২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

শান্তি মিশন থেকে বাদ দেয়ার আহ্বান র‌্যাবকে

জাতিসঙ্ঘের কাছে বৈশ্বিক ১২ মানবাধিকার সংস্থার চিঠি
-

জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে র্যাবকে বাদ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ১২টি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থা জাতিসঙ্ঘের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে সই করেছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এশিয়ান ফেডারেশেন এগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিসাপিয়ারেন্সেস (এএফএডি), এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস আন্ড ডেভেলপমেন্ট (ফোরাম-এশিয়া), এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (এএনএফআরইএল), ক্যাপিটল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রজেক্ট, সিভিকাস : ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, রবার্ট এ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং দ্য অ্যাডভোকেটস ফর হিউম্যান রাইটস এবং ওয়ার্ল্ড অরগানাইজেশন এগেইনস্ট টর্চার (ওএমসিটি)।
গত বছরের ৮ নভেম্বর জাতিসঙ্ঘের আন্ডার সেক্রেটারিকে এই চিঠি পাঠান তারা। তবে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে এই চিঠির আনুষ্ঠানিক কোনো উত্তর দেয়া হয়নি। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা, ১২টি নিম্নস্বাক্ষরকারী সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানাচ্ছি যে জাতিসঙ্ঘের ২০১২ সালের পলিসি অন হিউম্যান রাইটস স্ক্রিনিং অব ইউনাটেড ন্যাশন পারসোনেল বাংলাদেশী নাগরিকদের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।’
ডিসেম্বরে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কাজে জড়িত থাকার’ অভিযোগে বাংলাদেশের পুলিশের বিশেষ বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান মোট ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে র্যাব কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ‘বিষয়টি সম্পর্কে এখনো জানেন না’ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে বিবিসি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, এ চিঠিটি দুই মাস আগে ২০২১ সালের নভেম্বরের আট তারিখে পাঠানো হয়েছিল, যা গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে। তবে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা কর্মসূচি থেকে এখনো ওই চিঠির ব্যাপারে কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রেরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামনের সারিতে রয়েছে। দুই হাজার বিশ সালে বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ, বিভিন্ন বাহিনী থেকে এ সময় ৬ হাজার ৭৩১ জন সদস্য পাঠানো হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, দেশের ভেতরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে কর্মকর্তাদের পুরস্কার হিসেবে শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো হয়, বিশেষ করে র্যাব সদস্য যাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়ের ল্যাকোঁয়ার কাছে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, র্যাবে কাজ করেছেন এমন সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে শান্তিরক্ষা কর্মসূচি থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস রয়েছে এমন পুলিশ ও সামরিক বাহিনী সদস্যদের শান্তিরক্ষী মিশনে নেয়া বন্ধ করার ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং যারা কাজ করছেন তাদের নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসঙ্ঘের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, র্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এর আগে র্যাব সদস্যদের নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।
রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের সভাপতি কেরি কেনেডি বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষীদের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করার ব্যাপারে যদি সেক্রেটারি জেনারেল গুতেরেসের সদিচ্ছা থাকে, তা হলে তিনি নিশ্চিত করবেন যে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মতো নির্যাতনের প্রমাণিত রেকর্ড রয়েছে এমন কোনো সংস্থাকে কোনো দেশে মোতায়েন করা থেকে বিরত থাকা হবে।’
চিঠিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর র্যাবের ভেতরে সংস্কারের জন্য পদক্ষেপ নেয়ার বদলে, বাংলাদেশ সরকার ‘অভিযোগ অস্বীকার’ করছে এবং মানবাধিকার কর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে, গুম ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বাড়িতে হাজির হয়ে পুলিশ তাদের হুমকি দিচ্ছে। সেই সাথে মিথ্যা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করছে যেখানে লেখা থাকছে তাদের পরিবারের সদস্য নিখোঁজ হয়নি এবং তারা (পরিবার) ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘বিশেষ করে আমরা উদ্বিগ্ন যে, যেসব ব্যক্তি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাথে কাজ করেছেন তাদের জাতিসঙ্ঘ মিশনে পাঠানো হচ্ছে। ২০০৪ সালে এই ইউনিটটি গঠিত হওয়ার পর থেকে ইউনিটের সদস্যদের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও জোরপূর্বক গুম করার ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকার পরও এটি হচ্ছে।’
চিঠিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলেছে, র্যাবের কিছু কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। চিঠিতে জাতিসঙ্ঘের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাউকে নিয়োগ দেয়ার আগে একটি যাচাই পদ্ধতি চালু করা উচিত, যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতনের অভিযোগও তদন্ত করে দেখা হবে। এর আগে গত ১০ ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে পৃথকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দফতর।


আরো সংবাদ


premium cement