০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

ঢাবিতে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে আহত ৫০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল কর্মীদের উপর ছাত্রলীগের হামলা : নয়া দিগন্ত -

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। এর মধ্যে ছাত্রদলের ৪৬ ও ছাত্রলীগের চারজন রয়েছে। সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে দিনব্যাপী উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে একটি সংবাদ সম্মেলন করার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে প্রবেশকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রলীগ নেতাদের হামলার শিকার হন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা কোনো প্রতিরোধ না করেই মেডিক্যাল এলাকায় যান। জানা যায়, গত কয়েক দিন আগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলের একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ফেসবুকে মারধরের হুমকি দিয়ে আসছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর সূত্র ধরে গত রোববার তাদের হামলায় টিএসসিতে ছাত্রদলের তিনজন নেতাকর্মী আহত হয়। এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দেয় ছাত্রদল।
এদিকে তাদের প্রতিহত করার জন্য আগে থেকেই পুরো ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে ছিলেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন হলের নেতাকর্মীরা। সকাল ১০টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য ছাত্রদল ঢাকা মেডিক্যাল এলাকা থেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাছাকাছি এলে কাজল দাসের নেতৃত্বে জগন্নাথ হল, মেহেদী হাসান শান্তর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হল এবং তানভীর শিকদারের নেতৃত্বে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় আহত হন, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সহসভাপতি রাশেদ ইকবাল খান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আফসান মো: ইয়াহিয়া, সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আকতারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম আহবায়ক এজাজুল কবির রুয়েল, সজীব মজুমদার, শরীফুল ইসলাম শরীফ, জহুরুল হক হলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল, আহ্বায়ক সদস্য মানসুরা আলমসহ প্রমুখ। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা যায়।
দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ১১টার দিকে আবারো ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে কার্জন হল এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়। এসময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে ঢিল ছুড়াছুড়ি হয়। একপর্যায়ে ছাত্রদল নেতারা পিছু হটে। এসময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ ছাত্রদলের তিনজন আহত হয় এবং ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের চার কর্মী আহত হয়। সংঘর্ষে ছাত্রলীগের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সাথে সাধারণ সম্পাদক জুবায়েরের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও অংশ নেয়।
এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৬:৩০) পুরো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়াও ছাত্রলীগের বিভিন্ন হলের পদবঞ্চিত হল ক্যান্ডিডেটদেরও মোটরসাইকেলে লাঠিসোটা হাতে মহড়া দিতে দেখা যায়। এ সময় তারা ছাত্রদল বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, আমাদের সাধারণ সম্পাদক সেদিন কী বক্তব্য দিয়েছে সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য আজকে আমরা সংবাদ সম্মেলন ডেকেছি। এরপর আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের গেট থেকে শহীদ মিনার হয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী টিএসসি যাচ্ছিলাম। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কারণে আমরা কোনো স্লোগানই দেইনি। এরপর বিভিন্ন হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা আমাদের সামনে আসে। আমরা তাদের কাছে জানতে চেয়েছি আমাদের অপরাধ কী কেন আমাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে? বারবার এটা জানতে চাওয়ার পরও তারা কোনো উত্তর না দিয়ে আমাদের ওপর হকিস্টিক, লোহার রড, স্ট্যাম্প এবং চাপাতিসহ আক্রমণ করে। এতে আমাদের নারীনেত্রী লাঞ্ছিতসহ ৪০ জনের মতো আহত হয়েছে। দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষে আরো ১০ জন আহত হয়েছে।
এখন আপনারা কী করবেন জানতে চাইলে রাকিব বলেন, এখন আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে আমাদের আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসা করানো। এরপর আমাদের কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হাইকমান্ডের সাথে কথা বলে যেই সিদ্ধান্ত নিবেন সেটির আলোকেই আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করব।
ঢাবি শাখার সদস্যসচিব আমান উল্লাহ আমান বলেন, আমরা প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিলাম। ক্যাম্পাসের অবস্থা আপনারা জানেন। গতকালকে তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে হামলা করার কথা বলে এবং তারা আমাদের ওপর অতর্কিতে হামলা করে। আমাদের নেতাকর্মীরা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সিতে আছে। আমরা মনে করি, আমাদের শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচিতে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা করেছে। তাদের হাতে লাঠিসোটা, হকিস্টিকসহ সব ধরনের দেশীয় অস্ত্র ছিল, আপনারা সেগুলো দেখেছেন।
হামলার দায় অস্বীকার করে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ছাত্রদল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের এজেন্ডা নিয়ে ক্যাম্পাসে আসে। তাদের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসে এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তাদের এই অবস্থানে সমর্থন জানিয়ে তাদের সাথে যোগ দেয়। ছাত্রদল একটা কিলিং মিশন নিয়ে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে এসেছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট করার পাঁয়তারা করছে যা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ হতে দিবে না। ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার জন্যই আমাদের এই অবস্থান।
এদিকে ছাত্রদলের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়ন। বিবৃতিতে তারা হামলার তীব্র নিন্দা জানান ও একইসাথে হামলাকারী ছাত্রলীগ কর্মীদের বিচার দাবি করেন।
ছাত্রলীগের হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে পূর্ব নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন কর্মসূচিতে আগমনের সময় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলায় নারী সদস্যসহ ছাত্রদলের বেশ কিছু নেতাকর্মী আহত হয়। আমরা এ ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো একক ছাত্র সংগঠনের সম্পত্তি নয়। সব মত-পথের শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠন এখানে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য বিনষ্টকারী সন্ত্রাসীদের বিনা উসকানিতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর আজকের হামলার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অবিলম্বে এ সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সাথে আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা এবং ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করছি। অন্যথায় উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই দায়ভার গ্রহণ করতে হবে।
সাদা দলের আহ্বায়ক ড. লুৎফর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা একটা বিবৃতি দিয়েছি। আমরা আগামীকাল ভিসির সাথে জোরালোভাবে কথা বলব। তিনি যদি কোনো ব্যবস্থা না নেন তাহলে আমরা দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনা করে কর্মসূচি ঘোষণা করব।
ইউট্যাবের নিন্দা : ঢাবিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রলীগ কর্তৃক হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)।
গতকাল মঙ্গলবার ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো: মোর্শেদ হাসান খান এক বিবৃতিতে, মঙ্গলবার দিবালোকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের ওপর যেভাবে হামলা করেছে তা আদিম ও বন্য যুগের কথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে ছাত্রলীগ কখনোই পরমত সহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী নয়।

 


আরো সংবাদ


premium cement