২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০৯ মাঘ ১৪২৮, ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
`
রাজধানীর সমাবেশে জনতার ঢল

খালেদা জিয়ার ক্ষতি হলে রেহাই নেই : ফখরুল

-

গত সোমবার রাতেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুরুতর অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়ার রক্তক্ষরণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অবিলম্বে তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কোনো ক্ষতি হলে জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারকে রেহাই দেবে না। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এক সমাবেশে এই হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা (সরকার) বলেন, আইনের কারণে দেশনেত্রীকে বাইরে যেতে দিতে পারছি না। কেন মিথ্যা কথা বলেন। এখানে অনেক আইনজীবী আছেন তারা বলছেন, ওই ৪০১ ধারাতে বলা আছে- একমাত্র সরকারই পারে তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে। এখন দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগ সরকারের, শেখ হাসিনা সরকারের। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যদি সুচিকিৎসা না হয়, যদি তার ক্ষতি হয় এ দেশের মানুষ কোনো দিন আপনাদের রেহাই দেবে না। দায় সব আপনাদেরকেই বহন করতে হবে।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল জানান, সোমবারও তার রক্তক্ষরণ হয়েছিল। তবে চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করে তা বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছেন। একজন সংগ্রামী মহিলা বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুর প্রহর গোনছেন। সোমবার রাতে আমি হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমাদের সব চিকিৎসক তার চিকিৎসা করছেন, প্রায় ১০ জন। তারা বসে আছেন। প্রত্যেকের মুখ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, চিন্তিত। তারা বললেন, আমরা যেটা আশঙ্কা ও ভয় পাচ্ছিলাম আমরা বলেছিলাম যেকোনো সময় আবার রক্তক্ষরণ হতে পারে কালকে আবার রক্তক্ষরণ হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমত আমাদের সেই চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে গত তিনটা সঙ্কট যেভাবে পার হয়েছেন আবারো সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন।
গত ১৩ নভেম্বর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন। তিনি লিভার সিরোসিস রোগে ভুগছেন। খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড অবিলম্বে তাকে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশের উন্নত সেন্টারে নেয়ার সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশের ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ইতোমধ্যে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। তবে সেই আবেদনের এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার এই সমাবেশ হয়। বেলা ১১টা থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের বিভিন্ন থানা এবং আশপাশ গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী জেলা থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন। বেলা দেড়টায় শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় সমাবেশ শেষ হয়। সমাবেশের শুরুতে ওলামা দলের আহ্বায়ক শাহ নেছারুল হক খালেদা জিয়ার আশু সুস্থতা কামনায় মুনাজাত পরিচালনা করেন। ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’ স্লোগানে স্লোগানে হাজার হাজার নেতাকর্মী সমাবেশস্থল মুখর করে রাখেন। কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল রেস্তোরাঁ থেকে ফকিরাপুল সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতির কারণে সেখানে তিল পরিমাণ ঠাঁই ছিল না। বিকেলের মধ্যেই সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রাস্তায় বসে নেতাকর্মীরা নেতাদের বক্তব্য শোনেন। সমাবেশে চারটি ছোট ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশাল আকৃতির ছবিসংবলিত ব্যানারে লেখা ছিল- দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে প্রেরণের দাবিতে সমাবেশ। খালেদা জিয়াকে বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে রাজধানী ছাড়াও গতকাল ৯ বিভাগীয় শহরেও একযোগে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব আমিনুল হক ও দক্ষিণের রফিকুল আলম মজনুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, হাফিজউদ্দিন আহমেদ, আহমেদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, শাহিদা রফিক, তৈমূর আলম খন্দকার, আবদুল হাই, আফরোজা খানম রীতা, কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, কামরুজ্জামান রতন, মীর সরফত আলী সপু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, দেওয়ান মো: সালাহউদ্দিন, আবদুস সালাম আজাদ, তাবিথ আউয়াল, যুবদলের সাইফুল আলম নীরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, সালাহউদ্দিন সরকার, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, কৃষকদলের শহিদুল ইসলাম বাবুল, জাসাসের জাকির হোসেন রোকন, তাঁতিদলের আবুল কালাম আজাদ, ছাত্রদলের ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এ সময় বিএনপির আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, তানভীর আহম্মেদ রবীন, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহসহ হাজারো নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমত যে সকালে উঠে আমি আবার ডা: জাহিদকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি আমাকে জানালেন, ম্যাডাম এখন আগের চেয়ে অনেকটা ভালো। ডাক্তাররা বলেছেন এই ভালো ভালো নয়। কারণ তারা পরিষ্কার করে বলেছেন, তার অসুখের চিকিৎসা এখন আর এখানে নেই। এই চিকিৎসা করাতে হলে তাকে অবশ্যই বিদেশের উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠাতে হবে যেখানে উন্নত চিকিৎসা সম্ভব।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমরা বেগম জিয়ার কাগজপত্র বিদেশে পাঠিয়েছি। কাদের সামনে বলছেন? কূটনীতিকদের সামনে, বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতদের সামনে। কেন বলছেন? বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা, রাষ্ট্রদূতরা ইতোমধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে সরকারের ওপরে যে, বেগম খালেদা জিয়াকে বাইরে পাঠাও চিকিৎসার জন্য। তার প্রমাণ আপনারা দেখেন। যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সম্মেলন হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। কেন? বাংলাদেশ এখন আর গণতন্ত্রের দেশ নেই। শেখ হাসিনার অধীনে, এই সরকারের অধীনে নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে, তাদের কর্তৃত্ববাদ, স্বৈরাচারের কারণে এই দেশ পুরোপুরিভাবে একটা কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসকদের সম্পর্কে সরকারের এক মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, কী দুর্ভাগ্য আমাদের, কী জাতি আমরা, আমরা এমন একটা সরকার পেয়েছি জোর করে ক্ষমতা দখল করে আছে। একজন মন্ত্রী বলছেন, ডাক্তারদেরকে বিএনপি যা বলতে বলেছে তারা তাই বলছেন। ধিক্কার দেই, ধিক্কার দেই আমি সেই মন্ত্রীকে। এভাবে বিদ্রƒপ করে কথা বলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ, চায় খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা হোক। আমাদের এখানে যেসব লোকজন আসছেন, আমার ডানে একজন রোজা রাখছেন, নামাজ পড়ছেন যে, আল্লাহ তার হায়াত বাড়িয়ে দাও, তিনি যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পারেন। এই যে কোটি কোটি মানুষের আহাজারি, এই যে কোটি কোটি মানুষের ফরিয়াদ, আল্লাহ কাছে নিশ্চয় পৌঁছাচ্ছে। তিনি নিশ্চয়ই বেগম খালেদা জিয়াকে সুস্থ করবেন আবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনবেন। আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। বিশেষ করে আমার তরুণ ছাত্র যুবক ভাইদের কাছে আহ্বান করতে চাই- এদেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া। তোমাদের জেগে উঠতে হবে, তোমাদেরকে উঠে দাঁড়াতে হবে। মানুষের অধিকার আদায়, ভোটাধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য আমাদের সকলকে উঠে দাঁড়াতে হবে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সরকারকে সরাব এবং দেশনেত্রীকে মুক্ত করব। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস। আজকে পত্রিকায় দেখবেন এক হাজারটা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। অর্ধেকের বেশিতে হেরে গেছে আওয়ামী লীগ। দেখেন শুরু হয়েছে পতন।


আরো সংবাদ


premium cement