১৯ জুন ২০২১
`

বেপরোয়া ঘরমুখো মানুষ

স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল শিমুলিয়া ফেরিঘাট
-

ঈদে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে যেতে বেপরোয়া হয়ে গেছে ঘরমুখো মানুষ। যেকোনো উপায়ে হোক গ্রামে যেতেই হবেÑ এমন মনোভাব নিয়ে ঢাকা থেকে দেশের প্রতিটি জেলার উদ্দেশ্যে ছুটছেন তারা। চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানা বিড়ম্বনার আগাম প্রস্তুতি নিয়েই রওনা হচ্ছেন এসব মানুষ। দেশে করোনার বিপজ্জনক ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেলেও সব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বাড়ি যেতে উদগ্রীব মানুষ। নির্দেশনা, কঠোর লকডাউন দিয়েও ঘরে রাখা যাচ্ছে না মানুষকে।
এ দিকে দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের প্রধান প্রবেশদ্বার পদ্মা নদীর শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে ফেরি চলাচল গতকাল স্বাভাবিক করে দেয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। লকডাউনে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে রেন্ট এ কারের গাড়িতে। কিন্তু এ খাতের ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দাবি করায় অনেকের পক্ষেই তার সুযোগ নেয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না; যার কারণে যে যার মতো করে প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, নছিমন, মাহেন্দ্র, হিউম্যান হলার, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। গতকাল রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার, কাঁচপুর, সায়েদাবাদ, কেরানীগঞ্জ এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কয়েক দিন ধরে পদ্মা নদীর মাওয়া, শিমুলিয়া ও আরিচার পাটুরিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের খবর তেমন পাওয়া যায়নি। তবে গতকাল থেকে এই রুটেও মানুষের চাপ বেড়েছে। শবেকদরের ছুটি থাকায় সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। লকডাউনের কারণে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঘরমুখো মানুষরা ঢাকা থেকে কাঁচপুর পৌঁছান। এরপর চরম ভোগান্তি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে জেলাভিত্তিক বাস ও অন্যান্য বাহনে করে রওনা হন। এই দুই মহাসড়ক ধরে বাড়ি ফেরা ১৭ জেলার মানুষ বিকল্প যান হিসেবে মোটরসাইকেল, অ্যাম্বুলেন্স, পিকআপভ্যান, মাইক্রো বাস, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন ছোট ছোট যানবাহন ব্যবহার করছেন। তবে এসব গাড়িতে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। আবার অনেকে নিজস্ব গাড়ি ও রেন্ট এ কারের ভাড়া করা গাড়িতেও বাড়ি যাচ্ছেন। সকাল থেকেই এ দু’টি মহাসড়কে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের ভিড় দেখা গেছে। বেলা বাড়ার পাশাপাশি এ ভিড় কেবলই বেড়েছে।
কুমিল্লাগামী পারভেজ আহমদ বলেন, ঢাকা থেকে বাসে করে তিনি সাইনবোর্ড নামেন। এরপর কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে গাড়িতে করে কুমিল্লা যাবেন। তবে সাথে স্ত্রী-সন্তান থাকায় যেকোনো গাড়িতে যেতে চাইছেন না তিনি। বাসস্ট্যান্ডে এসে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাসে উঠতে পারেননি। শেয়ারে যাওয়া মাইক্রো বাসেও ভাড়া অনেক বেশি চাইছে। যার কারণে তাতেও যেতে পারছেন না। পারভেজ বলেন, বছরের একটা দিন সময় পাই মা-বাবার সাথে কাটানোর। তাই চেষ্টা করছি বাড়ি যাওয়ার। এ ছাড়া গ্রামের বাড়িতে বেশ কিছু কাজ জমে আছে। তাই যে করেই হোক বাড়ি যেতে হবে। ঢাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে শিমরাইল মোড়ে এসেছেন আনোয়ার-মায়েশা দম্পতি, যাবেন ফেনী। দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ভেঙে ভেঙে ফেনী যাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। আনোয়ার বলেন, গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় তিন থেকে চারগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বাড়ি যেতে হচ্ছে। সাইনবোর্ড থেকে কুমিল্লা যেতে মাইক্রো বাসে ৫০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। চাঁদপুর ৬০০, নোয়াখালী ৭০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় মাইক্রো বাসের চালকরা যাত্রীদের কাছে থেকে যে যেভাবে পারছে ভাড়া আদায় করছে। আর বাড়ি যেতেই হবে, তাই যাত্রীরাও চালকদের কথামতো ভাড়া গুণে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন।
এ দিকে শিমুলিয়া রুটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। বাগেরহাটগামী ব্যবসায়ী ওহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদে বাড়ি যাবেন বলে বাড়তি ভাড়া দিয়ে রেন্ট এ কারের মাইক্রো বাস ভাড়া করেছেন। ২৫ রমজান রাতে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করায় তারা যেতে পারেননি। গতকাল সোমবার বিকেল ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। তাই রাতেই তারা রওনা হবেন। তিনি বলেন, তারা তিন পরিবার মিলে একটি ১৬ আসনের মাইক্রো বাস ভাড়া করেছেন ১৮ হাজার টাকায়। অথচ অন্য সময়ে গেলে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকায় একই গাড়ি পাওয়া যেতে। গোলাম হায়দার বলেন, প্রতি বছরই তিনি প্রাইভেট কার ভাড়া করে গোপালগঞ্জে যান। চালককে বকশিস দিয়ে খরচ হতো আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা। কিন্তু এবার বাস চলাচল না করায় ১১ হাজার টাকা দিয়ে প্রাইভেট কার ভাড়া করতে হয়েছে। তাও অনেক জায়গায় গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি জায়গা ঘুরে পরিচিতদের ফোন করে তোষামোদ করে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। কারণ রেন্ট এ কারের অনেক গাড়ি ঢাকা থেকে দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া, সোনারগাঁও পর্যন্ত লোকাল যাত্রী বহন করছেন। ঠাসাঠাসি করে যাত্রী কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছেন। তাই এসব গাড়ির ওপর চাপ বেড়েছে।
অবশেষে মাওয়ায় ফেরি চলাচল স্বাভাবিকে স্বস্তি
মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মাওয়ার শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ফেরি চলাচল এখন স্বাভাবিক। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের আর বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না। গতকাল বিকেল ৬টার সময় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিসি) মাওয়া শিমুলিয়া ঘাট ম্যানেজার (বাণিজ্য) সাফায়াত হোসেন। তিনি বলেন, স্বাভাবিক বলতে সন্ধ্যার পর তো সব ফেরি চলাচল করে। ঘরমুখো মানুষের চলাচলে আগের মতো এখন আর কড়াকড়ি নাই। তবে সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক না হলেও পর্যায়ক্রমে আমরা ফেরি চালু রেখেছি। তিনি বলেন, এখন থেকে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক। ঘাটে আটকে পড়া কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করে দিয়েছে। এখন সব ধরনের ফেরি চলাচল করবে। এ সিদ্ধান্তে ঘরমুখো মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। গাদাগাদি না করে স্বাভাবিকভাবে গ্রামে পরিবারের কাছে পারবে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার নারী পুরুষ যাত্রীরা।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ঘাটে ফেরি চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন ঈদ সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষ। শুধুমাত্র লাশ ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি কাজে ব্যবহৃত পরিবহনের ফেরি পারাপারে অনুমতি দেয়া হয়। তারপরও ঘাটে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অনেককে ফেরিতে উঠতে দেখা গেছে।
এ দিকে ঘাটে অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপে ফেরিগুলোতে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি গাড়ি পারাপারে বিলম্ব হয়। ঘাটে আটকে থাকা বিভিন্ন ধরনের পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল।
এর আগে গত রোববার অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ফেরি চলাচল। রোববার সন্ধ্যায় এ খবর নিশ্চিত করেন শিমুলিয়া ঘাটের উপমহাব্যবস্থাপক (এজিএম) শফিকুল ইসলাম। কিছুক্ষণ পরেই জানা যায় ফেরি চলাচল করছে। বিআইডব্লিউটিসির কোন কর্মকর্তাই রাতে কোন ফোন রিসিভ করেননি। তবে রাতভর ১৩টি ফেরি দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি ও যাত্রী পারাপার করেছে। ভোর সাড়ে ৬টায় এনায়েতপুরী মাওয়া শিমুলিয়া ঘাট থেকে ফেরি ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। বিজিবি, পুলিশ ও নৌপুলিশের টহল চোখে পড়ার মতো। তাদের সব চেষ্টাই যেন ব্যর্থ করে দিয়েছে নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়া মানুষের জোয়ার।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে ঘরমুখো মানুষদের দৌড়ে ফেরিতে উঠতে দেখা গেছে। জানা গেছে, দিনভর বন্ধের নাটক করে ঈদে ঘরমুখো মানুষের আটকে রেখে রাতে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে নারী পুরুষ যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পার করে গভীর রাতে মাওয়া ছেড়ে গেছে সব যাত্রী। অপর দিকে সাত দিন ধরে মালবাহী ট্রাক ঘাটে আটকে রয়েছে। তারা কখন যেতে পারবে তা অনিশ্চিত। অভিযোগ উঠেছে, বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়। বাস্তবে ফেরি সারা দিনই চলেছে। বিষয়টি নিয়ে নানা নাটকীয়তা চলে। কিন্তু উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন সাংবাদিকদের।
এদিকে শিমুলিয়া ঘাট এরিয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা যায়, ফেরির ইজারাদারদের টিকিট মাস্টার যারা তারা বিভিন্নভাবে ২৫ টাকা হারে টিকিট কেটে ফেরিতে উঠাতে দেখা যায়। রাতের চিত্রও আরো ভয়াবহ ছিল। রাতেও গাদাগাদি করে যাত্রী পারাপার হয়েছে।
অন্য দিকে, লঞ্চ, স্পিডবোট আগে থেকেই বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন দক্ষিণবঙ্গমুখী যাত্রীরা। তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিএনজি, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারযোগে ঘাটে পৌঁছান। ঘাটের প্রবেশমুখ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিজিবি মোতায়েন থাকলেও বিভিন্ন পথে হেঁটে ঘাটের দিকে যাত্রীদের যেতে দেখা গেছে। কখনও ঘাটের আশপাশ এলাকা থেকে মাছ ধরার ট্রলারে চেপে পদ্মা পাড়ি দেয়ার চেষ্টাও করেন যাত্রীরা। শিমুলিয়া ফেরিঘাট থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কনকসা, হলদিয়া ও কুমারভোগ থেকে ৩০০-৪০০ টাকা দিয়ে ট্রলার দিয়ে যাত্রীরা পারাপার হচ্ছেন। নৌপুলিশ, পুলিশ ও বিজিবির টহল চোখে পড়ার মতো, কিন্তু যাত্রীদের কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না বাড়িতে যাওয়া।
গতকাল মাওয়া ঘাটের পদ্মা নদীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৩টি ট্রলার ও ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। ট্রলারগুলো ঈদের পরে ছেড়ে দেয়া হবে। ১৩টি ট্রলারে ৪ শ’ থেকে সাড়ে ৪ শ’ যাত্রী ছিল। যাত্রীদের পুশব্যাক করে মাওয়া ঘাটে নামিয়ে দেয়া হয়েছে।
বাবার লাশ দেখতে পারবে কি না জানেন না তারা : বাবার লাশ দেখতে মাওয়া ঘাটে ট্রাকে করে আসেন ১০ যাত্রী। সবার চোখে পানি। জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে ফেলেন এক নারী। বলেন, বাবার লাশ দেখা, জানাজা ও দাফন করার জন্য যেতে হবে। পুলিশ ও বিজিবি আটকিয়ে দিয়েছে আমাদের গাড়ি। চাঁদপুর থেকে মাওয়া ঘাটে এসেছেন তারা। বাবার লাশ দেখতে পারবেন কি না তা অনিশ্চিত হয়ে গেছে তাদের। কিভাবে মাওয়া শিমুলিয়া ঘাট পার হবেন তা তাদের জানা নেই। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার সময় এমন দৃশ্য দেখা যায় ইলিশা হোটেলের সামনে। সেখানে বিজিবি ও পুলিশের পাহারায় আটকে গেছে তাদের মিনি ট্রাক।
এমন বিভিন্ন কারণে-অকারণে বাড়িতে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের হাজারো চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে কারো আত্মীয়স্বজন মারা গেলে তার লাশ দাফনের জন্য বাড়িতে যাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মাওয়া ঘাট থেকে। যখন ফেরি ছাড়বে তখনই তারা পার হয়ে গন্তব্যে রওনা দিবেন। এমন দৃশ্য মাওয়া ঘাটে প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে।
পাটুরিয়া ঘাটে বাড়ছে মানুষ, অপেক্ষা একটি অ্যাম্বুলেন্সের
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, করোনার ভয়, বিজিবি-পুলিশের বাধা, যানবাহনের সঙ্কট, প্রখর রোদ-গরম, পথে ভেঙে ভেঙে যাত্রা ও হেঁটে চলা কোনো কিছুই ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের ¯্রােত থামাতে পারছে না। রাজধানী হতে ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-সিঙ্গাইর রোড দিয়ে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে মানুষ আসছে পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাটে। পাটুরিয়া ঘাটে শত শত মানুষ অধীর অপেক্ষায় থাকছে কখন একটা রোগী কিংবা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স আসবে আর ফেরিতে উঠবে। অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে ওঠামাত্র শত শত মানুষ হুমড়ি খেয়ে উঠে যাচ্ছে ফেরিতে। গতকাল বিকেল পৌনে ৫টা পর্যন্ত এমন চিত্র বহাল ছিল ঘাটগুলোতে। এদিকে দূর-দূরান্তের মানুষদের ও ছোট গাড়ি ঠেকাতে গত তিন দিন রাজধানী থেকে মানিকগঞ্জ জেলার প্রবেশমুখ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বারবাড়িয়া ও ঢাকা-সিঙ্গাইর সড়কের ধল্লা এলাকায় বিজিবি চেকপোস্ট বসিয়ে জেলার বাহিরের কোনো গাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না। পাটুরিয়া ঘাট এলাকা ও আশপাশের এলাকাতেও চলছে বিজিবির টহল ও চেকপোস্ট। সাথে পুলিশের কার্যক্রম।
কিন্তু কোনো কিছুই দমাতে পারছে না ঘরমুখো মানুষের যাত্রা। এর মধ্যেই মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে গাদাগাদি করে নদী পার হচ্ছেন ঘরমুখো মানুষ। সময় যাচ্ছে চাপ বাড়ছে মানুষের। সীমিতসংখ্যক ফেরি চলাচলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব যাত্রী। লাশ ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি পণ্যবাহী গাড়ি ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীরাও হুড়োহুড়ি করে লাফিয়ে উঠে পড়ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকা থেকে আসা হাজারো যাত্রী পাটুরিয়ায় এসে ভিড় করছেন। এসব যাত্রী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ঈদ উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন। সকাল থেকে সাতটি ফেরিতে যাত্রী ও জরুরি যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।
এ দিকে পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রীদের ফেরাতে মহাসড়কের শিবালয় উপজেলার টেপড়া এলাকায় উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। বিজিবির সদস্যরাও সেখানে একই দায়িত্ব পালন করছেন। পাটুরিয়া থেকে প্রায় আট কিলোমিটার আগে টেপড়ায় বিভিন্ন প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব যানবাহনকে উল্টো পথে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তবে ঘরমুখী মানুষ দুর্ভোগ সহ্য করে অটোরিকশা, রিকশা ও ভ্যানে করে রওনা হচ্ছেন, এমনকি হেঁটেও অনেকে ঘাটে আসছেন। বিকেল পৌনে ৫টার সময় দেখা যায়, পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় কয়েক শ’ যাত্রী নদী পারের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব যাত্রী দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠেছেন। শৌচাগার ও খাবার হোটেলের অভাবে নারী ও শিশুযাত্রীদের ভোগান্তি আরো বেড়ে গেছে।
ফেরিতে পারাপারের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো: জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শুধু লাশ, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পণ্যবাহী গাড়ি পারাপারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এসব গাড়ি লোড ও আনলোড করার সময় যাত্রীরা ফেরিতে ওঠে পড়েন। বাধা দেয়ার পরও তাদের আটকানো যাচ্ছে না।
চাপ নেই দৌলতদিয়া ঘাটে, যাত্রীর জন্য ফেরির অপেক্ষা
রাজবাড়ী সংবাদদাতা জানান, যাত্রী ও যানবাহনের কোনো চাপ নেই রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে। গত ২-৩ দিন দৌলতদিয়ায় ছিল ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু রোববার সকাল থেকে বিজিবি মোতায়েন করায় ঘাট এলাকাতে তেমন একটা যাত্রী ও যানবাহন দেখা যায়নি। গতকাল সোমবার সকালে গিয়ে দেখা যায় এক অন্যরকম দৌলতদিয়া ঘাট। সকাল থেকেই তিন-চারটি ফেরি গাড়ি ও যাত্রীর অপেক্ষায় ছিল ২-৩ ঘণ্টা করে।
সারা দেশে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সাধারণ মানুষ সেটিকে অমান্য করে ঈদে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছিল। ঘরমুখো মানুষকে ঠেকাতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের পাটুরিয়া প্রান্তের তিনটি পয়েন্টে কাজ করছে বিজিবি। যার কারণে মানুষের চাপ তেমন একটা নেই। গতকাল সকালে দৌলতদিয়া ঘাটে দেখা যায়, তেমন কোনো যাত্রী ও গাড়ি নেই। জরুরি সেবার জন্য শুধুমাত্র দুটি ফেরি চালু রেখেছে কর্তৃপক্ষ। অ্যাম্বুলেন্স ও কিছু জরুরি সেবার আওতার গাড়ি নদী পার করছে কর্তৃপক্ষ। ফেরিগুলো ঘাটেই নোঙর রাখা হয়েছে। যদিও দুয়েকজন যাত্রী ও মোটরসাইকেল আসছে তাদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। অন্য দিকে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে দেখা মেলেনি কোনো যানবাহন। স্থানীয় কিছু ছোট গাড়ি ছাড়া আর কোন গাড়ি নেই মহাসড়কে। একেবারেই ফাঁকা এই মহাসড়কটি।
বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফিরোজ শেখ বলেন, বিজিবি মোতায়েনের পর চাপ নেই যাত্রী ও যানবাহনের। জরুরি সেবা প্রদানের জন্য মাত্র দু’টি ফেরি চালু রাখা হয়েছে। তাও অ্যাম্বুলেন্স ও রোগী ছাড়া ফেরিতে উঠতে পারবে না।



আরো সংবাদ