০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`
মিলাররা বেশি বেশি করে ধান কিনছে : কৃষিমন্ত্রী

দাম বাড়ার শঙ্কা চালের

উৎপাদনে মন্দা : ২টি জাতে পোকার আক্রমণ : খাদ্য সংগ্রহ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা
-

ইউক্রেন-রাশিয়ার পর ভারত বাংলাদেশে গম রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় চাপ পড়েছে চালের বাজারে। হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল নষ্ট এবং সারা দেশে ধান কাটা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে ধানের। একইসাথে দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ ধানে ব্লাস্টসহ অজানা রোগের প্রাদুর্ভাবে এবার ফলন কম হয়েছে কৃষকের। সবকিছু মিলে চলতি বোরো মৌসুমে বোরোর ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় সয়াবিন তেল, পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের মতো চালের বাজারও চড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে বেশি লাভের আশায় ধান চাল সংগ্রহে মাঠে নেমেছেন মজুদদাররা। এই প্রসঙ্গে গতকাল রোববার নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ অন্য দিকে ভারত গম রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় মিলাররা বেশি বেশি করে ধান কিনছে। সে জন্য ভরা মৌসুমেও চালের দাম কমছে না।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি উপকূল অঞ্চলের অশনির বৃষ্টিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠে থাকা সব বোরো ধান প্রবল বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় বিভিন্ন এলাকায়। এতে অনেক চাষি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ কত সে সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তথ্য দিতে পারেনি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় প্রায় দুই লাখ হেক্টরের কাছাকাছি জমির ফসল কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে তলিয়ে যায় বোরো ধানের জমি। সে সময় অনেক চাষি হারান পাকা ধান। সরকারি হিসাবে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুসারে, হাওরে ২০ হাজার হেক্টরের মতো জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। শুধু যে আগাম বন্যা বা ঝড় বৃষ্টিতেই এবার বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে তা নয়। বোরোতে কৃষক সবচেয়ে বেশি আবাদ করেন ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ দান। এই দু’টি জাতের ধানেও এবার ব্লাস্টসহ বিভিন্ন পোকামাকড় বা রোগে আক্রান্ত হয়। ফলে এই দু’টি জনপ্রিয় ধানে চাষিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এ অবস্থায় এবার চলমান ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এক দিকে, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে গম আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণভাবে বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফলন কম হওয়ার সম্ভাবনায় চালের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এ নিয়ে চিন্তিত নয় সরকার। খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যে পরিমাণ ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা মোট আবাদের এক শতাংশ। তারপরও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পরিস্থিতি বুঝে আমদানির সিদ্ধান্তের কথা ভাববেন তারা। গতকাল কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এ প্রসঙ্গে বলেন, এ বছর বোরোতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে ধান চাষ হয়েছে। হাওরে ও সারা দেশে বৈরী আবহাওয়ায় যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সামান্য। বোরোতে আশানুরূপ ফলন পাবো। ফলে, চালের দামে প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, এ বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর। এর বিপরীতে বোরো আবাদ হয়েছে ৪৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বোরো আবাদের মাধ্যমে দেশে প্রায় দুই কোটি ৮ লাখ ৮৫ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছিল। এ জন্য ৪৮ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হওয়ার কথা ছিল। তবে বিবিএসের তথ্য বলছে, এ সময়ে দেশে বোরো আবাদ হয়েছে ৪৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৮ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৯৮ লাখ ৮৫ হাজার ২৮৩ টন চাল। ফলে ডিএই লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশে বোরোর আবাদ ও উৎপাদন দু’টিই কমেছে। লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশে বোরো আবাদ কমেছে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ হেক্টর আর উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ লাখ টন। এ বছর দুই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে উৎপাদন আরো কমতে পারে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্লাস্টসহ নানা রোগে বোরো ধানের ফলন কৃষক কম পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে সরকারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ইউক্রেন ও রাশিয়ার পর সম্প্রতি ভারত থেকে বাংলাদেশে গম আমদানি বন্ধ করে দেয়ার খবরে চালের বাজার সামনে বাড়তে পারে, এমন সম্ভাবনায় মজুদদাররা গ্রামে গ্রামে গিয়ে বোরো ধান সংগ্রহ শুরু করেছে। আবার স্বাবলম্বী কৃষকরাও তাদের ধান এখন বিক্রি না করে বেশি দামের আশায় মজুদ করে রাখছেন।

আশুগঞ্জ অটো রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল করিম খান সাজু বলেছেন, ‘প্রতিদিন চালকলগুলোতে যে পরিমাণ ধানের প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক কম ধান আসছে হাটে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি সয়াবিন ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। আগামীতে চালের বাজারও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চাল সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা : গত এক বছর ধরে বাজারে সরু চাল ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এই চাল দেশের চাষিরা উৎপাদন করেন। তার পরও সঙ্কট এড়াতে প্রচুর চাল আমদানি করেছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দশমিক ২৬ লাখ টন চাল মজুদ ছিল। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ১১ মে পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে ৯৮২ টন। এরপরও কমেনি এ চালের দাম। সরকারি হিসাব বলছে, গত এক বছরে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪ শতাংশের বেশি। জানা যায়, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ধানের বাজার দর বেশি হওয়ায় সরকারি গুদামে না দিয়ে বিভিন্ন এলাকার চাষিরা স্থানীয় বাজার ও ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করছেন। ফলে এ মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গত ২৮ এপ্রিল থেকে প্রতি কেজি ধান ২৭ টাকা এবং ৭ মে থেকে প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৪০ টাকা দরে কেনা শুরু করেছে সরকার। এ সংগ্রহ অভিযান আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ১১ মে পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বোরো ধান ২৯০ টন আর চাল ৯৬২ টন সংগ্রহ হয়েছে।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, কেউ অবৈধভাবে মজুদ করছে কি না, তা কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। তিনি দেশে খাদ্যসঙ্কট হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন। খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, সুনামগঞ্জে সম্প্রতি বোরো ফসলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও চাষাবাদ হয়েছে অনেক বেশি। এ থেকে আমাদের ধান-চালের শক্তিশালী একটি মজুদ গড়ে উঠবে। এ ছাড়াও গত আউশ ও আমন ধানেরও আমাদের প্রচুর মজুদ রয়েছে। বৃষ্টির কারণে আগামী আউশ ফসলও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই দেশে কোনোভাবেই খাদ্যসঙ্কট তৈরি হবে না। গতকাল রোববার সিলেট সদর উপজেলায় খাদ্যগুদাম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সরকারিভাবে ভারত গম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। তবে বেসরকারিভাবে রফতানি বন্ধ রয়েছে। তারা রফতানি বন্ধ করলেও এতে বাংলাদেশের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। ভারত গম রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দ্রুত তুলে নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, তাদের উৎপাদিত গম তাদেরকে তো বিক্রি করতেই হবে।

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এক বছর থেকে আমরা বিদেশ থেকে চাল আমদানি করিনি। আমাদের কৃষকদের উৎপাদিত ধান দিয়েই চালের চাহিদা মিটছে। তবে গম আমাদের দেশে হয় না, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গম আমদানি করা হতো ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। কিন্তু এই দু’দেশের যুদ্ধের সময়ে আমরা সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে তিন লাখ মেট্রিকটন গম আমদানি করেছি। পরবর্তীতে যা দরকার তাও ভারত থেকে আমদানি করা হবে।

 


আরো সংবাদ


premium cement