১৩ মে ২০২১
`

সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে কড়া লকডাউনে জোর বিশেষজ্ঞদের

২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮৩ জনের মৃত্যু
-

দেশে প্রায় প্রতিদিনই করোনা সংক্রমণ এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড গড়ছে। সরকার এ জন্য সপ্তাহব্যাপী লকডাউন দিলেও চলমান এই রেকর্ড ভাঙা কার্যক্রমে তা ছেদ টানতে পারেনি। বরং গত বছর করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও তার প্রয়োগের আগেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারে যে লাগাম ছিল, এবার সে লাগাম ছিঁড়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। গত বছর যেখানে সর্বোচ্চ মৃত্যু ৬৪ এবং সর্বোচ্চ আক্রান্ত ছিল চার হাজার ১৯ জন, এবার সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মৃত্যু ৭৮ জন এবং সর্বোচ্চ শনাক্ত ৭৬২৬ জনে পৌঁছে গেছে ইতোমধ্যেই।
দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ জন্য করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং লকডাউন দেয়ার পর সেটি যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়াকে দায়ী করছেন। করোনার সাম্প্রতিক এই ঢেউকে সুনামির সাথে তুলনা করে চিকিৎসকরা জানান, করোনারোগীদের জন্য হাসপাতালগুলোতে এখন আর সাধারণ বেড মিলছে না, আইসিইউ হয়ে ওঠেছে আরো দুর্লভ। আইসিইউ পেতে এখন রীতিমতো তদবির করতে হচ্ছে। করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির সাম্প্রতিক এই প্রবণতা যদি চালু থাকে তাহলে তাদের আর হাসপাতালে জায়গা দেয়া যাবে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী লকডাউন বাস্তবায়নে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়ায় করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সর্বশেষ লকডাউনে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুতে তেমন কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। বরং করোনা রোগের উপসর্গ নিয়ে আসা সবাই যদি পরীক্ষা করার সুযোগ পেত তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়ত।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এ অবস্থায় কার্যকর লকডাউনই সংক্রমণ বন্ধের অন্যতম সেরা উপায়। কারণ যখন জনসাধারণের চলাচল অনেক বেড়ে যায়, তখন সংক্রমণ দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়। তাই লকডাউন লাগবেই এবং তার কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়নও করতে হবে। একই সাথে তারা রোগী শনাক্ত, আইসোলেশন ও রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কোয়ারেন্টিন করার ওপরও জোর দেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা: মুশতাক হোসেন বলেন, এর আগে দেখা গিয়েছিল, যেসব এলাকায় লকডাউন দেয়া হয়েছিল, সেসব এলাকায় সংক্রমণ বাড়তে পারেনি। তিনি দাবি করেন, লকডাউনের ফলে যদি সবাই ঘরে থাকে তবে সংক্রমণ কমবেই। তবে গতকাল সোমবার এক সপ্তাহের লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারির আগে-পরে গ্রামের বাড়ি ফিরতে যেভাবে ঢাকা ছেড়ে যেতে শুরু করেছে, তাতে করোনার বিস্তার নিয়ে গুরুতর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষই। তাদের ফেরার তোড়জোড়ে গতকাল ঢাকা থেকে বের হওয়ার বেশির ভাগ সড়কেই ছিল ব্যাপক যানজট। দূরপাল্লার গাড়ি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যবিধি ও বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন উপায়ে ঢাকা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন সাধারণ মানুষ। তারা জানান, সপ্তাহব্যাপী লকডাউন দেয়ায় এবং সে লকডাউন আরো বাড়ার সম্ভাবনায় তারা বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। এতে অতিরিক্ত ভাড়া গোনার পাশাপাশি করোনা বিস্তারের শঙ্কা থাকলেও নিজেদের নিরুপায় দাবি করেন তারা।
এক দিনে সর্বোচ্চ ৮৩ জনের মৃত্যু : এ দিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় দেশে রেকর্ডসংখ্যক ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ মৃতের সংখ্যা। গত রোববার মারা গিয়েছিলেন ৭৮ জন, তার আগের দিন মারা যান ৭৭ জন। দেশে এখন পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ৯ হাজার ৮২২ জন। গতকাল নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে সাত হাজার ২০১ জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে মোট ছয় লাখ ৯১ হাজার ৯৫৭ জনের করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন চার হাজার ৫২৩ জন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত সুস্থ হলেন পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ১১৩ জন। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনাবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মারা যাওয়া ৮৩ জনের মধ্যে পুরুষ ৫৪ জন এবং নারী ২৯ জন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত সাত হাজার ৩৩৩ জন পুরুষ এবং দুই হাজার ৪৮৯ জন নারী মারা গেছেন। গতকাল মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব বয়সী আছেন ৫২ জন, ৫১-৬০ বছরের মধ্যে ১৬ জন, ৪১-৫০ বছরের মধ্যে ১১ জন এবং ৩১-৪০ বছরের মধ্যে চারজন আছেন।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গতকাল মারা যাওয়াদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের আছেন ৫৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ১৭ জন, রাজশাহী বিভাগের তিনি জন, খুলনা বিভাগের চারজন, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের দুইজন করে এবং রংপুর বিভাগের একজন আছেন। এই ৮৩ জনের মধ্যে হাসপাতালে মারা গেছেন ৭৪ জন, বাসায় মারা গেছেন পাঁচজন এবং হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে চারজনকে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, গত ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন ১৬ জন। এর মধ্যে গত এক দিনে মারা গেছেন সাতজন। এর আগের দিন ছিল ৯ জন। এপ্রিল মাসের ১২ দিনে করোনায় মারা গেলেন ৪১ জন। গত এক বছরে চট্টগ্রামে রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যু হয়েছে এপ্রিল মাসে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের করোনা সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া যায়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য মতে গতকাল সোমবার পর্যন্ত মৃতের মোট সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩০ জনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানার ফলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সাথে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় আবারো রেকর্ড সংখ্যক করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রামে। দুই হাজার ৬০৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন করে ৫৪১ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে। নতুন শনাক্তের মধ্যে ৪৫২ জন নগরের ও ৮৯ জন বিভিন্ন উপজেলার। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৪৪ হাজার ৮৬০ জনে।
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রেজাউল ইসলাম (৫৫) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৫৫ জনে।
জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল রেজাউল ইসলাম ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ওই দিন সকালে পরিবারের সদস্যরা তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক রেজাউল করিমকে নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পরদিন ৮ এপ্রিল তার নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। ৯ এপ্রিল পরিবারের সদস্যরা তাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গায় আরো সাতজনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এনিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮০৪ জন। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করে। চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের। এর মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে।

 



আরো সংবাদ