৩০ জুলাই ২০২১
`

সীমান্তে এখনো সবচেয়ে বেশি করোনা : নতুন করে লকডাউন

শনাক্তের হার ১৩.২৫ শতাংশ, মৃত্যু ৪০
-

সীমান্ত এলাকায় এখনো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় করোনাভাইরাস। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের কমিউনিটি সংক্রমণ বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত এককভাবে রাজশাহী জেলায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে। এদিকে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সাতক্ষীরা জেলায় আরো এক সপ্তাহের লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। সাতক্ষীরায় সংক্রমণের হার ছিল ৫০ শতাংশ। খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলায় আজ শুক্রবার থেকে এক সপ্তাহের লকডাউন শুরু হবে। খুলনা শহরে চলছে এখনো লকডাউন। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা করোনা শনাক্তের দিক থেকে গতকাল ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। একই সময়ে গতকাল সারা দেশে করোনা শনাক্তের হার ছিল ১৩.২৫ শতাংশ এবং মারা গেছে ৪০ জন।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতি হয়েছে বলে লকডাউন তুুলে দেয়া হয়েছে। নাটোরের দুই পৌরসভায় লকডাউন চলছে। রাজশাহীতে লকডাউন না থাকলেও গতকাল সকাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ৩৫৩ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে এ জেলায়। রাজশাহীতে করোনা বেশি থাকার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ওই এলাকার মধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা তুলনামুলক ভালো থাকায় মানুষ রাজশাহীতে আসছেন এবং করোনা শনাক্ত হচ্ছেন। একই সময়ে রাজধানীতে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৮৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুনের পর থেকে সারা দেশে করোনা আক্রান্তের শতকরা হার দুই সংখ্যায় পৌঁছেছে। গতকাল সারা দেশে করোনা শনাক্ত ছিল দুই হাজার ৫৭৬ জন। সারা দেশে এ পর্যন্ত আট লাখ ২০ হাজার ৩৯৫ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে। ২০২০ সালের ১৮ মার্চের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে মৃত্যু হয়েছে ১২ হাজার ৯৮৯ জন। গতকাল সারা দেশে করোনা সন্দেহে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৯ হাজার ৪৪৭টি।
রাজধানী বাদ দিলে সীমান্ত শহরগুলো করোনা সংক্রমণের হার বেশি থাকার কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের কমিউনিটি সংক্রমণের কারণেই ওইসব অঞ্চলে করোনা শনাক্ত বেড়েছে। খুলনায় গতকাল নমুনা পরীক্ষার সাপেক্ষে সংক্রমণের হার ছিল ৩১.৮৫ শতাংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণের হার ছিল ১৯ শতাংশ। রাজশাহীতে এক হাজার ৬৬৪টি নমুনা পরীক্ষা করে গতকাল করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩৫৩ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮২৩টি নমুনা পরীক্ষা করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৫৮ জন। অন্যদিকে খুলনায় ৪১২টি নমুনা পরীক্ষা করে ১২২ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে। সাতক্ষীরায় ৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৪৮ জন। সাতক্ষীরায় করোনা সংক্রমণের হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, শুধুমাত্র সংক্রমণ রয়েছে এমন এলাকায় লকডাউন দেয়া উচিত। ক্ষুদ্র অঞ্চলে সংক্রমণ দেখে বৃহত্তর অঞ্চলে লকডাউন দিয়ে লাভ হয় না। বরং ক্ষুদ্র অঞ্চলটিকেই লকডাউন করে সেখানে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ বাড়িয়ে দিয়ে কনট্যাক্ট ট্রেসিং করা উচিত। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, পরীক্ষার পাশাপাশি জিনোম সিকোয়েন্সের পরিমাণও বাড়ানো উচিত। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে যেকোনো এলাকায় করোনার কোনো ভ্যারিয়েন্টে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের ৪২ লাখ মানুষ অ্যাস্ট্রাজেনেকার দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিতে পেরেছেন। করোনা প্রতিরোধে দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত ১২ কোটি মানুষকে টিকা দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ৪২ লাখ মানুষকে টিকা দেয়ার কারণে অধিকাংশ মানুষ করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অরক্ষিত। ফলে সাবধানতা অবলম্বন করা ছাড়া করোনা সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে করোনা নিয়ন্ত্রণে লকডাউনকে স্বল্প মেয়াদি সমাধান বলে মনে করছেন অনেকে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিশেষজ্ঞ ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম এ ব্যাপারে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে করোনার বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট ও টিকার লড়াইয়ে টিকাই বিজয়ী হচ্ছে। ফলে এটা বলা যায় যে, করোনা নিয়ন্ত্রণে টিকার বিকল্প নেই। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি অনেকটা থমকে গেছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের টিকার লট আসেনি। এমতাবস্থায় ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে বিপদ ঘটতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। যত দিন পর্যন্ত আবারো আগের মতো টিকা কর্মসূচি শুরু করা যাবে না তত দিন পর্যন্ত বেশি করে পরীক্ষা, জিনোম সিকোয়েন্স এবং কনট্যাক্ট ট্রেসিং করে যেতে হবে। সেই সাথে টিকা সংগ্রহের কাজটি পুরোদমে চালিয়ে যেতে হবে। টিকা না আসা পর্যন্ত সবাইকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরার উপর জোর দিতে হবে। এই সাথে বাইরে কোনো জিনিসের উপর হাতের স্পর্শ না করা উচিত। ঘরের বাইরে থাকলে সম্ভব হলে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণু মুক্ত করে নেয়া উচিত। ড. মেহেদী আকরাম বলেন, মনে রাখতে হবে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট খুব সংক্রামক। মানুষকে খুব দ্রুত অসুস্থ করে ফেলে। সে কারণে সতর্কতাই সুস্থ রাখতে পারে।
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরায় করোনার সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় আরো এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউননের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা করোনা কমিটির এক ভার্চুয়াল সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লকডাউনে মুদি দোকান ও কাঁচাবাজার সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথম দফার লকডাউন আজ শুক্রবার রাতে শেষ হবে। এর পর থেকে দ্বিতীয় দফার লকডাউন শুক্রবার রাত ১২টার পর শুরু হয়ে চলবে আগামী ১৭ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত। এ দিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে মাত্র চার ঘণ্টার ব্যবধানে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ (সামেক) হাসপাতালে দুই নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার বেলা ২টা ৪০মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। মৃত ব্যক্তিরা হলেনÑ সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা কাটাখালী গ্রামের মৃত বজলুর রহমান সানার ছেলে মো: কামরুজ্জামান সানা (৬৪), সাতক্ষীরার শহরের আমতলা এলাকার মো: আব্দুল খালেকের স্ত্রী মোছা: রিজিয়া খাতুন (৩৫), সদর উপজেলার পরানদহা গ্রামের মৃত গোলাম মোড়লের স্ত্রী মোছা: রূপবান বিবি (৫৫) ও একই উপজেলার গায়েশপুর গ্রামের বিলাত আলীর ছেলে রুহুল কুদ্দুস (৫৫)।
বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে। ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা না হলেও ভৌগোলিক দিক থেকে এ জেলার সাথে সীমান্ত জেলাগুলোর সড়ক ও রেলযোগাযোগ থাকার কারণে বগুড়া জেলা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৭টি নমুনার ফলাফলে নতুন করে ১৫ জন করোনা শনাক্ত হয়েছেন। শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। নতুন আক্রান্ত ১৫ জনের সবাই সদরের বাসিন্দা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বগুড়া সিভিল সার্জন অফিসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনায় আক্রান্ত ১২ হাজার ৪৬৪ জন, মোট মৃত্যু ৩২৩ জন এবং বর্তমানে করোনায় চিকিৎসাধীন আছেন ২২৫ জন।
নাটোর সংবাদদাতা জানান, নাটোরে ২৪ ঘণ্টায় পৌর এলাকাসহ সদরে আক্রান্তের হার ছিল ৭৫ শতাংশ। ১৮৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে যে ৬২ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে তার মধ্যে ৪৭ জনই নাটোর সদর ও পৌর এলাকার। একই এলাকায় একই সময়ে আরো দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এরা হলোÑ শহরের নিচা বাজার এলাকার রিন্টু ও সদর উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের কার্য সহকারী নবী আহমেদ। এ নিয়ে নাটোরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩২ জনে। নাটোর সদর ও সিংড়া পৌরসভায় চলমান লকডাউনে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনেও করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনজনের মৃত্যুর কারণে কঠোরভাবেই মাঠে রয়েছেন প্রশাসনের শীর্ষপর্যায় থেকে সব ধরনের কর্মকর্তা। বন্ধ রয়েছে সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন।
নোয়াখালী অফিস জানায়, নোয়াখালীতে করোনার প্রকোপ উন্নতি না হওয়ায় ছয়টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় চলমান লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৮ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত এই লকডাউন বাড়ানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ ঘণ্টায় নোয়াখালীতে ৪১৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৭ জনের করোনা শনাক্তের ফল পাওয়া গেছে। আক্রান্তের হার ২১ দশমিক ১ শতাংশ। জেলায় মোট করোনা রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৩৭৭ জন। এ ছাড়া জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫ জনে।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এবং করোনা উপসর্গ নিয়ে আরো ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় অঅটজনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে মৃতের সংখ্যা ৯২ জনে দাঁড়াল। এরমধ্যে ৭২ জনই করোনার ‘হটস্পট’ হয়ে ওঠা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার। ৭২ জনের মধ্যে ৪২ জনই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা এবং বাকি ৩০ জন রাজশাহীর।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো তিনজন মারা গেছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৩৫ জনে। এ দিনে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ১১৯ জনের। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত এখন ৫৪ হাজার ৪৫৪ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নিয়মিত প্রতিবেদন এ তথ্য জানিয়েছে। এ দিকে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রমের সাতটি ল্যাব ও কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ ল্যাবে ৮১৫ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে নগরের ৬২ ও উপজেলার ৫৭ জন রয়েছেন।
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা জানান, লালমনিরহাটের পাটগ্রামে জোলেখা বেগম (৫৫) নামে এক নারী করোনা আক্রান্ত হয়ে গত বুধবার মারা গেছেন। তিনি শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর মৌজার মোস্তরহাট কাতিপাড়া এলাকার খছর উদ্দিনের মেয়ে। লালমনিরহাট জেলা সিভিল সার্জন ডা: নির্মলেন্দু রায় জানান, গত বছর থেকে এই পর্যন্ত জেলায় ১১৫২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ১০৫৯ জন। মারা গেছেন ১৭ জন।
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৩৭ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৪৬ শতাংশের বেশি। নতুন ৩৭ জনসহ জেলায় মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ১৫৪ জনে। বর্তমানে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে থাকা রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪১ জনে। গত বুধবার রাত ৯টায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করে। চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে।



আরো সংবাদ