০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

দূষণ ও ড্রেজিংয়ে হুমকিতে ইলিশ প্রজনন, হারাচ্ছে স্বাদ-গন্ধ

মেঘনার বালু উত্তোলন বন্ধে চিঠি দেয়া ইলিশ বিশেষজ্ঞকে বদলি
-

নদীদূষণ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকিতে পড়েছে জাতীয় মাছ ইলিশের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র মেঘনা। নদীতে চলাচল করা লঞ্চ, জাহাজসহ অন্যান্য নৌযানের পোড়া তেল, মবিল এবং শিল্পকারখানার বর্জ্যে দূষণের শিকার হচ্ছে মেঘনা নদী। এমনকি বুড়িগঙ্গার দূষিত নোংরা পানিও ছড়িয়ে পড়ছে মেঘনায়। অন্য দিকে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং বা খনন করে বালু উত্তোলনে মেঘনার দূষণ ভয়াবহ রূপ নেয়। সবমিলিয়ে দূষণ ও ড্রেজিংয়ে মেঘনা নদীর ইলিশ প্রজনন ও বিচরণ সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে খোদ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণায় বলা হয়েছে।

এ দিকে অপরিকল্পিভাবে নদী খননের ফলে ইলিশের বৃহত্তম বিচরণ ক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম (ষাটনল হতে চর আলেকজান্ডার) নষ্টসহ মেঘনা নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেøখ করে ড্রেজিং বন্ধে চাঁদপুর জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছিলেন নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. মো: হারুনর রশিদ। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই কর্মকর্তাকে বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি ড. হারুনর রশিদ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শুধু মেঘনা নয়, পদ্মাসহ অন্য নদীগুলোতেও দেদার ড্রেজিং মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজিং মেশিনের উচ্চৈঃশব্দ এবং দূষণে ইলিশসহ মৎস্য অভয়াশ্রম ও বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে আলোচনায় আসেন চাঁদপুরের স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম খান। পদ্মা-মেঘনায় ড্রেজিং মেশিন দিয়ে তার বালু তোলার ঘটনা বেশ সমালোচিত হচ্ছে। এটা বন্ধ নিয়ে আর্জি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

জানা যায়, দেশের অন্যতম বড় ইলিশ প্রজনন কেন্দ্র মেঘনা নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে বিভিন্ন মহল থেকে অনেক দিন ধরেই দাবি ওঠে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাটকা নিধন প্রতিরোধ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স সভায় নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হারুনর রশিদ মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান। পরের দিন আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন তিনি। চিঠিতে বিএফআরআই’র এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা লিখেন, চাঁদপুরের উপর দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে গত কয়েক বছর যাবৎ যত্রতত্র বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ওই নদী থেকে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডুবোচর খননের নামে সরকারি বিধি নিষেধ উপেক্ষা করে এ কাজটি দীর্ঘ দিন ধরে করে যাচ্ছে। এর ফলে ইলিশের বৃহত্তম বিচরণক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম (ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার) নষ্টসহ নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বিএফআরআই’র গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘনা নদীতে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে প্রধান প্রজনন মৌসুমে চাঁদপুর অংশে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সামামম্প্রতিক সময়ে মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে শত শত ড্রেজারের প্রপেলারের আঘাত, নির্গত পোড়া মবিল ও তেলের কারণে মাছের প্রধান প্রাকৃতিক খাদ্য নদীর প্লাংটন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এ ছাড়া বালু উত্তোলনে দূষণসহ নদীগর্ভে গঠন প্রক্রিয়া পাল্টে যাওয়ার ফলে বাসস্থানের বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে তাদের আবাসস্থল যেমন ধ্বংস হচ্ছে তেমনি ইলিশসহ অন্যান্য মাছের খাদ্যের উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে মাছের বিচরণ ও প্রজনন প্রক্রিয়া পাল্টে যাওয়াসহ ইলিশের উৎপাদন মেঘনা নদীতে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষা এবং আবাসস্থল নিরাপদ করতে প্রধান প্রজনন মৌসুুমে মেঘনাতে বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধসহ ড্রেজারগুলো স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বিশেষভাবে প্রয়োজন। এমতাবস্থায় চাঁদপুর মেঘনা নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

জানা যায়, মেঘনা নদীর বালু উত্তোলন বন্ধে চিঠির বিষয়টি ভালভাবে নেননি বালুমহালের সাথে জড়িতরা। কারণ মেঘনার বালুমহাল থেকে মাসে ২৫-৩০ কোটি টাকার বালু উত্তোলন হয়ে থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর সাথে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিক জড়িত। মূলত সেই প্রভাবশালী মহলের চাপেই গত ১৮ মে চাঁদপুর নদী কেন্দ্র থেকে ইলিশ বিশেষজ্ঞ হারুনর রশিদকে বাগেরহাটে চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রে বদলি করা হয়। তার জায়গায় পদায়ন হয়েছে সৈয়দপুরের স্বাদু পানি উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজহার আলীর। একই সাথে সেখানে কর্মরত আরেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: রবিউল আউয়াল হোসেনকে রাঙ্গামাটি নদী উপকেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে। বিএফআরআই-এর একই অফিস আদেশে আরো দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও হারুনর রশিদের বদলি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ড্রেজিং বন্ধে চিঠি দেয়ার প্রেক্ষিতেই প্রভাবশালী মহলের ইশারায় তাকে বদলি করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ড. মো: হারুনর রশিদকে বদলির পরের দিন ১৯ মে চাঁদপুরের ডিসি অঞ্জনা খান মজলিসকে নেত্রকোনায় বদলি করা হয়। এটা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এখন ইলিশ ম্যেসুম নয়। তবুও এ সময় নদীতে কয়েক বছর আগেও কম হলেও ইলিশ পেতেন জেলেরা। কিন্তু গত ২৬ মে মেঘনা নদীতে সরেজমিনে ঘুরে ইলিশ না পাওয়ার কথাই শোনা গেল জেলেদের মুখে। সারা দিন জাল টেনেও ইলিশ পাচ্ছেন না তারা। চাঁদপুর কান্ট্রি ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি শাহ আলম মল্লিক বলেন, পদ্মা-মেঘনা যমুনাসহ প্রধান নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। অনেক জায়গায় ডুবোচর জেগে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। নাব্যতা হ্রাসের কারণে ইলিশ বিচরণ এবং প্রজননের সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি বুড়িগঙ্গার দূষণের পানি চাঁদপুর মেঘনা নদীতেও চলে এসেছে। গজারিয়া পর্যন্ত যে জাহাজ নির্মাণশিল্প কারখানার কারণে নদীতে অ্যালুমিনিয়ামের উপস্থিতি অনেক হারে বাড়ছে। ফলে পদ্মা, মেঘনায় ইলিশসহ অন্যান্য মাছের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে নদী এলাকায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। জেলেরা দুরবস্থার মধ্যে আছে। বুড়িগঙ্গার দূষণ মুক্ত করতে হবে। নদী এলাকা থেকে জাহাজশিল্প তথা লৌহজাত শিল্প সরিয়ে ফেলতে হবে। নদীকে দূষণ এবং আয়রণ মুক্ত করতে হবে। ইলিশসহ অন্যান্য মাছ যাতে স্বাভাবিকভাবে প্রজনন করতে পারে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন লঞ্চের যাত্রীদের পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট ও প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। কৃষিক্ষেতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও সার বৃষ্টির পানির সাথে নদীতে আসছে। যার কারণে পানির স্বাদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঘোলা পানি, মাছের খাদ্য প্লøাংটনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাছ এখন আর আগের মতো প্রাকৃতিক খাদ্য পায় না। রাসায়নিক ও বর্জ্যজাতীয় দূষণের কারণে পানির গুণাগত মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, নদীতে মাছে প্রাকৃতিক খাদ্যের গুণাগত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাদও নষ্ট হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে চাঁদপুর নদী কেন্দ্রে ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ (২য় সংশোধিত) প্রকল্পের পরিচালক মো: আবুল বাশার বলেন, ইলিশের স্বাদ ও গন্ধের বিষয়টি কম বেশি সবাই জানেন। হ্যাবিটেটগুলো চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। অনেকসময় পল্যুটেট হয়ে যাচ্ছে। নদীতে পলি পড়ে নাব্যতা বাড়ছে। যে মাছটা যেদিকে যাওয়ার কথা যেতে পারছে না, রুট চেঞ্জ করে অন্য দিকে যাচ্ছে। ইলিশের স্বাদ গন্ধ নিয়ে এসবসহ আরো অনেক বিষয় জড়িত। আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফুড এন্ড ফিডিং হ্যাবিট,খাদ্য অভ্যাস যেটা। অর্থাৎ স্বাদের জন্য যে ধরনের খাদ্য প্রয়োজন, সেটা সেখানে (ইলিশ) পাচ্ছে না। এটা না পাওয়ার কারণ হচ্ছে নদীতে পল্যুশন, ভরাট হয়ে পলি জমে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে যেটা বলছি ফুড এন্ড ফিডিং হ্যাবিট চেঞ্জ, পলি জমে নাব্যতা হ্রাস পাওয়াই মূলত ইলিশের স্বাদ গন্ধ আগের মতো না থাকার কারণ। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি।

এ বিষয়ে বদলির আদেশপ্রাপ্ত চাদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো: হারুনর রশিদ জানান, ইলিশের পেটে প্রায় ৩৬ শতাংশ বালু এবং কাদা পাওয়া গেছে। এতে বুঝা যায় পানিতে বালু এবং কাদার পরিমাণ কত। পানিতে এসব আছে বলেই তাদের পেটে চলে যাচ্ছে। এসব হজম হচ্ছে না।
চাঁদপুর নদী কেন্দ্রে দীর্ঘ দিন ধরে কর্মরত একজন জানান, ইলিশের স্বাদ গন্ধ কমে গেছে নদীদূষণের কারণে। আগে জেলেরা সাঙ্গা দিয়ে মাছ ধরত, কোনো ম্যাকানাইজ্ড গুড ছিল না। এখন ম্যাকানাইজড গুড-লঞ্চ, কার্গো, স্টিমার চলছে, এগুলোর বর্জ্য পানিতে পড়ে দূষণ করছে। পানি নষ্ট হচ্ছে। মাছের খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দূষণের কারণে ইলিশের স¦াদ কমে গেছে।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। মোট উৎপন্ন এই ইলিশের ৮০ ভাগই হয় বাংলাদেশে। আর ১৫ ভাগ হয় ভারতে। সুস্বাদু এই ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ রয়েছে। তবে, নদী দূষণ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে শুধু মেঘনা নয়, ইলিশের অন্যান্য বিচরণ ও প্রজনন কেন্দ্রগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো সক্রিয় হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ফুলবাড়ীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কৃষকের মৃত্যু দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন আমিরে জামায়াত ‘বরিস হঠাও’ আন্দোলন তুঙ্গে : নির্বাচনের দিকেই কি হাঁটছে ব্রিটেন? রাস্তায় ফেলে পঞ্চায়েত সদস্যসহ ৩ জনকে হত্যা পদত্যাগ করছেন হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক অবরুদ্ধ গাজার ‘প্রাচীর ভেঙে’ ফিলিস্তিনি তরুণী এখন সুইডেনের মেয়র বোনকে বাঁচাতে গিয়ে ভাইয়েরও মৃত্যু করোনায় মারা গেছেন ভারোত্তলনে স্বর্ণজয়ী রিয়ানা চাঁদপুরে ২০০ কোরবানির হাট : গরুর চড়া দামে বিপাকে ক্রেতা-বিক্রেতা হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু, অংশ নিয়েছেন ১০ লাখ মুসল্লি

সকল