১৬ মে ২০২২
`

খ্যাতনামা আইনজ্ঞ বিচারপতি টি এইচ খান আর নেই

-

গত ২১ অক্টোবর ছিল তার ১০২তম জন্মদিন। করোনাকালীন সময়ে অনেকটা পারিবারিকভাবে বরেণ্য এই ব্যক্তির জন্মদিনটি পালন করা হয়েছিল। জন্মদিন পালনের ঠিক দুই মাস ২৫ দিন পরই তিনি চলে গেলেন। খ্যাতনামা এই ব্যক্তিটি হচ্ছেন বিচারপতি টি এইচ খান। গতকাল রোববার বিকেল ৫টায় রাজধানীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আজ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে প্রবীণ এই আইনজ্ঞের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে মরহুমের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলাধীন ঔটি গ্রামে দাফন সম্পন্ন হবে।
প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী বিচারপতি তাফাজ্জাল হোসেন (টি এইচ) খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। তিনি মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছেন।
প্রবীণ আইনজীবীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রোববার ভোরে রাজধানীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল তার ছেলে সিনিয়র সাংবাদিক ও সিনিয়র আইনজীবী আফজাল এইচ খান জানান, বিকেল ৫টায় আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি জানান, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রোববার ভোরে তাকে রাজধানীর কল্যাণপুরে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বার্ধক্যজনিত জটিলতাসহ নিউমোনিয়ায় ভুগছেন। তিনি আরো জানান, এর আগে অসুস্থ অবস্থায় তাকে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে গত ৯ ডিসেম্বর ভর্তি করা হয়। এরপর অবস্থার উন্নতি হলে ৬ জানুয়ারি বাসায় আনা হয়।
দেশবরেণ্য ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই আইনবিদ ১৯২০ সালের ২১ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলাধীন ঔটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি আইন পেশায় যোগ দেন এবং বর্তমানে তিনি দেশের প্রবীণতম আইনজীবী। বিচারপতি টি এইচ খানের প্রকৃত নাম মো: তাফাজ্জাল হোসেন খান। তিনি ১৯৬৮ সালে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তিনি হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ১৯৭৩ সালের জুলাই মাস থেকে আবার আইন ব্যবসায় ফিরে আসেন। ১৯৭৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর আইন, শিক্ষা, ধর্ম, ভূমি ও রাজস্ব এবং ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের নেতৃত্বে নতুন সামরিক আইন জারি করা হয়। তখন তিনি আবার আইন পেশায় ফিরে যান। ১৯৮৬ সালে এরশাদের নির্বাচনে বিরোধিতা করার জন্য গ্রেফতার হন।
বিচারপতি টি এইচ খান ১৯৯২ সালে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। এই পদে তিনি ২০১১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিএনপির প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান।
১৯৯২ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভাস্থ জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশনের মেম্বার এবং একই বছর জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দান করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৯৫ সালে বিচারপতি টি এইচ খান এশিয়া জোন থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালের ১৯ জুন মাস পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল পদে বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
১৯৪০ সালে বিচারপতি টি এইচ খান ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং ১৯৪২ সালে তৎকালীন কলকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৪৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স এবং ১৯৪৬ সালে এমএ পাস করেন। ১৯৫১ সালের ১৪ মার্চ তিনি হাইকোর্টের আইনজীবী হন। আইন পেশা ছাড়াও বিচারপতি টি এইচ খান প্রথম জীবনে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, ঢাকার জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণতম আইনবিদ বিচারপতি টি এইচ খান বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে এখন আর আদালতে আসেন না। তবে এই বয়সেও তার স্মরণশক্তি এবং চিন্তা করার শক্তি স্বাভাবিক ছিল বলে ছেলে আফজাল এইচ খান জানান।
আইনজীবী ফোরামের শোক : বিচারপতি টি এইচ খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সদস্যসচিব ফজলুর রহমান এবং সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সভাপতি আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া ও সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম সজল। গতকাল এক শোকবার্তায় তারা মরহুমের রুহের শান্তি কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
সুপ্রিম কোর্ট বারের শোক : এ ছাড়া শোক জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল গতকাল গণমাধ্যমে দেয়া এক শোকবার্তায় বলেন, বিচারপতি টি এইচ খানের মৃত্যুতে আইনাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। তিনি মরহুমের রূহের শান্তি কামনা করেন।


আরো সংবাদ


premium cement