২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

ক্যাম্পের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে মিয়ানমারের গুপ্তচর

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ
-

প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে মিয়ানমারের ইন্ধনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে অস্থিতিশীল করছে একটি চক্র। মুহিবুল্লাহ হত্যার রেশ না কাটতেই শুক্রবার ভোরে উখিয়ায় মাদরাসায় ঘুমন্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। অনেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ছয়জনকে। জখম করা হয় আরো কয়েকজনকে। মূলত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়ানোয় একের পর এক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটছে হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলে দাবি সাধারণ রোহিঙ্গাদের। আর অপরাধ করার জন্য রাতের অন্ধকারকেই বেছে নিচ্ছে অপরাধীরা।
সূত্র জানায়, রাত হলেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। দিনে ক্যাম্প ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও সন্ধ্যা নামার পরই পাল্টে যায় চিত্র। রোহিঙ্গাভিত্তিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। প্রায়ই শক্তির জানান দিতে এক বাহিনী অপর বাহিনীর সাথে নেমে পড়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। সাধারণ রোহিঙ্গারা বলছেন, ক্যাম্পে ওঁৎ পেতে আছে মিয়ানমারের অনেক গুপ্তচর। গুপ্তচর আকতার আলম ও ২৭ হিন্দুকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে মিয়ানমার। এখনও ক্যাম্পে থেকে কলকাঠি নাড়ছে অনেক গুপ্তচর। মূলত প্রত্যাবাসনবিরোধীরাই এসব অপকর্ম করে ক্যাম্পে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বলে দাবি সাধারণ রোহিঙ্গাদের।
প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বলছেন, মিয়ানমারের ইন্ধনে ক্যাম্পকে অস্থিতিশীল করছে একটি চক্র। তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এপিবিএন। অপর দিকে রোহিঙ্গাদের এমন কাণ্ডে অস্থির হয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা। প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে মিয়ানমারের ইন্ধনে ক্যাম্পকে বারবার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানালেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মাহামুদুল হক চৌধুরী।
এপিবিএনের কর্মকর্তা মো: নাঈমুল হক জানালেন, প্রত্যাবাসনবিরোধীরাই ক্যাম্পে এমন কর্মকাণ্ড করছে কি না তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, একটি ব্যবসায়ী চক্র চায় কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে না যায়। কেউ সঙ্ঘবদ্ধ হতে চাইলে তাদের খুন করা হচ্ছে। আর এর পেছনে রয়েছে মিয়ানমারের সেনারা।
সাধারণ রোহিঙ্গাদের মতে, মিয়ানমার থেকে পাঠানো প্রত্যাবাসন তালিকায় রয়েছে অনেক গুপ্তচর পরিবারের নাম। যারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবৈধ ব্যবসা করে। তাদের মিয়ানমারের সেনারা শেল্টার দেয়। রোহিঙ্গাদের দিয়ে ইয়াবা কক্সবাজারে পাঠায়। তাদের কিছু রোহিঙ্গা আছে ছয় মাস কক্সবাজার ক্যাম্পে এবং ছয় মাস মিয়ানমারে থাকে। আন্তর্জাতিক বড় একটি অংশও এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত। এ ছাড়া অপহরণ, অগ্নিকাণ্ড এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের চারটি সন্ত্রাসী সংগঠন তৎপর আছে। গ্রুপের সদস্যরা নানা অবৈধ ব্যবসা করে। তাদের ক্যাম্পে দোকানপাট আছে। রোহিঙ্গারা চলে গেলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। তারা ক্যাম্পের ত্রাণসামগ্রী বাইরে বিক্রিও করে। তাদের মিয়ানমারের সেনারা শেল্টার দেয়। তাদের দিয়ে ইয়াবা কক্সবাজারে পাঠায়। তাদের কিছু রোহিঙ্গা আছে ছয় মাস কক্সবাজার ক্যাম্পে এবং ছয় মাস মিয়ানমারে থাকে। এখানে আরসা এবং আরএসও নামেও দু’টি উগ্রপন্থী গ্রুপ আছে। তারা কেউই মিয়ানমারে ফিরতে চায় না, কারণ তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।
উখিয়ার কুতুপালং এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন জানান, মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের একটি পতাকাতলে আনতে সফল হয়েছিলেন। আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের পক্ষে মুহিবুল্লাহ ছিলেন অগ্রণী কণ্ঠ। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিজ মাটিতে ফেরানোর স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন তিনি। সর্বশেষ মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক গ্রুপগুলোর সাথে যোগাযোগ করে মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের সমস্যার কথা তাদের বোঝাতেও সক্ষম হন। তার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতার কারণে ক্যাম্প ঘিরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী আতঙ্কিত ছিল। তবে তার হত্যার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাম্পে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি জানান, আরসা ও আল-ইয়াকিন নামের দুই সংগঠনে অস্ত্রধারী রয়েছে ক্যাম্পজুড়ে, যারা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতে পারে।
কক্সবাজারের ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাইমুল হক বলেন, আরসা ও আল-ইয়াকিনের সশস্ত্র কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে অনেক দুষ্টু লোক নিজেদের আরসা ও আল-ইয়াকিনের সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী ভাবে। আমাদের নজর সেখানে আছে। অপরাধ করে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। পুলিশের খাতায় রোহিঙ্গাদের আমলনামা : কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য মতে, চার বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে এক হাজার ২৯৮টি মামলা হয়েছে। এতে আসামি হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ রোহিঙ্গা। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছেÑ হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদকপাচার, মানবপাচার, পুলিশের ওপর হামলা ইত্যাদি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭০টি খুনের মামলা হয়েছে চার বছরে। এ সময় ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানবপাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৩৪টি মামলা হয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে। অন্যান্য অপরাধে হয়েছে ৮৯টি মামলা। গেল ৪৮ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় ২২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ৩৫৪ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি, যার আসামি ৬৪৯ জন। ২০২০ সালে ১৮৪ মামলায় হয়েছে, ৪৪৯ আসামি।
ক্যাম্পে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমারভিত্তিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী যেসব অস্ত্র সাধারণত বেশি ব্যবহার করে তার মধ্যে রয়েছে ওয়ান শুটার গান। ওয়ান ব্যারেলের এই অস্ত্রে এসএমজি ও একে-৪৭ রাইফেলের গুলি ব্যবহার করতেও দেখা যায়। আবার অনেক গ্রুপের কাছে রয়েছে হাতে তৈরি অস্ত্রও, যা সম্প্রতি চট্টগ্রামে একটি অস্ত্রের চালান ধরে প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে অস্ত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নিয়ে গিয়েছিল কারবারিরা। তা ছাড়া ইয়াবার বিশাল চালানও আসে ক্যাম্পে। ক্যাম্প নিরাপদ মাদক সরবরাহের জায়গা। রোহিঙ্গারা নিয়ন্ত্রণ করছে মাদকের কারবার। আর স্থানীয়রা বহনকারী হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।



আরো সংবাদ