০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

সুরমার পানি উপচে ডুবছে সিলেট শহর

সুরমা কুশিয়ারা বিপদসীমার ১০০ সেমি ওপরে অন্যান্য নদীতেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত
সিলেটে বন্যাকবলিত একটি এলাকা : নয়া দিগন্ত -

সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারাসহ কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুরমা ও কুশিয়ারার পানি ইতোমধ্যেই বিপদসীমার একশো সেন্টিমিটারের বেশি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমার উপচে ওঠা পানিতে তলিয়ে গেছে সিলেট নগরীর নি¤œাঞ্চল। বেশ কিছুদিন ধরে ভারী বর্ষণের কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য নদীর পানিও বাড়ছে। ভারী বর্ষণের পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে কেবল যে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, জান-মালেরও ক্ষতি হচ্ছে। বাড়িতে হঠাৎ বন্যার পানি উঠে পড়লে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের। তবে আগে থেকে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বন্যার টেকসই পূর্বাভাস দিয়ে সতর্ক করতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব বলে আবহাওয়াবিদরা বলছেন। বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের উপরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ভারী বর্ষণের পানি পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রবল গতিতে নিচে নেমে আসার কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনে আরো কয়েকদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে গত সপ্তাহে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা তীব্র গতির ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে যে ভারী বর্ষণ শুরু হয় তা এখনো অব্যাহত আছে। বাতাসে ভেসে আসা মেঘগুলো মেঘালয়ের উঁচু পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেখানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সেই পানি নিচের দিকে নেমে আসায় সিলেটের নদী ও হাওরগুলো কানায় কানায় পুর্ণ হয়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বন্যায় পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র অন্যান্য আবহাওয়া সংস্থার গাণিতিক মডেল বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং এর সংলগ্ন ভারতের মেঘালয়, আসাম ও হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের কিছু স্থানে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান প্রধান নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রধান নদীসমূহ যেমন সুরমা, কুশিয়ারা, ভোগাই-কংস, ধনু-বাউলাই, মুনা, খোয়াই নদীর পানি খুব দ্রুততার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
এছাড়া এই অঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নদীসমূহের পানি সমতল কিছু কিছু স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং সিলেট জেলার অবশিষ্ট অঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সিলেট অঞ্চলের নদী ছাড়াও যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে এবং আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৯টার পূর্ব পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায়) চেরাপুঞ্জিতে ৪২৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে সিলেটের জাফলংয়ে একই সময়ে ২৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সিলেটের লালাখালে ৮৫ মিলিমিটার, কানাইঘাটে ৭৫ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জের ছাতকে ১০৫ মিলিমিটার, লোরেরগড়ে ৯০ মিলিমিটার, মহেলখোলায় ৬১ মিলিমিটার এবং সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ২৪ বৃষ্টি হয়েছে ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি। এত পানি সিলেটের অগভীর কয়েকটি নদীতে পড়েই নদী ভরে দুই কূলে পানি উঠে বন্যা হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সিলেটের নদীগুলো যেমন অগভীর তেমনি অপ্রশস্ত। দীর্ঘদিন এসব নদী ড্রেজিং না করায় পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদীগুলো ভরে দুই কূলে বন্যার সৃষ্টি হয়।
সুরমার পানিতে ডুবছে সিলেট শহর
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি উপচে শহরে প্রবেশ করছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, সিলেটে বৃষ্টি কমলেও ঢলের কারণে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে সুরমার তীর উপচে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। এতে তলিয়ে যায় উপশহর, সোবহানিঘাট, কালিঘাট, ছড়ারপাড়, শেখঘাট, তালতলা, মাছিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা। এসব এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায়ও পানি ঢুকে পড়ে। নগরের উপশহরের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন ইমন নয়া দিগন্তকে বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসার ভেতরে পানি। আমাদের পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল ৫টায় সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১.২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রোববার সন্ধ্যা ৬টার চেয়ে সোমবার সকালে এ পয়েন্টে পানি বেড়েছে ০.৩ সেন্টিমিটার। এদিকে প্রধান দুই নদীসহ তিন নদীর তিনটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সুরমার পানি সিলেট পয়েন্টে রোববারের চেয়ে গতকাল বেড়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় সিলেট পয়েন্টে পানি ছিল ১০.৪৯ সেন্টিমিটার। অপরদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি আমলশিদ পয়েন্টে গতকাল সকালে বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ নদীর পানি শেরপুর পয়েন্টেও বেড়েছে। পানি বেড়েছে ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টেও। এখানে গতকাল সকাল ৬টায় পানির সীমা ছিল ৮.৭০ সেন্টিমিটার; সকাল ৯টায় দাঁড়ায় ৮.৭৪ সেন্টিমিটার। এছাড়া গোয়াইনঘাটের সারি নদীর পানি বিপদসীমার ০.৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কানাইঘাটের লোভা নদীর পানি রোববারের চেয়ে বেড়েছে ০.৩৪ সেন্টিমিটার।
আবহাওয়া অধিদফতরের সিলেটের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, সিলেটে রোববার থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে। তবে উজানে বৃষ্টি হচ্ছে, এ কারণে ঢল নামছে। এতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
ছাতকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত
ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ছাতকে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়ে পড়েছে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। তলিয়ে গেছে উঁচু জমিতে চাষ করা কয়েকশত একর বোরো ফসল। সোমবার বিকেল পর্যন্ত উপজেলার সুরমা, পিয়াইন, চেলা নদীসহ সকল নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এখানকার বন্যা পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পৌরসভাসহ ১৩টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে বহু রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বীজতলা ও শত শত একর উঁচু জমির বোরো ফসল। সদরের নিচু এলাকার বাসাবাড়িতে বন্যার পানি ঢুকেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়ায় ছোট-ছোট নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি স্টোন ক্রাশার মিল, পোলট্রি ফার্ম ও মৎস্য খামারে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। নদীতে কার্গো লোডিং আন-লোডিংও বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে গত এক সপ্তাহ ধরে শত শত শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। বাজার-হাটে বেচাকেনায় ভাটা পড়েছে। গো-খাদ্যের অভাবে গৃহপালিত পশু নিয়েও চরম বিপাকে রয়েছেন বানবাসি লোকজন। এদিকে, ছাতক-সিলেট সড়কের কয়েকটি স্থান তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ছাতকের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলা সদরের সাথে ইসলামপুর, চরমহল্লা, ভাতগাঁও, সিংচাপইড়সহ আটটি ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement
পদ্মা সেতুর নাট খোলা বায়েজিদের জামিন নামঞ্জুর ফরিদপুর জেলা ছাত্রদল সভাপতির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা চিকিৎসার জন্য আবার ব্যাংককে রওশন এরশাদ সিলেটে আবারো বাড়ছে পানি, অবনতি বন্যা পরিস্থিতির লঞ্চে মোটরসাইকেল ১০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে বিদ্রোহ, কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবেন বরিস জনসন ঢাবি অধ্যাপক ড. মোর্শেদের রিট খারিজ করায় উদ্বেগ আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে বাংলাদেশ ‘এ’ দল শিক্ষকদের ওপর হামলা মানে শিক্ষার ওপর হামলা : ইউনিসেফ মানিকনগরে উঠতি মাস্তানদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা রেকর্ড রাজস্ব আদায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভূরিভোজ করালেন মেয়র

সকল