েছে। লিচুর মতো এতো দ্রুত লংগান পচে না। এটা হার্ভেস্টের পর কেউ যদি দোকানে ঝুলিয়ে রাখে সাত-আট দিন একই রকম থাকবে। বাংলাদেশে লংগানের এত চাহিদা যে, লাখ লাখ টন উৎপাদন হলেও থাকবে (অবশিষ্ট) না। প্রতিদিন থাইল্যান্ড থেকে দু’টি প্লেন আসে, সেখানে লংগানই বেশি আসে। দেশের উঁচু জমিতে লিচু জাতীয় ফল লিচু, লংগান ও রাম্বুটান দীর্ঘ সময় ধরে পেতে পারি।
মেহেদী মাসুদ আরো জানান, এই চারা থাইল্যান্ড থেকে আনতে প্রতিটার দাম পড়েছে আড়াই হাজার টাকা। এটার গুটি কলম খুব ভালো হয়। একেকটা গাছে ৫০০-৭০০ গুটি কলম হবে। আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে প্রতি বছর পাঁচ-ছয় হাজার করে কলম তৈরি করতে পারব আমরা। এভাবেই সম্প্রসারণ হবে। যেহেতু এটা দামি গাছ, তাই সিলেকটিভ চাষিদের কাছেই এর চারা বিক্রি করা হবে। এটা নতুন ফল নয়। বাংলাদেশের যেটা আশফল বা কাঠ লিচু বলে থাকি, সে রকম। এটা শুধু উন্নতজাতের। বীজ ছোট, শাস বেশি।

 


আরো সংবাদ


premium cement