২১ জানুয়ারি ২০২২, ০৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`

বিদ্রোহীতে কোণঠাসা আওয়ামী লীগ


সারা দেশে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচনে জয়ের সুফল ঘরে তোলা পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীদের মাঠে সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিরোধী জোট বিহীন নির্বাচনে প্রথম ধাপের চেয়ে তৃতীয় ধাপে বিদ্রোহী প্রার্থীরা বেশি জয়লাভ করেছে। নৌকার প্রার্থীরা বিদ্রোহীদের কাছে পরাজিত হয়ে কোথাও কোথাও জামানত হারিয়েছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে, পছন্দমতো প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেয়ায় স্থানীয় এমপিরা তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে জোরালোভাবে কাজ করছেন এবং জেতানোর জন্য তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করছেন। গত ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপের ভোটে ফল ঘোষিত হওয়া ৯০১ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৪৪৫টিতে। জয়ের হার ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৪২৬টিতে। অবশ্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় যোগ করলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। এ ধাপে আওয়ামী লীগের ৯৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন।

ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র দুইটিতে নৌকা মার্কার প্রার্থী জয়লাভ করেছে। আর ১০টিতেই হেরেছে আওয়ামী লীগ। নৌকার প্রার্থী হেরে যাওয়ার পেছনে স্থানীয় এমপি কবিরুল হক মুক্তির কৌশলী ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টিতে নৌকা পরাজিত হয়েছে। সুনামগঞ্জের ১৭ ইউপির ১৫টিতেই নৌকার প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। এর মধ্যে সদরের ৯ ইউপির কোনোটিতেই জিততে পারেনি আওয়ামী লীগ। হবিগঞ্জের ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র আটটিতে নৌকার প্রার্থীরা জয়ী হয়েছে। দিনাজপুরের ২৩ ইউপির ১৬টিতেই পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। কক্সবাজারের ১৬ ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জিতেছে এবং দুই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। রংপুরের তিন উপজেলায় ১৩ ইউনিয়নের মধ্যে চেয়ারম্যান পদে চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রাথী জয় পেয়েছেন। যশোরের তিন উপজেলার ৩৫ ইউনিয়ন পরিষদের ১৪টিতে নৌকার প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। ময়মনসিংহের ত্রিশালে ১২ ইউনিয়নের ছয়টিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জয়লাভ করেন। সাতক্ষীরার দুই উপজেলায় ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ১১টিতেই হেরেছে নৌকা। নওগাঁর মান্দায় ১৪টি ইউপির মধ্যে ১১টিতে আওয়ামী লীগ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই উপজেলায় ২২ ইউনিয়নের মধ্যে ১৪টিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এছাড়াও চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় ১৩ ইউনিয়নের আটটিতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগ জিতেছে মাত্র পাঁচটি ইউনিয়নে।

এর আগে গত ২১ জুন প্রথম ধাপের ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২৮ জন ১৪৮ আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী জয়লাভ করেন। আর ৪৯টি ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রথমধাপের দ্বিতীয় অংশের ১৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ২০ সেপ্টেম্বর। এরমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৩ জন এবং ভোটে ৭৬ জনসহ মোট ১১৯ জন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জয়লাভ করেন। মনোনয়নের বাইরে ২৪জন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করে। গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭৮ জনসহ ৪৮৬ জন আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী জয়লাভ করে। আর স্বতন্ত্র ৩৩০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করে। যার প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। এ হিসাবমতে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নয়া দিগন্তকে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে কোথাও কোথাও নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে এবং জয়লাভ করে- এটা নতুন কিছু নয়। বহু বছর আগে থেকে এটা চলে আসছে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়লাভের পেছনে দুটি কারণ দেখা যায়। প্রথমত স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলে। দ্বিতীয়ত স্থানীয়ভাবে সঠিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে না পারলে। তিনি আরো বলেন, প্রার্থী নির্বাচন করা হয় জেলা-উপজেলার নেতাদের মাধ্যমে। তারা যেভাবে কেন্দ্রে নাম পাঠান, সেখান থেকে মনোনয়ন বোর্ড সিলেকশন করে। এক্ষেত্রে কোথাও কোথাও এমপিদের কাছের লোক মনোনয়ন পেয়ে যায় আবার প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীদের সুপারিশেও কেউ কেউ পেয়ে থাকে। সঠিক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে না পারলে মূলত দল মনোনীত প্রার্থীরা হেরে যায়।

ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পরাজয় প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, তৃণমূল থেকে অনেক সময় ভুল নাম আসে, কখনো কখনো বিভিন্ন প্রভাবের কারণে সংস্থার রিপোর্টও প্রভাবিত হয়, ভুল আসে। ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার সৎ সাহস আওয়ামী লীগের আছে। আমরা ভুলগুলো খুঁজে বের করে সতর্ক হচ্ছি। তিনি আরো বলেন, ইউপি নির্বাচনে দলের মনোনয়ন যারা পায়নি তারা দলের নিয়ম-শৃঙ্খলা না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন এবং এর নেপথ্যে যারা মদদ দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আরো সংবাদ


premium cement