২২ জুন ২০২১
`

কোয়াডে যোগ দিলে চীনের সাথে সম্পর্কের ক্ষতি হবে

ডিকাবের সাথে মতবিনিময়ে ঢাকার প্রতি সতর্কবার্তা রাষ্ট্রদূত লি’র
-

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসেফিক কৌশলের (আইপিএস) আওতায় ‘কোয়াড’ হিসেবে পরিচিত কোর গ্রুপকে (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) চীনবিরোধী অল্প কয়েকটি দেশের অভিজাত ক্লাব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। তিনি বলেছেন, চার দেশের এই ছোট ক্লাবে যোগ দেয়া বাংলাদেশের জন্য সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। এতে চীনের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গুরুতর ক্ষতি হবে। তাই এই গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের কোনো ধরনের অংশগ্রহণ আমরা দেখতে চাই না।
রাষ্ট্রদূত বলেন, কোয়াড বাণিজ্য ইস্যু প্রাধান্য দেয় বলা হলেও এর মূলে রয়েছে নিরাপত্তা সহযোগিতা। কোয়াড যে চীনকে মাথায় নিয়ে গঠন করা হয়েছে, তা জাপানের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ কূটনৈতিক সংবাদদাতা সমিতির (ডিকাব) সাথে ভার্চুয়াল মতবিনিময়ে চীনের রাষ্ট্রদূত এ সব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ডিকাবের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মঈনুদ্দীন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সভাপতি পান্থ রহমান।
গত ২৮ এপ্রিল চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গহি ঢাকা সফরের সময় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে থেকে আসা শক্তিগুলোর সামরিক জোট গঠন এবং আধিপত্য বিস্তার রোধ করতে বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহের কথা জানান। আইপিএসের মাধ্যমে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবেলা করতে সক্রিয় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশকেও উদ্যোগটিতে শামিল হতে অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বাংলাদেশ আইপিএসের কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উপাদানে আগ্রহ দেখিয়েছে, সামরিক উপাদানে নয়।
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌচলাচল ‘অবাধ ও স্বাধীন’ রাখার উপায় খোঁজার যুক্তি দেখিয়ে ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে ‘কোয়াড’ নামে একটা সংলাপ শুরু হয়। কোয়াডের চারটি সদস্য দেশের মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে । তবে ২০২০ সালের জাপানের টোকিওতে দু’দিনের বৈঠক হলে- এই জোট নতুন করে আলোচনায় আসে এবং চীন তার অবস্থান স্পষ্ট করে। সেই সময় টোকিওতে কোয়াডের বৈঠক চলার সময় একই সাথে তিন থেকে চারটি নৌ এবং বিমান মহড়ার ঘোষণা দিয়েছিল বেইজিং।
তবে চীনকে আটকাতেই যে এই জোটবদ্ধ উদ্যোগ, পরিষ্কার করে তা আগে কখনোই বলা হয়নি। এমনকি এসব বৈঠক নিয়ে এই চারটি দেশের সরকারগুলোর পক্ষ থেকে জনসমক্ষে যেসব ঘোষণা দেয়া হয়েছে বা যেসব নথিপত্র চালাচালি হয়েছে, তার কোথাও চীন শব্দটিই নেই। তবে এই জোট যে চীন-বিরোধী জোট হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে সেটা চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে আরো স্পষ্ট হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক বলেন, ইউরোপের সামরিক জোট ন্যাটো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আগ্রহ কমলেও, মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব-প্রতিপত্তির জবাব দিতে এশিয়ায় নেটো ধাঁচের একটি জোট গঠনে আমেরিকা আগ্রহী হয়ে পড়েছে।
ডিকাবের সাথে মতবিনিময়কালে ভাটির দেশ হিসাবে জ্রেজিং ও বাঁধ নির্মাণের জন্য তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হাতে নেয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে মন্তব্য করে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের কাছ থেকে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব চীন এখনো পায়নি। এ ধরনের কোনো প্রস্তাব এলে অবশ্যই সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে। আমি জানি, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য বিরোধ রয়েছে। তবে ভাটির দেশ হিসেবে এই ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। উজানের দেশে এ প্রকল্প নিতে হলে ভাটির দেশের সাথে আলোচনা করতে হতো। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় এ ধরনের প্রকল্প স্পর্শকাতর ইস্যু হতে পারে না।
সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে চীনের করোনা-প্রতিরোধী টিকা বাংলাদেশে পাঠানো বিলম্বিত হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত জিমিং। তিনি বলেন, জরুরি ব্যবহারের জন্য সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদন পাওয়া সিনোফার্মের টিকা গত ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল চীন। কিন্তু এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায় তিন মাস সময় নিয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল টিকাটি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। এরপর বাংলাদেশের তাগিদের পরিপ্রেক্ষিতে উপহারের এই টিকা যত দ্রুত সম্ভব আনার উদ্যোগ নেয় চীনা দূতাবাস। কিন্তু এর মধ্যে চীনে মে দিবসের লম্বা ছুটি পড়ে গিয়েছিল। অবশেষে চীনের কর্মীরা অতিরিক্ত সময় খেটে দুই সপ্তাহের কম সময়ে টিকাগুলো সরবরাহ দিচ্ছে। আগামী বুধবার উপহার হিসেবে দেয়া চীনের পাঁচ লাখ টিকা বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে। ভবিষ্যতে উপহার হিসাবে চীন থেকে বাংলাদেশ আরো টিকা পাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, সিনোফার্মের টিকা বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে রফতানির জন্য দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা চলছে। এ ব্যাপারে চীন ইতিবাচক। কিন্তু সিনোফার্ম টিকার ব্যাপক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাহিদার কারণে বাংলাদেশ এখন আর সম্মুখসারিতে নেই। টিকাটি বাণিজ্যিকভাবে আমদানির জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হবে। জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন না থাকায় সিনোফার্ম ছাড়া চীনের অন্য কোনো টিকা বাংলাদেশে সরবরাহের বিষয়টি এখন আলোচনায় নেই।
তবে চীনের টিকা বাংলাদেশে যৌথ উৎপাদনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন লি জিমিং। তিনি বলেন, চীনের সিনোভ্যাকসহ দু’টি কোম্পানি বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশীদারদের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করছে। তবে এর মধ্যে সিনোফার্ম নেই। আলোচনা সম্পর্কে এ পর্যন্ত যতটুকু জানতে পেরেছি, বাংলাদেশে এ ধরনের টিকা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত কারখানা ও ল্যাবের ঘাটতি রয়েছে। তাই করোনা টিকা উৎপাদনের জন্য কারখানাসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। তবে বাংলাদেশের কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। যৌথ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে আরো আলোচনা হতে হবে। চীন সরকার এ ধরনের উদ্যোগে সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সহায়তা নিয়ে চীন-দক্ষিণ এশিয়া জরুরি সরবরাহ মজুদ সংক্রান্ত ছয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এতে বিশেষ করে বাংলাদেশের সাথে যৌথ উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে চীন গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে চীন-দক্ষিণ এশিয়া জরুরি সরবরাহ মজুদ উদ্যোগে ভারতকে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ভারত এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো সাড়া দেয়নি। ভারতে ছড়িয়ে পড়া করোনার ভয়াবহ সংক্রমণরোধে চীন সহায়তা দেয়া অব্যাহত রেখেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ত্রিদেশীয় উদ্যোগে মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে উল্লেখ করে লি জিমিং বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ সময় মিয়ানমারে নতুন ঘটনাপ্রবাহের কারণে বৈঠকটি স্থগিত হয়ে গেছে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে, এমন কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অদূর ভবিষ্যতে ত্রিদেশীয় বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা নেই। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
চীনের বেল্ট এন্ড রোড (বিআরআই) উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে কোনো মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, চীনের সাথে যে কোনো যৌথ প্রকল্পের প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই আসে। বাংলাদেশ কোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব দিলে চীন বিবেচনায় নেয়। প্রকল্পটি বিআরআই ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় হবে কিনা- তা দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়। বিআরআইয়ের আওতায় প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীন সীমান্ত বিবেচনা করে না। তবে এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকতে হয়।

 



আরো সংবাদ