১২ আগস্ট ২০২২
`
৮৩ স্থানে পানি বেড়েছে নদীতে

সিলেটবাসীকে আরো ৫ দিন থাকতে হবে পানিবন্দী

-

দেশের ৮৩ স্থানের নদনদীতে পানি বেড়েছে গতকাল শনিবার। তবে বিপদসীমার উপর দিয়ে কেবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার নদীগুলোর পানি বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অবশ্য গতকাল থেকে সুরমার পানি কিছুটা কমে এলেও বাড়ে কুশিয়ারার পানি। সিলেটবাসীকে আরো পাঁচ দিন পানিবন্দী অবস্থায় কাটাতে হবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কয়েক দিন থেকে দেশের ভেতরে ও বাইরে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় প্রবল তোড়ে পানি নামছে ভাটির দেশ বাংলাদেশে।
আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল-ভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তরপূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, হিমালয়ের পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে এই পানি বাংলাদেশের নদীগুলোতে এসে পড়লে নদীগুলো ভরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং যেখানে বন্যা হচ্ছে সেখানকার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও পদ্মার উপরের গঙ্গী নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পাবে। তবে সিলেট অঞ্চলে সুরমা-কুশিয়ারা ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান প্রধান নদনদীগুলোর পানি আজো বৃদ্ধি পাবে। কোনো কোনো এলাকায় নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে আজ সিলেট জেলার কিছু স্থানে পানি বৃদ্ধি সামান্য কমে যেতে পারে, তবে তা বন্যা পরিস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এ ছাড়া সুনামগঞ্জে ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলের কিছু স্থানে বন্যা পরিস্থিতিরি অবনতি হতে পারে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, কানাইঘাটে সুরমা ৮৫ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমা ২৫ সেন্টিমিটার, সুনামগঞ্জে সুরমা দুই সেন্টিমিটার, অমলশীদে কুশিয়ারা ১৫৬ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা ৫৫ সেন্টিমিটার, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পুরাতন সুরমা ৮ সেন্টিমিটার, নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী বিপদসীমার চার সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেটবাসীকে আরো ৫ দিন থাকতে হবে পানিবন্দী
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে নদনদীর পানি কমলেও আরো পাঁচ দিন পানিবন্দী থাকতে হবে মানুষকে। ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করা বন্যার পানি নেমে আগের অবস্থায় ফিরবে নগরীর চিত্র। গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীর দফতরের সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) এস এম শহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে এই কথা জানান। তিনি বলেন, সিলেটে বর্তমানে বন্যার পানি কমছে। ফলে আর বন্যা পরিস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় আরো পাঁচ দিন পানিবন্দী থাকতে হবে। বন্যায় যেসব এলাকায় বাঁধ ভেঙেছে সেগুলো আমাদের পক্ষ থেকে আবার নতুন করে তৈরি দেয়া হচ্ছে। এস এম শহিদুল ইসলাম বলেন, সিলেটে যে নদী-খালগুলো আছে, সেগুলো ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ড্রেজিং করার লক্ষ্যে আমরা এখানকার নদীগুলো নিয়ে স্টাডি করছি। সুরমা নদীর গতিপথ ঠিক থাকলেও এর ড্রেজিং করতে হবে। এ লক্ষ্যে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এখনো প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন হয়নি, তবে ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে। সুরমা নদীর ড্রেজিং হয়ে গেলে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি কমে যাবে বলে জানান তিনি।
এ দিকে সিলেটে সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও বাড়ছে কুশিয়ারার পানি। ফলে নগরসহ আশপাশের এলাকার পানি কিছুটা কমলেও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নতুন করে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পাউবো সিলেটের তথ্যানুযায়ী, শনিবার বিকেলে কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ও সিলেট পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শুক্রবারের চেয়ে শনিবার এই দু’টি পয়েন্টে পানি প্রবাহ যথাক্রমে ১১ সেন্টিমিটার এবং সাত সেন্টিমিটার কমেছে। এ ছাড়া শনিবার একই সময়ে কুশিয়ারা নদীর আমলশীদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৫৬ সেন্টিমিটার, শেওলায় ৫৫ সেন্টিমিটার ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শুক্রবারের চেয়ে শনিবার আমলশীদে ১১ সেন্টিমিটার ও শেওলায় ৩ সেন্টিমিটার পানির প্রবাহ কম ছিল। তবে, ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি শুক্রবারের চেয়ে শনিবার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শুক্রবার এই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
অপর দিকে নগরে পানি কিছুটা কমলেও কমেনি বন্যাকবলিতদের দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ ও গ্যাসহীনতা, খাবার পানির সঙ্কটের পাশাপাশি উপদ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। এমন পরিস্থিতিতে দুর্ভোগ এড়াতে নগর ছাড়তে শুরু করেছেন অনেকে। শুক্র ও শনিবার নগরের প্লাবিত এলাকার অনেক বাসিন্দাকে নগর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে দেখা যায়।
জানা যায়, গত ১০ মে থেকে সিলেটে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। সেই সাথে উজান থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। ফলে ১১ মে থেকেই সিলেটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে থাকে। এরপর গত ১৩ মে থেকে সিলেট নগর প্লাবিত হতে থাকে। সেখানে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, শুক্রবারের মতো শনিবারও সুরমা নদীর পানি কমা অব্যাহত আছে। শনিবার বিকেলে পর্যন্ত আগের দিনের চেয়ে কয়েক সেন্টিমিটার পানি কমেছে। তবে কুশিয়ারা নদীর পানি দুই সেন্টিমিটার বেড়েছে ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে। সিলেটের ১৩টি উপজেলার ৮৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ৩২৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
ত্রাণপ্রত্যাশীদের সাথে পুলিশের হাতাহাতি : সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণপ্রত্যাশীদের মধ্যে হট্টগোল ও পুলিশের সাথে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল উপজেলা পরিষদের থানা বাজার পয়েন্টে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে এই ঘটনা ঘটে। জানা যায়, সিলেটে নিজ নির্বাচনী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণে আসেন প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে মন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার পরপরই ত্রাণপ্রত্যাশী আর প্রশাসনের লোকজনের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়। এতে পুলিশ বাধা দিলে তাদের সাথে জনতার মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হন। এসব পরিবারের লোকজনের মধ্যে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়া হয়নি। শনিবার সকালে এসব পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতে আসেন স্থানীয় এমপি প্রবাসী মন্ত্রী ইমরান আহমদ। সেখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত ১২০ প্যাকেট শুকনো খাবার দেয়ার জন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে বরাদ্দের সংখ্যায় চেয়ে বেশি মানুষ উপস্থিত হন। তালিকাভুক্ত না হয়ে অন্যান্যরা খাদ্যসামগ্রীর জন্য প্রশাসনের কাছে আকুতি জানালে পরবর্তী সময়ে সবাইকে খাদ্যসামগ্রী দেয়া হবে বলে জানান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি। এসব কথা না মেনে উপস্থিত জনতার কিছুসংখ্যক লোক অন্যান্যের জন্য বরাদ্দ শুকনো খাবারের প্যাকেট নিয়ে যেতে চান। এ সময় পুলিশ বাধা দেয়। পরে পুলিশ ও জনতার মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলে পুলিশ লোকজন সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। ঘরে ভাত নাই। মন্ত্রী আসার খবরে ত্রাণ নিতে এসেছি ; কোনো ত্রাণ পাইনি। আমরা খুব কষ্টে আছি। আমরা ৫০ হাজার পরিবার বন্যায় প্লাবিত হয়েছি। তাদের জন্য মাত্র ১২০ প্যাকেট খাবার নিয়ে এসেছেন মন্ত্রী। যা উপস্থিত মানুষের ৫ ভাগের ১ ভাগ।
স্থানীয় ইউএনও লুসিকান্ত হাজং বলেন, আমরা ২০০ জনের তালিকা করে মন্ত্রীকে দিয়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করি। তবে সেখানে তালিকার বাইরের লোকজন এসে হট্টগোল শুরু করে। ইউএনও ২০০ প্যাকেটের কথা বললেও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুকান্ত চক্রবর্তী বলেন, প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য ২০ প্যাকেট করে খাবার দেয়ার জন্য তালিকা করা হয়েছে। তালিকার বাইরের লোকজন হট্টগোল করলে আমরা তা নিয়ন্ত্রণে আনি।
চট্টগ্রামে সামান্য বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল নিমজ্জিত
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, মাত্র ৪৮ মিটার বৃষ্টিতেই বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত ছিল গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত। বৃষ্টির সাথে জোয়ারের পানি একাকার হয়ে কোথাও হাঁটু পানি, আবার কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে নগরীর মূল সড়ক ও অলিগলি। পানি জমেছিল মুরাদপুর-লালখান বাজার ফ্লাইওভারের উপরেও। সকালে বৃষ্টির কারণে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও অফিসগামী মানুষকে নাকাল হতে হয়েছে। গতকাল দিনভর থেমে থেমে বর্ষণে স্থবির হয়ে পুরো বন্দরনগরীর জীবনযাত্রা।
পতেঙ্গা আবহওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো: জহিরুল ইসলাম গতকাল শনিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৪৮.০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার কথা নয়া দিগন্তকে জানান।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার সাথে প্রবল বিজলী চমকানোসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
এ দিকে টানা বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকা পানি নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, খাতুনগঞ্জ, বাকলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা, নাছিরাবাদ শিল্পাঞ্চল, কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকা,আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে। শুধু সড়কে নয়, অলিগলি উপচে বাসা ও দোকানপাটেও ঢুকেছে পানি। বিভিন্ন স্থানে সড়ক-বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় থমকে যায় জনজীবন। পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে যানজটও চোখে পড়েছে।
এ দিকে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান অবস্থায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে ডুবছে নগরীর সড়ক, অলিগলি। আগে পানি নিমজ্জিত হতো না নতুন করে এমন এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। তা ছাড়া বৃষ্টি থামলেও দ্রুততম সময়ে পানি সরছে না। ফলে নগরবাসীর দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হচ্ছে। এ জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সিডিএ কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দুষছে।


আরো সংবাদ


premium cement