৩০ জুলাই ২০২১
`
বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্মার্ট সোলার

হাইওয়ে পাওয়ার প্ল্যান্ট উদ্ভাবন সাহানের

-

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট উদ্ভাবন করেছে কলেজছাত্র মোসলেউদ্দীন সাহান। সে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেকমো ডা: মোখলেছুর রহমানের ছেলে ও গৈলা ইউনিয়নের কালুপাড়া এলাকার বাসিন্দা। সাহান ২০১৬ সালে সরকারি গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্টের কাজ শুরু করে। তার প্রজেক্টের মূল কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে। সে ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সরকারি গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ এবং ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে। স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট উদ্ভাবন বিষয়ে সাহান বলেন, আমাদের দেশে মূলত কয়লা, পিচ ও বিটুমিন দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। যখন কয়লা পিচ দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয় তখন অবশ্যই কয়লা ও পিচ পোড়াতে হয়। কয়লা এবং পিচ যখন পোড়ানো হয় তখন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন গ্যাস যেমন-কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড উৎপন্ন হয় যা মোটেও পরিবেশবান্ধব নয়। যে জ্বালানি দিয়ে কয়লা ও পিচ পোড়ানো হয় তাতে যদি সালফারের যৌগ থাকে তাহলে তা পরিবেশের জন্য এসিড বৃষ্টি সৃষ্টিকারী গ্যাস যেমন-সালফার ডাই অক্সাইড, সালফার ট্রাই অক্সাইড উৎপন্ন করে যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এ স্মার্ট সোলার হাইওয়ে তৈরি করতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ রকম কোনো ধরনের পদার্থ ব্যবহার করা হয় না।
রাস্তা তৈরি করতে ন্যানোটেকনোলজিতে তৈরি সোলার সেল ব্যবহার করা হয় যা মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন। তা ছাড়া স্মার্ট সোলার হাইওয়ে হচ্ছে একটি ‘পরিবেশবান্ধব এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস’। এই রাস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এটা যেকোনো মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। তা ছাড়া এই রাস্তা তিনটি উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। সূর্যের আলোর মাধ্যমে, মানুষের চলাচলের সময় যে ঘর্ষণ উৎপন্ন হয় সে ঘর্ষণের মাধ্যমে এবং মানুষের ও গাড়ির প্রেসারকে কাজে লাগিয়ে। শক্তির নিত্যতা সূত্র অনুসারে শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই কিন্তু শক্তিকে একরূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তন করা সম্ভব। সে অনুসারে প্রেসারকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই রাস্তা প্রাথমিক অবস্থায় ৩০ টন পর্যন্ত চাপ নিতে সক্ষম। আর সোলার হাইওয়ে দিয়ে যখন বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তখন মানুষের তড়িৎস্পৃষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ এখানে সেমি পারমিত্রবেল ম্যাট্রিক্স টেকনোলজি, পলিক্লিস্টালিন টেকনোলজি এবং পলিকার্বনেট টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে যে কারণে ঘর্ষণের সময় ইলেকট্রনের যে ক্ষয় হয় তা দ্বারা মানুষের তড়িৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই। এই রাস্তার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে এতে ২ কিলোমিটার রাস্তা দ্বারা ৬,৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব এবং মানুষের চলাচলের মাধ্যমে ও গাড়ির প্রেসারকে কাজে লাগিয়ে পিজো ইলেকট্রিক এফেক্টের মাধ্যমে আলাদাভাবে বছরে আরো ১৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। প্রেসারকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্নের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে রাস্তার ওপর দিয়ে কী পরিমাণ গাড়ি চলাচল করছে এবং কী পরিমাণ প্রেসার পড়ছে তার ওপর। সাহান আরো বলেন, আমরা যদি এ-স্মার্ট সোলার হাইওয়ে তৈরি করি তাহলে একই রাস্তা একই সময়ে আমরা তিন উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করতে পারব এবং রাস্তা হিসেবেও আমরা ব্যবহার করতে পারব।
একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে সরকার প্রতি এক কিলোমিটার রাস্তার জন্য ছয় কোটি টাকা খরচ করে কিন্তু স্মার্ট সোলার হাইওয়ে তৈরি করতে চার কোটি টাকাই যথেষ্ট প্রতি কিলোমিটারের জন্য। তা ছাড়া দেখা যায় যে পিচের রাস্তার যে স্থায়িত্ব তা হওয়ার কথা হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ বছর কিন্তু তার স্থায়িত্ব দেখা যায় খুব কম। কারণ বিটুমিনের সব থেকে বড় শত্রু হচ্ছে পানি। বিটুমিন যখনই পানির সংস্পর্শে আসে তখনই দেখা যায় পিচ বা কয়লার তৈরি রাস্তা ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু এ স্মার্ট সোলার হাইওয়ের এইরকম কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। কারণ এই রাস্তা তৈরি করতে কোনো ধরনের পিচ বা কয়লার ব্যবহার করা হচ্ছে না। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে স্মার্ট সোলার হাইওয়ে তৈরি করা হয়। এই রাস্তা সাশ্রয়ী এই কারণে যে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে ২০১৭ থেকে ২০১৮ অর্থবছরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতের জন্য বাজেট করা হয় ২১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেট করা হয় ২৬ হাজার ৫০২ কোটি টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট করা হয় ২৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা। এখানে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছরই কিন্তু বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ও খনিজ খাতের জন্য বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েই চলছে। আমি মনে করি এই স্মার্ট সোলার হাইওয়ে তৈরি করলে প্রতি বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য সড়ক ও জনপথ খাতে আলাদাভাবে বাজেট করতে হবে না। স্মার্ট সোলার হাইওয়ে হচ্ছে একটি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস এবং পৃথিবীতে যত দিন সূর্যের আলো থাকবে এবং এই রাস্তা থাকবে তত দিন এই রাস্তার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এই রাস্তার স্থায়িত্বকাল হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ বছর।
সাহান ২০১৫ সালে উপজেলা পর্যায়ে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে। ২০১৭ সালে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে এবং জাতীয় পর্যায়ে বছরের সেরা মেধাবী নির্বাচিত হয় ও পদক পায়। ২০১৯ সালে উপজেলা, বরিশাল মহানগর ও বিভাগ পর্যায়ে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে এবং জাতীয় পর্যায়ে বছরের সেরা মেধাবী নির্বাচিত হয়। ২০১৭ সালে ৩৮তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে। ২০১৭ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করে। ২০১৮ সালে জাপান সরকারের আমন্ত্রণে ৮ দিনের সাকুরা সায়েন্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে সাহান।
ভবিষ্যতে এই স্মার্ট সোলার হাইওয়ে আরো উন্নত করার ইচ্ছা আছে তার, যাতে করে দেশ ও দেশের মানুষ উপকৃত হয়। ভবিষ্যতে এই স্মার্ট সোলার হাইওয়েতে ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ডাস্ট সেন্সরসহ আরো কিছু প্রযুক্তি সে যুক্ত করতে চায়; যাতে করে মানুষ আরো বেশি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারে। তাছাড়া এই স্মার্ট সোলার হাইওয়ের আশপাশের প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে কলকারখানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি স্থানের যতগুলো ইলেকট্রিক লাইন আছে সবগুলো স্মার্ট ফোনের সাহায্যে কন্ট্রোল করা যায়। এই রাস্তাটি তৈরি করতে মো: মোসলেউদ্দীন সাহানের ৭০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়েছে। সরকারের সহযোগিতা পেলে এই রাস্তাটি নিয়ে আরো কাজ করার ইচ্ছা আছে তার।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: আবুল হাশেম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট উদ্ভাবক কলেজছাত্র মোসলেউদ্দীন সাহানের এই প্রজেক্ট বাংলাদেশকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। তার এই প্রজেক্টকে আরো আধুনিকভাবে তৈরি করার লক্ষ্যে সে চাইলে যেকোনো সহযোগিতা করা হবে।



আরো সংবাদ