১৩ মে ২০২১
`
একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বড় চ্যালেঞ্জ অনানুষ্ঠানিক খাতকে বাঁচিয়ে রাখা

-

প্রথম দিকে আমরা ভালোই ছিলাম অন্যদের তুলনায়। কিন্তু সরকারের করোনাকে গুরুত্ব না দেয়ার ভুলের কারণে দ্বিতীয় ধাক্কাতে আমাদের অর্থনীতি তিনটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। প্রান্তিক পর্যুদস্ত মানুষকে সহায়তা দেয়া, অবকাঠামো নির্মাণ করা এবং অর্থনীতির প্রাণ অনানুষ্ঠানিক খাতকে বাঁচিয়ে রাখাই এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি প্রধান কাজ হবে করোনা সংক্রমণ যাতে আর ছড়াতে না পারে সে জন্য প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। তিনি মনে করেন, সরকারের আয় বাড়াতে রাজস্ব বোর্ডের উচিত হবে কর-সংক্রান্ত যত মামলা আটকে আছে এই সময়ে সেগুলোকে নিষ্পত্তি করা। এতে করে সরকারের কিছুটা হলেও রাজস্ব আদায় বাড়বে। কার্যক্রমকে অনলাইনে পুরোপুরি নিয়ে যেতে পারলে ঘরে বসেই রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
নিচে তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
নয়া দিগন্ত : কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা বিশ্বে অচলাবস্থা চলছে। অর্থনীতিতে এর অভিঘাত কতটা গুরুতর হবে বলে মনে করেন?
ড. আবদুল মজিদ : বিষয়টি দু’ভাবে দেখা যেতে পারে। প্রথম যখন ২০১৯ এ কোভিড আসে তখন আমরা মোটামুটি স্টেবল ছিলাম। আমাদের অর্থনীতির অভিঘাত সহ্য করার ক্ষমতা ঠিক ছিল। আমরা সবাই মিলে ভালো ছিলাম। সরকারও পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্যাকেজ দিয়ে এগিয়ে আসে। অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে যতটা না ক্ষতি হয়েছিল, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ততটা ক্ষতি বা আঘাত আসেনি। যার কারণে আমাদের জিডিপি কমলেও সাড়ে ৫ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় এই ধাক্কার কারণে আমরা তিনটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে গেলাম। প্রথমত, মানুষের কাছে সঞ্চয় ছিল, ধৈর্য ছিল, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল। এসব দিয়ে যা আয় করেছিল বা সঞ্চয় করেছিল, ভেবেছিল করোনা চলে গেলে তা দিয়ে পুনরুদ্ধার করে ফেলব। কিন্তু এবারের আক্রমণে দেখা গেল, বিগত এক বছরে মানুষ মানসিক, আর্থিক, সামাজিক এবং আরো নানাভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে। যখন তার ঘাত কাটিয়ে ওঠার কথা ঠিক তখনই দ্বিতীয় আক্রমণ করোনার। এতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা পড়েছে। মানুষের মনোবল হারিয়ে গেছে। তারা জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনীতিতে ইনফরমাল সেক্টরই হচ্ছে ৮০ শতাংশ। এই ধাক্কাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে চরমভাবে। তাদের প্রতি যদি নজর দেয়া না হয়, তাহলে শুধু করোনাতেই নয়, তারা ক্ষুধার সঙ্কটে আরো পর্যুদস্ত হবে।
নয়া দিগন্ত : করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় অন্যদের চেয়ে আমাদের অবস্থা আগে ভালোই মনে হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাক্কায় সব যেন এলোমেলো অবস্থা। এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ড. আবদুল মজিদ : অন্যান্য দেশ প্রথম ধাক্কাতে পড়ে নাকানি চুবানি খেয়ে কিছু শিক্ষা নিয়েছে। তারা হাসপাতাল, অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নিতে হবে তারও ব্যবস্থা তারা করেছে। টিকা আবিষ্কার করে তা নেয়ার ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশ করেছে ভুল। বাংলাদেশ মনে করেছে, কোভিড একবারই এসেছে। এটা চলে যাবে। এরপরে আর কিছুই নেই। বাংলাদেশে এখন এটা নেই, ওটা নেই অবস্থা। এই সময়ে দুই দু’জন স্বাস্থ্যসচিবকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী বদল হলো না। অথচ অভিযোগগুলো ছিল মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এমনভাবে পলিসি করা হয়েছে যে বেসরকারি খাত যেন এখানে এই সময়ে ঢুকতে না পারে। যেমন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বহুদিন ধরে বলল যে পরীক্ষা করার কিটটা আমাদের দেন। কম খরচে আমরা পরীক্ষা করব। আর পরীক্ষা করলে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। আরো একটি প্রতিষ্ঠান তারা ৩ শ’ বেডের একটি হসপিটাল বানানোর অনুমতি চেয়েছিল, পায়নি। বসুন্ধরা ঘোষণা দিলো তারা বিরাট একটা কিছু করবে। পরে দেখা গেল এ ব্যাপারে আর কোনো কথাবার্তা নেই। সব চুপ চাপ। মোটকথা, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা- সরকার ও বিএমএ সব কিছু নিজেদের কাছে রাখতে চেয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে যেসব অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ ও উচিত ছিল সেগুলো প্রকৃতপক্ষে কিছুই করা হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে হিসাব নিলে ওই চিত্রই বেরিয়ে আসবে, গত বছর মার্চ পর্যন্ত দেশে কতটা আইসিইউ ছিল, কতটা বেড ছিল, কতটা পরীক্ষাগার ছিল। আর এ বছর মার্চে এসে হিসাব নেয়া হলে দেখা যাবে যে গত এক বছরে নতুন করে কিছুই যুক্ত হয়নি। অথচ সেই সময় বাজেটে দেখানো হয়েছে, আমরা জেলায় জেলায় আইসিইউ করব, এই করব সেই করব, কত কিছু করব। বাস্তবে আসলে তা হয়নি। সেদিন এক সচিব বলেছেন, তারা বড় অঙ্কের একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে কী অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে হয়নি। কিছু নার্স ও ডাক্তার নেয়া হয়েছে মাত্র। কিন্তু বেসরকারি খাতকে আসতে দেয়া হয়নি। বেসরকারি খাত যে নিজস্ব উদ্যোগে কিছু করবে, সেটাও করতে পারেনি। ফলে দ্বিতীয় ধাক্কায় মানুষ ভার্নারেবল হয়ে গেছে, অক্সিজেন নেই, আইসিইউ নেই ইত্যাদি।
এ ছাড়া ইংল্যান্ডে যে ভাইরাস বেরিয়েছে, বা আফ্রিকা থেকেও যে আসছে, এটা বাংলাদেশ দুই থেকে তিন মাস আগে জানে। এমনকি নভেম্বরের শেষে বলা হলো শীতকালে এটার প্রাদুর্ভাব আরো বাড়বে। সরকারও মুখে বলা শুরু করল। দ্বিতীয় ধাক্কার কথাটা তখনই আসছে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে এসে এমন একটা ভাব তৈরি করল যে, না কিছুই হয়নি। আমরা ভালো হয়ে গেছি। এতে করে মানুষ দলে দলে কক্সবাজারে যাওয়া, হোটেলে যাওয়া, রিসোর্টে যাওয়া শুরু করেছে। এক শ্রেণীর মানুষের কাছে অবৈধ অর্থ আসছে তারা এটাকে খরচ করার পথ খুঁজে বেড়ায়। যারা তথাকথিত উচ্চবিত্ত তারা দলে দলে ঢাকা থেকে গাড়ি ভরে পদ্মা সেতুতে যায় ইলিশ ভাজা খাওয়ার জন্য। গত বছর মার্চের প্রথম থেকেই আমাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। মার্চের কর্মসূচির কারণে তারা স্কুলগুলো বন্ধ দিতে চাচ্ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। প্রোগ্রামও বাতিল করা হয়। এবারো যখন ডিসেম্বরে বলা হচ্ছে আমরা দ্বিতীয় ধাক্কাতে পড়ছি। এটি বলতে বলতেই ফেব্রুয়ারিতে ভাব এলো না কিছুই হয়নি। ফলে মানুষ সামাজিক দূরত্ব না মেনে অবাধে চলাচল শুরু করল। বাংলা একাডেমিকে বইমেলা করতে দেয়া হলো। ঠিক কঠিন সময়ে বইমেলা চালু করা হলো। মানুষ মনে করছে গত ফেব্রুয়ারি-মার্চের তথ্যগুলো সঠিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। মানুষ ঠিকই অসুস্থ হয়েছে। যেখানে পরিস্থিতি ভালো না সেখানে ধর্মীয় নেতা হোক, যেই হোক। রিসোর্টে যাওয়ার সময় পাচ্ছে। এটা মানসিকতার বিষয়। কারণ ও প্রভাব আমাদের দেখতে হবে।
নয়া দিগন্ত : এখন তো সরকার প্রতিরোধের জন্য লকডাউন করছে।
ড. আবদুল মজিদ : সাত দিন মানুষগুলোকে আটকে রাখা হবে লকডাউনের মাধ্যমে। সেটা কেন ৩-৪ দিন আগে ঘোষণা দেয়া হলো। এতে করে আজকে শপিংমল, মার্কেট, বাজারে মানুষ হুমড়ি খেয়ে কেনাকাটা করছে। উপচে পড়া ভিড়। একটা প্যানিক সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে এত এত মানুষ প্রতিদিন মারা যাচ্ছে, সেখানে ঈদের বাজার না করলে হয় না, শপিং না করলে চলে না? সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের একটা সহায়ক অবস্থা তৈরি করা হলো। এখন আর কঠোর পদক্ষেপ ঘোষণা করলেই হবে না। এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। ভয় দেখানোর কারণে আতঙ্ক সৃষ্টির কারণে মানুষ বাজারে যায়, সেখান থেকে তো আরো ছড়াচ্ছে। সেটা ছড়ালে কন্ট্রোল করার মতো তো অবকাঠামো নেই। এখানে সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। সেটা হচ্ছে না। তবে বাইরের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত অবস্থানে এখনো আছে। হয়তো উঠে দাঁড়াতে পারবে। আচমকা এই ধাক্কা দুর্বল করে দিচ্ছে মানুষকে। আর এই মানুষই তো অর্থনীতিকে টেনে তুলবে। যে মানুষ অর্থনীতিকে টেনে তুলবে তারাই যদি না বাঁচে, পঙ্গু হয়ে থাকে তাহলে অর্থনীতিকে কে টেনে তুলবে? আমি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করলাম না, প্রতিষেধক নিয়ে টানাটানিতে ব্যস্ত। আর নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধকই তো নাই। না টিকা না ওষুধ।
নয়া দিগন্ত : করোনা এই দ্বিতীয় ধাক্কায় বাংলাদেশের সামনে কী কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে?
ড. আবদুল মজিদ : এখন চ্যালেঞ্জ হলো যেভাবেই হোক করোনার সংক্রমণের ব্যাপারে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানুষ যেন আক্রান্ত কম হয় সে পদক্ষেপ নিতে হবে। যে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে তার সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে চিকিৎসাব্যবস্থা তো ভঙ্গুর। তাই মানুষের মনোবল ঠিক রেখে প্রতিরোধে জোর দেয়াটা এখন খুবই জরুরি। নতুন করে আর আক্রান্ত যেন না হয়। কারণ আক্রান্ত হলেই কিন্তু সেটা অর্ধমৃত অবস্থা হয়। কখন কোন পদক্ষেপ নিতে হবে সেটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিতে হবে। সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে এই রোগ যাতে আর না ছড়ায়, এটা হলো প্রথম চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ গত আক্রমণে বিশেষ করে রিকশাচালক দিনমজুর এরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তারা করোনা আক্রান্ত হয়নি। এমনকি গ্রামের মানুষও আক্রান্ত হয়নি। এটা একটা ইতিবাচক দিক ছিল আমাদের জন্য। এখন দ্বিতীয় ধাক্কায় শিশু, যুবকরাও আক্রান্ত হচ্ছে। যা প্রথম দফাতে ছিল না। তাই সংক্রমণ যাতে বেশি না হয় আর সে জন্য কঠোরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হবে। তাই কড়াভাবে লকডাউন দিয়ে হোকে বা যেভাবেই হোক মানুষের মুভমেন্ট বন্ধ করতে হবে। তবে এটা কিছু দিনের জন্য, বেশি দিনের জন্য করলে হবে না। কারণ এতে করে মানুষ যদি কর্মহীন হয়ে পড়ে, তাহলে আম-ছালা দুটোই যাবে।
সামনে বোশেখ, রমজান ও ঈদ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গত বছর ওসব ভালো করে করতে পারেনি। তবে গত বছর তারা সেটা কোনোভাবে পুষিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারা মনে করেছিল এবার এই সময়ে অর্থনীতি আবার জেগে উঠবে। তারা এই প্রত্যাশায় ছিল। কিন্তু ঢেউটা এমন সময় এলো, বৈশাখকেও আক্রমণ করল, ঈদকেও আক্রমণ করল এবং রোজাকে আক্রমণ করল। অর্থনীতিতে ইনফরমাল সেক্টরে তারাই হচ্ছে ৮০ শতাংশ। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে চরমভাবে। তাদের প্রতি যদি নজর দেয়া না হয়, তাহলে শুধু করোনাতেই নয়, তারা ক্ষুধার সঙ্কটে আরো পর্যুদস্ত হবে। অন্যান্য বড় বড় খরচে কঠোরভাবে কৃচ্ছ্রতা সাধন করে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ইনফরমাল খাতের মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বড় বড় বেসরকারি খাতকে বাধ্য করতে হবে তারা যেন একেকজন একেকটা অঞ্চলের দায়িত্ব নেয়। কারণ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব হবে না।
নয়া দিগন্ত : রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির মধ্যেই আসছে নতুন অর্থবছরের বাজেট। এ ক্ষেত্রে বাজেট তৈরিতে সরকারকে কী কী পদক্ষেপ ও দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রাখতে হবে বলে আপনি মনে করেন।
ড. আবদুল মজিদ : রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হবে। এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। কারণ আমরা যদি খরচের বাজেট বড় না করি উপায়ও নেই। আমাদের সামাজিক সুরক্ষা খাত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করতে হচ্ছে। এই সব প্রকল্পগুলোকে শেষ করতে হবে। রেখে দেয়া যাবে না। কারণ থামিয়ে দেয়া হলে যে কাজ করা হয়েছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, এতে বাস্তবায়ন খরচও বেড়ে যাবে। তাই যত কষ্ট হোক উন্নয়নের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। আর সেটি রাখতে হলে খরচের বাজেট বড় হবেই। সরকারের ব্যয়ের বাজেট বড় হলে এটা অর্থনীতির জন্য ভালো, খারাপ না। কারণ ওই টাকাটা অর্থনীতিতেই আসছে। যেহেতু এসব বড় প্রকল্পে ট্যাক্স সিডি ভ্যাট দিতে হয়, আর এটা সরকার দেয়, আবার সরকারই নেয়। তবে এটাও একটা আয়। তবে সামাজিক সুরক্ষা খাত ও স্বাস্থ্য খাতে যেসব ব্যয় করা হয় এখানে ট্যাক্স আসার কিছু নেই। তবুও অর্থনীতির চাকা ঘূর্ণায়মান থাকবে। ওই ব্যয়ের বাজেটই অর্থনীতিকে পরোক্ষভাবে সচল করবে। এতে আবার কিছু ভ্যাট আসবে। তা যদি নাও আসে তবে ঘাটতি শুধু হিসাব করে বললেই হবে না যে এত হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। এটা তো হবেই। কারণ আয়ের তুলনায় আমার ব্যয়ের বাজেট বড়। বুঝতে হবে অর্থনীতিতে কর্মকাণ্ড নেই। আমদানি নেই। মানুষের আয় নেই। আয় না থাকলে কর কোথা থেকে আসবে। বেচাকেনা না থাকলে ভ্যাট কোত্থেকে দেবে? প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয়ের বাজেট বড় করতে হলে করতে হবে। আর তার সাথে হিসাব কষে সে অনুযায়ী রাজস্ব বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করতে হবে।
বাজেটে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে অচল অর্থনীতিকে সচল করতে যা যা লাগে সেটার প্রতি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ইনসেন্টিভ দিতে হবে। তাদেরকে কর থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। এসবও বাজেট। তাদের জন্য যে প্যাকেজ দেয়া হয়েছে তার অর্থ যেন ঠিক সময় মতো পায় সেটার প্রতি নজর ও পদক্ষেপ থাকতে হবে। গত বছর যে ২০ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে তা ছাড় হয়নি। কারণ ব্যাংককে বলেছে দিতে, ব্যাংক তো কাস্টমারকে চিনে না, দেয়নি। ব্যাংক বলছে আমি অমুককে চিনি, সে নিয়মিত ব্যাংকে আসে, তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। আমাকে সে কিছু দেয়ও। ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণের টাকা তারা পাবে না। বড় কথা হলো, সুশাসন, জবাবদিহিতা না বাড়ালে, কাঠামো ঠিক না হলে শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়ালে তো হবে না।
নয়া দিগন্ত : সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা কতটা বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছে আপনি মনে করেন? ধাক্কা সামাল দিতে কী করণীয় বলে মনে করেন?
ড. আবদুল মজিদ : এখানে সহায়তার অর্থগুলো প্রদানের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যায়। সিস্টেম লসে অনেক কিছুই চলে যাচ্ছে। বিতরণে দলীয় প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গ্রামে দেখলাম, সাহায্য ও অর্থ গেছে। সরকারের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ ভালো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেসব বিতরণ করছে ইউপি চেয়ারম্যান বা এমপি বা দলীয় নেতারা। তারা তো দেখেশুনে দিচ্ছে। সবাইকে তো দিচ্ছে না। সংবিধানের প্রথম দিকে লেখা আছে আমরা বাংলাদেশের জনগণ। আমরা বাংলাদেশে জনগণ মানে প্রত্যেকেই। তাই এইসব কার্যক্রমকে গণমুখী করতে হবে। আর জাতীয় এই ধরনের সঙ্কটের সময় জাতীয় ঐকমত্য গড়তে হয়। ভারতে এই ধরনের সঙ্কটে সরকারি, বিরোধীদল, বেসরকারি খাত সবাই একসাথে মিলে সঙ্কট উত্তরণে কাজ করছে। তখন জনগণ দেখে আমাদের সঙ্কটের সময় সবাই একসাথে মিলে কাজ করছে। এখানেও যদি সব রাজনৈতিক দলগুলো একসাথে বসে আহ্বান জানাতো, দেশের এই সঙ্কটে সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষা সবাই কেন এক সাথে করবেন না? আসেন আমি এই এলাকার দায়িত্ব নিলাম, আপনি ওই এলাকার দায়িত্ব নেন। বিরোধী দলেরও উচিত জাতীয় এই সঙ্কটে ঝাঁপিয়ে পড়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই মিলে করেছে, এখনো সবাই মিলে করুক। অনবরত সমালোচনা করে যাচ্ছে। সমালোচনা করে কী লাভ? যেখানে ১০ শতাংশ লোক শপিংমলে গিয়ে গাদাগাদি করে ঈদের কেনাকাটা করছে। আর ৮০ শতাংশ মানুষ চরম সঙ্কটে আছে। এতে করে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
বড়দের ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। কারণ ব্যাংক চেনে তাই ছাড় হয়েছে। কিন্তু ছোটদের ২০ হাজার কোটি টাকার তেমন ছাড় হয়নি। আমাকে ঋণ দিলে তো হবে না, আমাকে তো ব্যবস্থা করতে হবে। টাকা নিয়েছে তারা করোনার কারণে ব্যবসা করতে পারেনি। কিন্তু সুদও হয়েছে, টাকা পরিশোধের সময়ও হয়ে গেছে। অর্থনীতি তো সচল ছিল না। টাকা তো অলস ছিল। তবে ক্ষুদ্রদের টাকা ছাড় হয়নি এটা ঠিক। তবে সরকারের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু পরিবেশ অনুকূলে ছিল না। ভবিষ্যতে নজর রাখতে হবে অর্থনীতি কিভাবে পুনরুদ্ধার হয়, চাঞ্চল্যতা ফিরে আসে, সে ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।
নয়া দিগন্ত : রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবদুল মজিদ : এখানে সব কিছু মেনে নিয়ে তিনটা কাজ করতে হবে। প্রথমত, রাজস্ব বোর্ডকে যেটা করতে হবে, তা হলো, যেহেতু মাঠে তার কোনো কাজ নেই, তাই অনলাইন ভ্যাট ও ট্যাক্সের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তাতে লোকবল আর এতো লাগবে না। অথচ ফল স্বাভাবিকভাবেই আসতে থাকবে। দ্বিতীয়ত, অনেক মামলায় বহু রাজস্ব টাকা আটকে আছে। টাকা আটকে থাকা মানেই টাকার ভ্যালু কমে যাচ্ছে। তাই এখন এনবিআরের উচিত যেহেতু তাদের মাঠ পর্যায়ে বা অন্য কাজের ব্যস্ততা নেই, তাই এই সব মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া উচিত। তৃতীয় কাজ হবে, পুরনো ফাইল নিষ্পত্তি করা। আয়ের উৎস বের করা। জয়েন স্টক কোম্পনিগুলোর তালিকা ধরে কাজ করা। সিটি করপোরেশনের বাড়ির তালিকা ধরে কারা কারা হোল্ডিং ট্যাক্স না দেয় তাদের ধরা। বিআরটিএর তালিকা নিয়ে অফিসে বসেই গাড়িগুলোর কর দিচ্ছে কি না দেখা। অটোমেশনে গেলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সহজেই সম্ভব। উৎসে কর সঠিকভাবে জমা হচ্ছে কি না সেটা দেখা। তারপর নতুন করদাতাদের শিখানোর জন্য করমেলার আয়োজন প্রতিটি অঞ্চলে করা উচিত। কেন সেটা করা হচ্ছে না। অফিস ভাড়া তো দিতে হচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
ড. আবদুল মজিদ : তোমাকেও ধন্যবাদ। তোমরাও ভালো থাকবে।



আরো সংবাদ