০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

সিলেটে পানির নিচে আশ্রয়কেন্দ্র নগরীর আরো এলাকা প্লাবিত

সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল কমলেও দুর্ভোগ চরমে
সিলেট নগরীর উপশহরের প্রধান সড়ক দিয়ে নৌকায় পার হচ্ছে মানুষ : নয়া দিগন্ত -

গত কয়েকদিন ধরে উজানের ঢলে বিপর্যস্ত সিলেট। সময় যত গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে বানভাসি মানুষের সংখ্যা। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের নিচতলায় পানি উঠে গেছে। আর একতলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট নগরীর আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এ দিকে সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টিপাত কিছুটা কমার পাশাপাশি ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি কমায় তিন উপজেলায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে ছাতক ও দোয়ারাবাজারে দুর্ভোগের পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছেন। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ডুবে জেলার যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
সিলেট ব্যুরো জানায়, বন্যায় ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। পানিতে ভাসছে নগর থেকে গ্রামগঞ্জের বাড়িঘর, হাটবাজার। পাহাড়ি ঢল আর টানা ভারী বর্ষণে মহানগরসহ জেলার অন্তত ১০টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে মানুষজন। সেখানে গিয়েও পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটছে তাদের। একতলা অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরেও বন্যার পানি ঢুকে গেছে। গতকাল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাটে এমন চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পানিবন্দী থাকায় জরুরি প্রয়োজনে তাদেরকে নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে অন্যত্র আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলায় কয়েক লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ডুবে গিয়ে উপজেলা ও জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও সরকারি দফতরগুলোতে উঠেছে পানি। সিলেট নগরের আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় অনেকে জানান, গত দুই দিনে পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে না পারা মানুষজন ঘরেই অবস্থান করছে। ঘরের ভেতর পানি আসায় সন্তানদের নিয়ে খাটের উপরে অবস্থান করতে দেখা গেছে অনেককে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্ত হাজং নয়া দিগন্তকে বলেন, উপজেলার ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। মোট ৪৬ হাজার ৫০০ বানভাসি মানুষ রয়েছে এ উপজেলায়। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান বলেন, বন্যা পরিস্থিতির কারণে উপজেলায় ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। এ যাবৎ সাড়ে ৩০০ জন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। বানভাসি মানুষের সংখ্যা ৬৯ হাজার নির্ণয় করা হয়েছে। জকিগঞ্জ ইউএনওর দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) পল্লব হোম দাস বলেন, উপজেলায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলায় ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ডুবে গেছে সিলেটের ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক : রাস্তাঘাট ডুবে গিয়ে অনেক এলাকার সাথে জেলা ও উপজেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীসহ সিলেট সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের প্রায় ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক বন্যা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় আড়াই শ’ কিলোমিটার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের ২৩০ কিলোমিটার এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) আওতাধীন আটটি সড়কে ৫৫ কিলোমিটার বন্যা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে অনেক সড়কে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, সিসিক এলাকার ৫০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৪টি ওয়ার্ডের প্রায় আড়াই শ’ কিলোমিটার সড়কে বন্যার পানি উঠে গেছে। এসব সড়কের অনেক স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের আওতাধীন সিলেট জেলার ১০টি উপজেলার ৬৬টি সড়কে ২৩০ কিলোমিটার পানিতে তলিয়ে জেলা ও উপজেলা সড়কের যোগাযোগব্যবস্থা বিঘিœত হয়েছে। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মুশফিকুর রহমান বলেন, সারি-গোয়াইনঘাট দ্বিতীয় থেকে ১৬তম কিলোমিটার পর্যন্ত ১২ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার সড়ক এক থেকে সাড়ে চার ফুট পানির নিচে তলিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সিলেট-তামাবিল-জাফলং সড়ক ১ দশমিক ২০ কিলোমিটার এক থেকে তিন ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। কানাইঘাটের দরবস্ত-কানাইঘাট-শাহবাগ সড়ক সাত থেকে ২৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এক থেকে চার ফুট পানিতে তলিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিমানবন্দর-বাদাঘাট-কুমারগাঁও (টুকেরবাজার) সড়কে পাঁচ থেকে ৯, ১১ ও ১২তম কিলোমিটারের মধ্যে এক থেকে সাড়ে তিন ফুট পর্যন্ত পানি উঠে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথের ৫৫ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে অনেক স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সুনামগঞ্জে পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি
সুনামগঞ্জ ও ছাতক সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এবং মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল নামা বন্ধ থাকায় জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে জেলার ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি রয়েছে অপরিবর্তিত। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে ছাতকে সুরমা নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ১.৫১ সেমি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ছাতকের ছয়টি পয়েন্ট দিয়ে পানি প্রবেশ করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে সড়ক, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শত শত একর ফসলি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ছাতক-সিলেট সড়কের ১৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১০ কিলোমিটারই ডুবে যোগাযোগ ও যান চলাচল বন্ধ আছে। উপজেলার মৎস্য খামারিরা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন জায়গাতে ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন জায়গাতে পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। উপজেলার সাথে গ্রামীণ সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছে। এমনকি জেলা সদরের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নৌকা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই চলাচলের জন্য। বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকায় পুরো উপজেলায় ভুতুরে পরিবেশ।
এ দিকে জেলার পাঁচটি উপজেলার ২১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করার ফলে সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ২৮টিতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পানি কমলে যথারীতি বিদ্যালয় খুলবে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমান। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ও সীমান্তের ওপার থেকে পাহাড়ি ঢল আসা বন্ধ থাকার ফলে সুরমা নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা সদরের সাথে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার উঁচু জমিতে, যাকে নন হাওর বলা হয় সেসব হাওরের অনেক ফসল তলিয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বন্যাদুর্গতদের জন্য ইতোমধ্যে ১৫ মেট্রিক টন চাল, আড়াই লাখ নগদ টাকা, শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার দেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সাহায্যের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
গোলাপগঞ্জে লাখো মানুষ পানিবন্দী
গোলাপগঞ্জ (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে উপজেলার বাঘা ইউপিতে ৪টি আশ্রয়কেন্দ্র্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার গবাদিপশুসহ আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে উঠেছেন। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার ১১টি ইউপি ও একটি পৌরসভার নিম্নাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও গ্রামীণ রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তাগুলো ভেঙে গেছে।
অস্বাভাবিকভাবে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আরো ৩টি বন্ধের উপক্রম বলে উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়। দীর্ঘদিন পর উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়ায় মানুষজন দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে বন্যাকবলিত এলাকায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সমগ্র উপজেলায় কয়েক হাজার একর ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। দিশেহারা হয়ে পড়ছেন উপজেলার শত শত কৃষক।


আরো সংবাদ


premium cement