১১ মে ২০২১
`

মোবাইল-মানিব্যাগ চুরির মামলায় মামুনুল হক ৭ দিনের রিমান্ডে

হেফাজত ইস্যুতে বিভিন্ন স্থানে আরো বহু আটক
-

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মোবাইল-মানিব্যাগ চুরি, জখম, হুমকি ও ধর্মীয় কাজে বাধা দেয়ার মামলায় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবদাস চন্দ্র অধিকারী শুনানি শেষে রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
গতকাল বেলা ১১টা ৮ মিনিটে মোহাম্মদপুর থানার একটি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) সাজেদুল হক মাওলানা মামুনুল হককে আদালতে হাজির করেন। এরপর তাকে আদালতের হাজত খানায় রাখা হয়।
একই সাথে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। এ সময় মামুনুল হকের পক্ষে আইনজীবী সৈয়দ জয়নাল আবেদীন মেজবাহ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষ এ আবেদনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
মোহাম্মদপুর থানার এ মামলায় মারধর, হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাতে গুরুতর জখম, চুরি, হুমকি ও ধর্মীয় কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে গোলযোগের অভিযোগ এনে স্থানীয় এক ব্যক্তি মামুনুল হকের বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ৬ মার্চ মোহাম্মদপুর সাত মসজিদ এলাকায় সাত গম্বুজ মসজিদে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আসামি মাওলানা মামুনুল হক ও তার ভাই মুহতামিম মাহফুজুল হকের নির্দেশে জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদাসার ছাত্র আসামি ওমর ও ওসমান, বাদি ও তার সাথে থাকা অন্যদের মসজিদের ভেতর আমল করতে নিষেধ করে। তাদের ধর্মীয় কাজে আঘাত করে তাদের আসামিরা মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বলে ।
বাদি তার প্রতিবাদ করলে মাওলানা মামুনুল ও তার ভাইয়ের নির্দেশে ওই মাদরাসার আরো ৭০-৮০ জন ছাত্র মাদরাসা থেকে বের হয়ে বাদিকে এলোপাতাড়ি মারধর করে গুরুতর জখম করে। ওমর ও ওসমান তাদের হাতের লাঠি দিয়ে বাদিকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এরপর আসামিরা বাদির কাছে থাকা একটি স্যামসাং মোবাইল, ৭ হাজার টাকা, ২০০ ডলার ও ব্র্যাক ব্যাংকের একটি ডেবিড কার্ডসহ বাদির মানিব্যাগ নিয়ে যায় এবং পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করতে দেখলে তাকে হত্যা করবে বলে হুমকি দেয় আসামিরা। এর আগে গত রোববার মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে মামুনুল হককে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রমজানে ইবাদতের সুযোগ চান মামুনুল হক : গতকাল রিমান্ড শুনানি চলাকালে বিচারক মামুনুল হককে বলেন, ‘আপনার কি কিছু বলার আছে?’ জবাবে মামুনুল হক বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমি প্রতি রমজান মাসে ছয়বার কুরআন শরিফ খতম দেই। রমজান মাস পবিত্র মাস। এই মাসে আমি যেন রোজা, নামাজ ও কুরআন পড়তে পারি তার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আবেদন করছি।’
হেফাজত ইস্যুতে বিভিন্ন স্থানে আরো বহু আটক : এ দিকে হেফাজতের ডাকা হরতাল এবং সোনারগাঁয়ে রিসোর্টে মামুনুল হককে স্ত্রীসহ ঘেরাওয়ের ঘটনার পর সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে জামায়াত, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুরে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় কালিয়াকৈর উপজেলা হেফাজতে ইসলামের আমিরসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সোনারগাঁওয়ে উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি গ্রেফতার
সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্টে হেফাজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক নারীসহ অবরুদ্ধের পর হেফাজতের সহিংসতা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় সোনারগাঁও উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও শম্ভুপুরা ইউয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার বেলা ১টায় শম্ভুপুরা ইউনিয়ন পরিষদে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সোনারগাঁও থানার ওসি মো: হাফিজুর রহমান গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ দিকে এর আগে গ্রেফতার করা হয় সোনারগাঁও পৌর কাউন্সিলর ও জাতীয় পার্টির নেতা ফারুক আহমেদ তপন ও সাবেক কাউন্সিলর জাতীয় পার্টির নেতা গরিবে নেওয়াজকে।
ছাত্রলীগ নেতার বাড়িতে ভাঙচুর করার ঘটনায় উপজেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক নাসির উদ্দীনের দায়ের করা মামলায় আব্দুর রউফকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে দু’টি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট ফাহমিদা খাতুনের আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠায়। আদালত আজ মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানি ধার্য করা হয়েছে বলে কোর্ট পরিদর্শক আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জে হেফাজত ইস্যুতে ২২ দিনে ১০৩ জন গ্রেফতার
নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, হেফাজতের ডাকা হরতাল এবং সোনারগাঁওয়ে রিসোর্টে মামুনুল হককে স্ত্রীসহ ঘেরাওয়ের ঘটনার পর হেফাজতের সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গত ২২ দিনে ১০৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রয়েছেন হেফাজতে ইসলাম, বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধি। গত ২২ দিনে নারায়ণগঞ্জর সদর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁও ও রূপগঞ্জ উপজেলায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গত ২৮ মার্চের হেফাজতের ডাকা হরতালে সিদ্ধিরগঞ্জে আটটি ও রূপগঞ্জে একটি মামলা করা হয়। ৩ এপ্রিল হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে এক নারীসহ ঘেরাও ও তারপরের সহিংসতার ঘটনায় সোনারগাঁও থানায় আরো সাতটি মামলা দায়ের হয়েছে। মোট ১৬ মামলায় ৫৮৯ জনের নাম উল্লেখ করে ৪৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ৩৫ জন ও সোনারগাঁওয়ে ৬৮ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে জানান, নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের ডাকা হরতাল ও মাওলানা মামুনুল হককে অবরুদ্ধ করে রাখায় হামলা, ভাঙচুর, আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনায় তাদের আটক করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেনÑ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো: ইকবাল হোসেন, সোনারগাঁও উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সভাপতি আব্দুর রউফ ও সোনারগাঁ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারুক তপন। ইকবাল হোসেন বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। এ ছাড়া আব্দুর রউফ ও ফারুক তপন পূর্বে বিএনপি করলেও এখন সোনারগাঁও জাতীয় পার্টির রাজনীতি করেন। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমেদ, রূপগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন দেলু, ভুলতা ইউনিয়নের মতুর্জাবাদ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা লোকমান হোসেন, হেফাজত নেতা শাজাহান শিবলী, হাফেজ মোয়াজ্জেম হোসেন, হাফেজ মাওলানা মহিউদ্দিন খান, হেফাজতে ইসলামের নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ সাইফকে গ্রেফতার করা হয়।
কালিয়াকৈরে হেফাজত নেতাসহ গ্রেফতার ৩
গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় কালিয়াকৈর উপজেলা হেফাজতে ইসলামের আমিরসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত রোববা রাত সাড়ে ১২টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমির হেসেন গ্রেফতারের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেফতারকৃতরা হলো কালিয়াকৈর উপজেলা হেফাজতে ইসলামের আমির কালিয়াকৈর ওলামা পরিষদের সভাপতি এবং চন্দ্রা দারুল উলুম মাহমুদ নগর মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মাওলানা এমদাদুল্লাহ ওরফে এমদাদুল হক (৫০), ওই মাদরাসার সহকারী শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম (৪০) এবং মোহাম্মদ আলী (৪৮)। গ্রেফতারকৃতরা সম্পর্কে তিন ভাই। আহত তিন পুলিশ সদস্যকে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
ওসি আমির হোসেন জানান, পুলিশ গোপন সংবাদে জানতে পারে মামুনুল হককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে কিছু দুষ্কৃতিকারী কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা-কালামপুরগামী রোডে ধ্বংসাত্বক কার্যক্রম ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে পারে। পরে গাজীপুর জেলা ডিবি পুলিশের একটি দল রোববার রাত সোয়া ১২টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার কালামপুর এলাকায় উপস্থিত হলে ৩৫ থেকে ৪০ জন দুষ্কৃতিকারী অতর্কিতভাবে পুলিশকে লক্ষ্য করে কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ কয়েক রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছোড়ে। পরে দুষ্কৃতকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় কালিয়াকৈর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোর্শেদ আলী মোল্লার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে কালিয়াকৈর থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা করা হয়েছে।



আরো সংবাদ