১১ আগস্ট ২০২২
`
মিয়ানমারে দমন-পীড়ন না চালানোর আহবান জাতিসঙ্ঘের

সু চির ৪ বছরের কারাদণ্ড

-

সামরিক অভু্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে ‘গণ অসন্তোষে উসকানি’ আর ‘কোভিডবিধি ভাঙার’ অভিযোগে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। ফেব্রæয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে বন্দী সু চির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনসহ ১১টি মামলা হয়েছে। রয়টার্স ও বিবিসি।
সবগুলোতে দোষীসাব্যস্ত হলে নোবেলজয়ী এ নেত্রীর সর্বোচ্চ ১০০ বছরের বেশি কারাদণ্ড হতে পারে। এর মধ্যে প্রথম মামলায় দুই অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। গতকাল সোমবার মিয়ানমারের একটি আদালত এ রায় দেন। সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) দলের অন্যতম নেতা ও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট উয়িন মিন্টকেও একই অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল, তাকেও একই সাজা দেয়া হয়েছে। গত ১ ফেব্রæয়ারি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। সেদিনই সু চি ও তার দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। সু চিকে তখন থেকেই গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো শুরু থেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে। সোমবারের রায়ের পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক উপপরিচালক মিং উ হাহ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিরোধীদের নির্মূল করে মিয়ানমারের কণ্ঠরোধ করার জন্য সামরিক বাহিনী কী করতে পারে, ভুয়া অভিযোগে সু চিকে এ রকম শাস্তি দেয়া হলো তার সর্বশেষ নমুনা।’
৭৬ বছর বয়সী সু চিকে মামলার বিচারে আদালতে হাজির করা হয়েছে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য শোনার সুযোগ কমই হয়েছে। অভ্যুত্থানবিরোধীদের গড়ে তোলা প্ল্যাটফর্ম ‘জাতীয় ঐক্য সরকারের’ একজন মুখপাত্র ডা: সাসা বিবিসিকে বলেছেন, সু চি খুব ভালো অবস্থায় নেই। ‘মিলিটারি জেনারেলরা তাকে ১০৪ বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। তারা চায়, কারাগারেই তার মৃত্যু হোক।’
বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরুর পর ২০১৫ সালে মিয়ানমারে প্রথম জাতীয় নির্বাচন হয় এবং বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। ওই মেয়াদের পাঁচ বছরে সাংবিধানিকভাবে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেই এনএলডি দেশ পরিচালনা করে। কিন্তু গোল বাধে ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের ভোট ঘিরে। ওই নির্বাচনে আরো বড় জয় নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে মিয়ানমারের ক্ষমতায় আসে সু চির দল এনএলডি।
সেনা সমর্থিত বিরোধীদল থেকে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোটের ফল অস্বীকার করে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়। এ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপা উত্তেজনা চলে। এ বছর ১ ফেব্রæয়ারি নতুন সরকারের পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু সেদিন ভোরেই সু চি এবং প্রেসিডেন্ট মিন্টকে আটক করে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপর দেশজুড়ে ঘোষণা করা হয় জরুরি অবস্থা। সেনাশাসনের অবসান ঘটিয়ে মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ঠিক এক দশকের মাথায় মুখ থুবড়ে পড়ে। সেনাবাহিনীর প্রাথমিক অভিযোগ ছিল, নির্বাচনে গণহারে কারচুপি হয়েছে। যদিও তারা তাদের এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। পরে স্বাধীন পর্যবেক্ষকরাও জানান, সেনাবাহিনীর ওই অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি।
ওই অভ্যুত্থানের পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায়। সেই বিক্ষোভ দমাতে সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মাত্রা আরেক দফা বাড়ে। রাজনৈতিক কর্মী, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ গণতন্ত্রপন্থি ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যাসিসট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের হিসেবে ফেব্রæয়ারির অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ৩০৩ জন নিহত হয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে।
মিয়ানমারে দমন-পীড়ন না চালানোর আহŸান জাতিসঙ্ঘের : মিয়ানমারে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন না চালাতে জান্তা সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। দেশটিতে সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে পাঁচজন নিহত হওয়ার পর এ আহŸান জানায় সংস্থাটি। গত রোববার মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর গাড়ি তুলে দেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এতে পাঁচজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। এ সময় অন্তত ১৫ বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হওয়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের ওপর একটি গাড়ি উঠে গেছে। সড়কে লোকজন পড়ে আছেন।
এরপর মিয়ানমারে জাতিসঙ্ঘের আবাসিক সমন্বয়ক রামানাথান বালাকৃষ্ণান বলেন, যারা সাধারণের ওপর এই দমনপীড়ন চালিয়েছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। মিয়ানমার নাউয়ের খবরে বলা হয়েছে, ইয়াঙ্গুনে রোববার সকালে ‘ফ্ল্যাশ মবের’ মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ শুরুর কয়েক মিনিটের মাথায় তার ওপর গাড়ি তুলে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গেøাবাল নিউজ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের খবরে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বেআইনি বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করেছে। এ সময় আট বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ক’জন মারা গেছেন, এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন। তাদের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছেন এবং বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছেন। এটা ভয়ঙ্কর ঘটনা। মিয়ানমারে গত ১ ফেব্রæয়ারি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। সেনাবাহিনী দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। তারা সু চিসহ দেশটির অনেক রাজনীতিককে বন্দী করে।
সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে বিক্ষোভ করে আসছেন গণতন্ত্রপন্থী সাধারণ মানুষ। এ বিক্ষোভ দমনে জান্তা সরকার সহিংস পন্থা অবলম্বন করছে। মিয়ানমারে সেনাশাসনবিরোধী বিক্ষোভে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গ্রেফতার হাজারো মানুষ।


আরো সংবাদ


premium cement