২১ মে ২০২২
`

শাবি ভিসি অবরুদ্ধ পানি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন

শিক্ষার্থীদের গণ-অনশন শুরু; মন্ত্রীর সাথে বৈঠকের ফল শূন্য
-

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির বাসভবনের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার রাত পৌনে ৮টায় তারা বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এর আগে বিকেলে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনে জানান, অনশনের পরও ভিসি পদত্যাগ না করলে তাকে পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হবে। শিক্ষার্থীরা তাদের মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেন, রোববারের পর থেকে ভিসির বাসভবনে পুলিশ ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারবে না। অন্য দিকে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে গতকাল গণ-অনশন কর্মসূচি শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। অনশনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নতুন করে আরো চার শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছেন। শনিবার রাতে ভিসির বাসভবনের সামনে গণ-অনশনের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।
এ দিকে টানা চার দিনের অনশনে বিবশ শিক্ষার্থীদের শরীর। অনশনে অংশ নেয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একে একে অসুস্থ হতে থাকলে দ্রুত তাদের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অনেকের উঠে বসার শক্তি নেই। স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারায় কাউকে কাউকে দেয়া হচ্ছে অক্সিজেন সাপোর্ট। হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন তারা। এ পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের এক কথা ‘মৃত্যু মেনে নেব, তবু এই ভিসিকে মানব না।’ শিক্ষার্থীদের দাবি, ভিসি পদত্যাগ না করে সময়ক্ষেপণ করছেন। তাকে পদত্যাগ করতে হবে। তার পদত্যাগপত্র আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত অনশন কর্মসূচি চলবে। তারা সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে কর্মসূচি পালন এবং সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী ছাড়া বহিরাগত ব্যক্তিদের ক্যাম্পাসে অবস্থান না করার আহ্বান জানান।
ভিসির বাসভবনে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড : ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে আর কাউকে দেখা করতে দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন শাবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। রোববার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তারা এই ঘোষণা দেন। এর পরই শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনের গেটের সামনে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান নেন। তবে শিক্ষার্থীদের পেছনে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা এখানে আমরণ অনশন করছি। কিন্তু ভিসি বাসায় আরাম করছে। যে আসছে তার সঙ্গে দেখা করছেন। এ অবস্থা চলতে দেয়া হবে না। এ জন্য এখন থেকে ভিসির বাসভবনের সামনের গেইটে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। তবে কোনো সহিংসতা করব না। পুলিশ ও সংবাদ মাধ্যমে ছাড়া আর কাউকে ভেতরে ডুকতে দেয়া হবে না বলেও জানান তারা।
খাট ফেলে অনশন : গত বুধবার থেকে ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এত দিন মাটিতে বিছানা পেতে শুয়ে-বসে অনশন করলেও এবার ভিসির বাসভবনের সামনের পুরো রাস্তা বন্ধ করে খাট ফেলে তাতে শুয়ে-বসে অনশন কর্মসূচি পালন করছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা সেখানে দু’টি খাট রাস্তায় ফেলতে অনশন করতে দেখা যায়।
অনশনে আরো ৪ শিক্ষার্থী : শাবি ভিসি পদত্যাগের দাবিতে অনশনে যোগ দিয়েছেন আরো ৪ শিক্ষার্থী। এ নিয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৬ জনে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৬ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ চিকিৎসা নিয়ে ফের ফিরে আসছেন অনশনস্থলে। অনশনে যোগ দেয়া নতুন শিক্ষার্থীরা হলেন ইফতেখার আল মাহমুদ, সামিরা ফারজানা, সামিউল এহসান শাকিল। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী। এ দিকে চলমান আন্দোলনে সংহতি জানাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। রোববার দুপুরে শাবি ক্যাম্পাসে এসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি জানান ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যা বললেন : ভিসির পদত্যাগ দাবিতে চলমান এই আন্দোলনকে কেউ যদি তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে চায় ও সহিংসতায় জড়ায় তবে এর দায়ভার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নেবে না। রোববার দুপুরে গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৪ জানুয়ারি থেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করেন, যা এখনো চলমান। আমাদের এ দাবি খুবই সাধারণ এবং এক দফা। আমাদের এই আন্দোলন কেন্দ্র করে কেউ যদি তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে চায় এবং সহিংসতায় জড়ায়, তবে তার দায়ভার কোনোভাবেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নেবেন না। এটি শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শুধু শাবির শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, যা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক।
শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সমাধান আসেনি : শাবিপ্রবি ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। শনিবার দিবাগত মধ্যরাতে সোয়া ১ ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক হয়। তবে এ বৈঠকে চলমান সঙ্কট নিয়ে কোনো সমাধান আসেনি। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের আন্দোলন ও অনশন চলবে।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের দাবির কথা লিখিতভাবে জমা দেয়ার পরামর্শ দেন। দাবি পাওয়ার পর তিনি এ নিয়ে পরবর্তী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান। সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল শাবিপ্রবিতে আসেন। এতে নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী। তার সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: জাকির হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার সাহা, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জনের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে দু’জন অনশনকারী শিক্ষার্থীও ছিলেন। রাত ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনের ১২৯ নম্বর কক্ষে আলোচনা শুরু হয়। এতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
সভা শেষে রাত সোয়া ২টার দিকে শফিউল আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, বৈঠকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন। শিক্ষামন্ত্রী সব ধৈর্যসহকারে শুনেছেন। সব কিছু শুনে তিনি শিক্ষার্থীদের অনশন থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের আইনগত ও অ্যাকাডেমিক কোনো সমস্যায় যেন পড়তে না হয়, সেটি দেখবেন বলেও জানিয়েছেন। ভিসির পদত্যাগ, অপসারণ কিংবা ছুটিতে পাঠানো বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নাদেল বলেন, ভিসিকে সরিয়ে দেয়া, অপসারণ করা বা ছুটিতে পাঠানোর বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা হবে বলে তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিয়েছেন।
শিক্ষকদের বিবৃতি : শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকরা। এতে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়িত্বরত প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না বলে জানান তারা। শনিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন এই পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মস্তাবুর রহমান। এতে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন হতে চলেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ করছি যে, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের আক্রমণের ব্যাপারে কোনো অফিসিয়াল ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে না দিয়ে কালক্ষেপণ করে অনশনরত শিক্ষার্থীদের জীবন চরম সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার দায়ভার কোনোভাবেই প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এড়াতে পারেন না। এ অবস্থায় আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাবতীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের অফিসিয়াল ব্যাখ্যা জনসমক্ষে উপস্থাপন করার দাবি জানায়।
শাবিতে বিএনপির চিকিৎসকদল : শাবির অনশনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। রোববার সকালে বিএনপির একটি চিকিৎসক প্রতিনিধিদল শিক্ষার্থীদের দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যান। তারা অসুস্থ এবং অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন। প্রতিনিধিদলের প্রধান বিএনপির স্বাস্থ্য সম্পাদক ডা: রফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান। ডা: রফিক বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল অনশনরত চিকিৎসাধীনদের দেখতে গেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করছি। এ সময় ডা: জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা: আশরাফুল হাসান মানিক, ডা: সাকিব আবদুল্লাহ চৌধুরী ও ডা: মেহেদি হাসান অনিক উপস্থিত ছিলেন।
আন্দোলনের সূত্রপাত : ১৩ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েক শ’ ছাত্রী। শনিবার সন্ধ্যার দিকে ছাত্রলীগ হলের ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায়। পরদিন বিকেলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে ভিসিকে অবরুদ্ধ করেন। তখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা ও তাদের লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে ভিসির পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।


আরো সংবাদ


premium cement