১১ মে ২০২১
`

বাঁশখালীতে পুলিশের গুলি ৫ বিদ্যুৎশ্রমিক নিহত

আহত ৩০, বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন এলাকা থমথমে
-

চট্টগ্রামের বাঁশখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনার ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্তৃপক্ষের সাথে বেশ ক’টি দাবি নিয়ে বিক্ষোভ থেকে এ সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ৩০ জনের মতো।
ঘটনাস্থলেই নিহত হন আহমদ রেজা (১৮), রনি হোসেন (২২), শুভ (২৪) ও মো: রাহাত (২৪)। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে মো: রায়হান (২৫) নামের আরো একজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা সবাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের পূর্ব বড়ঘোনা এলাকার লোক বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীলব্রত বড়ুয়া নয়া দিগন্তকে জানান, বাঁশখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ১৫ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আরো মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আহতদের মধ্যে হাবিব উল্লাহ (২১), মো: রাহাত (৩০), মিজান (২২), মো: মুরাদ (২৫), মো: শাকিল (২৩), মো: কামরুল (২৬), মাসুম আহমদ (২৪), আমিনুল হক (২৫), মো: দিদার (২৩), ওমর (২০) ও অভির (২২) নাম জানা গেছে। এ ছাড়া গণ্ডামারা পুলিশ ফাঁড়ির তিন সদস্য ইয়াসির (২৪), আব্দুল কবির (২৬) ও আসাদুজ্জামান (২৩) এ ঘটনায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ঘটনা তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেনকে। কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, রমজানে কর্মঘণ্টা কমানোসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে কয়েক দিন ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেশীয় ও চীনা কর্মকর্তাদের সাথে শ্রমিকদের বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গতকাল শ্রমিকরা বিক্ষোভ করার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ গিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। পুলিশের দাবিÑ এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিবৃত্ত করা না গেলে একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হয়। নিহত চারজনের লাশ বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: মো: শফিউর রহমান মজুমদার। এ ছাড়া অন্তত ১৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ৩০ জনের মতো আহত হয়। আহতদের মধ্যে ১৫ জনকে গুরুতর অবস্থায় চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ দিকে ঘটনার আকস্মিকতায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিদ্যুৎকেন্দ্রেসহ সেখানকার বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। বিপুলসংখ্যক এলাকাবাসী বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘেরাও করে রাখে। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকে জানান, উত্তেজিত শ্রমিকরা সাত-আটটি গাড়িতে আগুন দেয়ার পরে মারমুখী হয়ে উঠলে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়ে।
এদিকে এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন থেকে ৪ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনী আক্তারকে প্রধান করে এ কমিটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কবির হোসেন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও শ্রম বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইতঃপূর্বে ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে বাস্তবায়নাধীন ওই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছিলেন।
বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ : চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাঁচ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।
বিএনপি : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বেতনভাতার দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিককে হত্যা ও ৩০ জনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভরত বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং শ্রমিকদের প্রাণ কেড়ে নেয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। শ্রমিকদের বুকে গুলি চালিয়ে হঠকারিতামূলকভাবে শ্রমিক বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে পাঁচটি প্রাণ ঝরিয়েছে পুলিশ। এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। তিনি বলেন, যেকোনো ইস্যুতে আইনশৃঙ্খলাকেবাহিনীকে অপব্যবহারের ফলে বারবার এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করা যেন বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সরকারের এ হেন কর্মকা ফ্যাসিবাদী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। বিএনপি মহাসচিব এ ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান ।
জামায়াত : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রোটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বেতনভাতার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিক্ষোভে গুলি করে পাঁচজন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। আহত করা হয়েছে অনেককে। শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য কাজের মজুরি দাবি করবেন এটিই স্বাভাবিক। এ জন্য শ্রমিকদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা সম্পূর্ণ অন্যায়, অমানবিক ও অসাংবিধানিক। এটি সরকারের বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি আরো বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এভাবে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করার লাইসেন্স দেশের সংবিধান তাদেরকে দেয়নি। আমরা এ নির্মম হতাকাে র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। গুলিতে নিহত শ্রমিকদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করছি। আমরা নিহতদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। শ্রমিকদের প্রাপ্য ন্যায্য বেতনভাতা পরিশোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং শ্রমিক হত্যার ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
খেলাফত মজলিস : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিক নিহত ও বহু শ্রমিক আহতের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে খেলাফত মজলিস। সংগঠনের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, শ্রমিকরা যখন তাদের প্রাপ্য বেতনভাতাসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিক্ষোভ করছিল তখন পুলিশ এসে তাদের ওপর গুলি চালিয়ে শ্রমিকদের হতাহত করে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। এ ন্যক্কারজনক হত্যাকাে র বিচার করতে হবে।
লেবার পার্টি : এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব লায়ন ফারুক রহমান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ফরিদ উদ্দিন, ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান খালেদ, এস এম ইউসুফ আলী ও আলাউদ্দিন আলী। তারা বলেন, ন্যায়সঙ্গত দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং পাঁচ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। শ্রমিকদের বুকে গুলি চালিয়ে হঠকারিতামূলকভাবে শ্রমিক বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে পাঁচটি প্রাণ ঝরিয়েছে পুলিশ। এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে।
শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন : বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক এমপি আ ন ম শামসুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে শ্রমিকদের ওপর পুলিশের নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাঁচজন মেহনতি শ্রমিককে হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন, দেশের যেকোনো নায্য আন্দোলন দমিয়ে দেয়ার জন্য সরকার পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করছে। এই হত্যাকা রাষ্ট্রীয় হত্যার শামিল।
জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন : সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামরূল আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুল হক আমিন এক বিবৃতিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা পুলিশের গুলিবর্ষণে নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা, গ্রেফতার-হয়রানি বন্ধ এবং ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেন। নেতৃবৃন্দ শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন।



আরো সংবাদ


খালেদা জিয়ার ভুয়া করোনা রিপোর্ট ছড়ানোর অভিযোগ (১১১৩৫)যেভাবে সুয়েজ খাল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স (৫৯৪৪)‘কোয়াডে বাংলাদেশ যোগ দিলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক খারাপ হবে’ (৫৫২০)বাবার লাশ দেখতে মাওয়া ঘাটে মিনি ট্রাকে অপেক্ষায় ১০ যাত্রী (৫৩০৭)৫ বছর আগেই করোনাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল চীন! (৫২১৫)যমুনায় লাশের মিছিল, করোনায় মৃতদের ভাসিয়ে দেয়ার অভিযোগ উত্তরপ্রদেশে (৪৯০৩)ভারতে করোনা রোগীদের অন্ধ করে দিচ্ছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস (৪২৬৩)খালেদা জিয়ার আসল জন্মদিনের তথ্য প্রকাশ পেল : ওবায়দুল কাদের (৪২১০)ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে পদক্ষেপে বিশ্বের প্রতি দাবি জানালেন এরদোগান (৩৫৭৮)জেরুসালেমে অব্যাহত সহিংসতা, বৈঠকে বসছে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ (৩৪৯৭)