০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

যানবাহন নিয়ে ফেরি উল্টে গেছে পাটুরিয়ায়

-

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় ৫ নম্বর ফেরিঘাটে বেশ কয়েকটি যানবাহনসহ পদ্মায় উল্টে গেছে শাহ আমানত নামের একটি ফেরি। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যানবাহন নিয়ে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নদী পার হয়ে পাটুরিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই ফেরিটি দুর্ঘটনায় পড়ে।
বিআইডব্লিউটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম মিশা সাংবাদিকদের বলেন, ওই ফেরিতে ১৭টি পণ্যবাহী ট্রাক ছিল বলে প্রাথমিকভাবে তারা জানতে পেরেছেন। দুটি ট্রাক ও যাত্রীরা নামার পর ফেরিটি কাত হয়ে ডুবে যায়। ঘাটের পাশে নদীতে কাত হয়ে অর্ধেক ডুবে আছে ফেরি শাহ আমানত। উদ্ধার কাজ চলছে।
ফেরি উল্টে যাওয়ার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালক শরিফুল আলম জানান, ফেরি উদ্ধারের জন্য আমাদের তিনটি ইউনিট কাজ করছে। কোনো লাশ উদ্ধার হয়নি। প্রাণহানির আশঙ্কা নেই বলে ধারণা করেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রাফি আল ফারুক জানিয়েছেন, তাদের ডুবুরি দল সেখানে তল্লাশি চালাচ্ছে। তবে কিভাবে ফেরিটি ডুবে গেলÑ সে বিষয়ে কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি।
ঢাকা ডিভিশনের ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দিনোমণি শর্মা বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ফেরির তলায় ভ্যালেন্সচারে অতিরিক্ত পানি ঢুকে ফেরিটি এক দিকে হেলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আরিচা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইন্সপেক্টর মুজিবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এক পাশে অতিরিক্ত ওজনের কারণে ফেরিটি কাত হয়ে ডুবে গেছে।
আবদুর রাজ্জাক নামে এক যাত্রী জানান, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার ৫ নম্বর ঘাট থেকে ফেরিটি যখন মাঝনদীতে পৌঁছে, তখনই সামনের দিকে ডান পাশে থাকা এক ছিদ্র দিয়ে পানি উঠতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে ফেরির ভেতর পানি জমে যায়। এ সময় পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ ১৭টি গাড়ি, দু’টি প্রাইভেট কার ও ৮-১০টি মোটরসাইকেল ছিল ফেরিতে।
অমল ভট্টাচার্য নামে ওই ফেরির অপর এক যাত্রী বলেছেন, ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরপরই ফেরিতে পানি উঠতে শুরু করে। দেড় থেকে দুই মিনিটের মধ্যে ডান দিকে কাত হয়ে ডুবে যায় ফেরিটি। তিনি তার সাথে থাকা মোটরসাইকেল ফেরিতে রেখে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতড়ে তীরে উঠেন। এখন পর্যন্ত তার মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়নি।
ফেরির ভারপ্রাপ্ত সারেং মুখলেছুর রহমান বলেন, আসলে কী কারণে ফেরি ডুবেছে তা বলা মুশকিল। ডুবে যাওয়ার স্থানে পানিও কম ছিল। নদীতেও তেমন একটা স্রোত ছিল না। তদন্ত করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
ডুবে যাওয়া ফেরিতে ট্রাক চালক মো: শাহজাহান সিটেই ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে পাশের সহকর্মীর ডাকে ঘুম ভাঙ্গে এবং হামাগুড়ি দিয়ে কোনো মতে বের হন। প্রথমে তার জ্ঞান হারালেও পরে তিনি সুস্থ হন।
শিবালয় থানার ওসি ফিরোজ কবির বলেন, ফেরির নিচে যে ডাম্প (ফাঁকা অংশ) থাকে, সেখানে ফুটো হয়ে পানি ঢোকায় নৌযানটি উল্টে যায় বলে তারা ধারণা করছেন। পাটুরিয়া নৌ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, হতাহতের কোনো খবর তারা এখন পর্যন্ত পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, তিনটি ট্রাক ভেসে গেছে। ট্রাক ছাড়াও ফেরিতে কয়েকটি মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ছিল। কতজন লোক ছিল সেটা এখনও নিশ্চিত নয়।
রাজবাড়ীর এমপি কাজী কেরামত আলী ঢাকা যাওয়ার পথে ফেরি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পাটুরিয়া ঘাটে চলে আসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটা আজকে ঘাটে ঘটেছে, যদি মধ্য নদীতে হতো কী পরিণাম হতো?
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মানিকগঞ্জের ডিসি মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ এবং পুলিশ সুপার মো: গোলাম আজাদ খান, শিবালয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানা পাটুরিয়া ঘাটে ছুটে যান। ইউএনও জেসমিন বলেন, দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে আসার পর ওই ফেরি থেকে ‘চার-পাঁচটি গাড়ি’ নামার সুযোগ পেয়েছিল। তারপর হুট করে ফেরিটি উল্টে গেছে। আমরা জানতে পেরেছি, মোট ১৭টি ট্রাক ছিল, আর বেশ কিছু যাত্রী ছিল। যখন ফেরি কাত হয়ে গিয়েছে, অধিকাংশ যাত্রী তখন নেমে গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন : রো রো ফেরি শাহ আমানত দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে নৌপরিবহন সচিবের কাছে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। গতকাল রাতে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার জাহাঙ্গীর আলম খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) সুলতান আব্দুল হামিদকে কমিটির আহ্বায়ক এবং বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (কারিগরি) মো: রাশেদুল ইসলামকে সদসথ্যসচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (আইসিটি) রকিবুল ইসলাম তালুকদার, নৌপরিবহন অধিদফতরের নটিকথ্যাল সার্ভয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন সাঈদ আহমেদ, মানিকগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক, বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের সহযোগী অধথ্যাপক ড. জুবায়ের ইবনে আউয়াল এবং নৌপুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো: জসিম উদ্দিন।
৪০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছিল ফেরিটি : পাটুরিয়া ঘাটে আংশিক ডুবে যাওয়া রো রো ফেরি আমানত শাহ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে চলাচল করছিল। অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একটি নৌযানের নিবন্ধনের মেয়াদ ৩০ বছর হয়। বিশেষ জরিপের (ফিটনেস) মাধ্যমে এরপর দু’বার পাঁচ বছর করে নিবন্ধনের মেয়াদ বাড়ানো যায়। তবে ৪০ বছরের বেশি সময় কোনোভাবেই কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। কিন্তু দেশের নৌপথে ৯৫ বছর বয়সী ফেরিও চলাচল করছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) নৌযানের তালিকা অনুযায়ী, ফেরি আমানত শাহ ১৯৮০ সালে তৈরি। ৩৩৫ জন যাত্রী ও ২৫টি যানবাহন বহন করতে পারে এটি। ৮০৬.৬০ টন ওজনের ফেরিটি সর্বোচ্চ ১০.২৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারে।
দৌলতদিয়ায় দীর্ঘ যানজট
রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, পাটুরিয়া ঘাটে ফেরিডুবির ঘটনায় নদীর অপর প্রান্ত দৌলতিয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো কিলোমিটার থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশজুড়ে যাত্রীবাহী বাসের জট রয়েছে। সোহাগ পরিবহনের যাত্রী মেহজাবিন বলেন, প্রায় ৪ ঘণ্টা ঘাট এলাকায় বসে আছি। কখন ফেরিতে উঠতে পারব জানি না। কাভার্ডভ্যান চালক সাদ্দাম জানান, নদী পার হওয়ার অপেক্ষায় আছি। তবে কবে বা কখন যে ফেরিতে উঠতে পারব জানা নেই।
বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তা জামাল হোসেন জানান, পাটুরিয়ার ৫ নং ঘাট কখন সচল হবে তা ঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। ঘাটটি চালু না হওয়া পর্যন্ত এ পাশে যানবাহনের জট থাকবে।



আরো সংবাদ