০৩ আগস্ট ২০২১
`

কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি বাংলাদেশ

অবস্থান ব্যাখ্যা করে ইউএনজিএ প্রেসিডেন্টকে চিঠি
-

কৌশলগত কারণেই জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর আনা প্রস্তাবে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল। প্রস্তাবে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সু চি সরকারকে হটিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিরোধিতা করা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি বা সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়ের ওপর চালানো গণহত্যার সাথে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ইস্যু প্রস্তাবে ঠাঁই পায়নি। এ কারণে বাংলাদেশ ইউএনজিএতে উত্থাপিত প্রস্তাবে কোনো পক্ষ অবলম্বন করেনি।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু না থাকার কারণে ইউএনজিএর ভোটে অংশগ্রহণ করা থেকে বাংলাদেশ বিরত ছিল। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির চেয়ে বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটিতে বাংলাদেশ হ্যাঁ বা নাÑ কোনো দিকেই ভোট দেয়নি। সরকারের এই সিদ্ধান্তটা সঠিক বলেই আমি মনে করি। তিনি বলেন, গণতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রÑ মিয়ানমারের জনগণের বিষয়। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছিল। কোথাও গণহত্যা চালানো হলে তা অভ্যন্তরীণ ইস্যু থাকে না, আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল না। তাই আগ বাড়িয়ে কেন বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকারের সাথে ঝগড়া করতে যাবে?
অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ভারত, চীন, রাশিয়াসহ অনেক দেশই এই প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য চীনের সহযোগিতা ও ভারতের সমর্থন বাংলাদেশের প্রয়োজন। গণতন্ত্রকে মুখ্য ইস্যু করে পশ্চিমা দেশগুলোর আনা এই প্রস্তাবে সমর্থন বা বিরোধিতা করে বাংলাদেশের লাভ নেই। তিনি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো মুখে মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকলেও ভেতরে ভেতরে মিয়ানমারের সাথে ঠিকই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মিয়ানমারে ৮০০ এর বেশি মানুষ মারা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারে তাদের দূতাবাস বন্ধ করেনি, বাণিজ্যিক সম্পর্কও ছিন্ন করেনি। জাতিসঙ্ঘে পশ্চিমা দেশগুলোর এ ধরনের প্রস্তাব অনেকটা লোক দেখানো বলা যেতে পারে। গণহত্যার বিষয়টিকে তারা খুব একটা গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। আগামী অক্টোবরে মিয়ানমার ইস্যুতে ইউএনজিএর তৃতীয় কমিটিতে একটি প্রস্তাব আসবে, যাতে বেশ কয়েক বছর ধরেই রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রাধান্য পাচ্ছে। এ বছর প্রস্তাবে কী সাড়া পাওয়া যায় তা দেখার বিষয়।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশের চিঠি : ইউএনজিএর ৭৫তম অধিবেশনে এজেন্ডা আইটেম ৩৪ এ মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর আনা প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছে বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে গত ১৮ জুন ইউএনজিএর চলতি অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট ভালকান বজকিরকে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমার লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর আনা প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মিয়ানমারের সাথে আমাদের সীমান্ত রয়েছে। মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রস্তাবটি আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টির স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।
রাবাব ফাতিমা বলেন, প্রস্তাবটি নিয়ে সমঝোতার সাথে জড়িত দেশগুলো বাংলাদেশের সাথে আলাপ করেছে। বিষয়টিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রস্তাবটিতে আমাদের মৌলিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন দেখতে পায়নি। এ কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভালকান বজকির সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি জোরাল সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর আনা প্রস্তাবটি ইউএনজিএতে উত্থাপনের আগে দেয়া বক্তব্যে ভালকান বজকির বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ওপর আলোকপাত করেছিলেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে হবে। স্বেচ্ছা, নিরাপদ ও মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসন রোহিঙ্গাদের চূড়ান্ত প্রত্যাশা। তবে এর সাথে মিয়ানমার পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হওয়া সম্পর্কযুক্ত।
শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য মিয়ানমারের জনগণের প্রতি সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একতাবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ইউএনজিএ প্রেসিডেন্ট।
গত শুক্রবার ইউএনজিএতে আনা প্রস্তাবে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সঙ্কট, জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারে উদ্বেগ জানিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের মুখ্য ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এতে মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রস্তাবটির পক্ষে ১১৯ ভোট এবং বিপক্ষে একটি ভোট পড়েছে। কেবল বেলারুশ এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। বাংলাদেশসহ ৩৬টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সঙ্কট এবং এর সমাধানের কোনো পদক্ষেপের উল্লেখ না থাকায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে শনিবার রাতে জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডাসহ একটি কোর গ্রুপ জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে। আসিয়ান দেশগুলোর সাথে আলোচনা করে কোর গ্রুপ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে। আসিয়ান নেতৃবৃন্দ সম্প্রতি ব্যাংককে একটি সম্মেলনে মিলিত হন, যাতে মিয়নামারের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও ছিলেন। সম্মেলনে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা নেয়ার পর মিয়ানমারের পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য পাঁচ দফা সমঝোতা হয়, যা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু প্রস্তাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো সুপারিশ বা পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টিতে প্রস্তাবে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সমন্বিত প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের প্রতিশ্রুতিও প্রস্তাবে অনুপস্থিত ছিল। আর এ কারণে বাংলাদেশ প্রস্তাবটিতে ভোটদানে বিরত থাকে।
এ ব্যাপারে বার্তা সংস্থা পিটিআইকে জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি টিএস তিরুমূর্তি বলেছেন, প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই দ্রুততার সাথে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে এই প্রস্তাব আনা হয়েছে। এটা মিয়ানমার পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য কেবল প্রতিকূলই নয়, বরং আসিয়ান প্রচেষ্টার পাল্টা ব্যবস্থাও। তিনি বলেন, মিয়ানমারের নিকটতম প্রতিবেশী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারত। তাই মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মারাত্মক প্রভাবের বিষয়টি সম্পর্কে ভারত অবগত। এই অস্থিতিশীলতা মিয়ানমার সীমান্তের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেখানকার সমস্যা সমাধানে ভারত বৃহত্তর অংশগ্রহণ দাবি করে। ইতোমধ্যে আসিয়ানের মাধ্যমে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আসিয়ানের এই উদ্যোগকে সমর্থন করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিরুমূর্তি বলেন, এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে পরামর্শ ও গঠনমূলক আলোচনা প্রয়োজন। কারণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এসব ইস্যুর একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। এ অবস্থায় দ্রুততার সাথে একটি প্রস্তাব আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। তাই আমরা ভোটদানে বিরত থেকেছি।



আরো সংবাদ