১৬ মে ২০২১
`
ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ২ কোটি টাকা দাবি

অপহরণ করে টাকা আদায়ের অভিযোগে র্যাবের ৪ সদস্য গ্রেফতার

-

অপহরণ করে টাকা আদায়ের অভিযোগে র্যাবের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের নাম-পরিচয় জানা না গেলেও তাদের মধ্যে তিনজন সেনাবাহিনী ও একজন বিমানবাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় জড়িত আরো দু’জন পলাতক রয়েছে। যার একজন বিজিবির সদস্য ও আরেকজন সাধারণ নাগরিক। গতকাল শুক্রবার ভোরে র্যাবের অভিযুক্ত চারজনকে আটক করে থানায় নেয় পুলিশ। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করা হয়। নিয়মিত মামলা দায়েরের পর চার র্যাব সদস্যকে নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, এই অপহরণ চক্রে মোট ছয়জন জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন হলেন সেনাবাহিনীর, একজন বিমানবাহিনীর, একজন বিজিবির ও আরেকজন সাধারণ মানুষ। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে বিজিবির সদস্য ও সাধারণ নাগরিক পলাতক রয়েছেন।
হাতিরঝিল থানায় অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রাইয়ানা হোসেন নামের এক তরুণী অভিযোগ করেন তার বড় ভাই তামজিদ হোসেন (২৭) তাদের মীরবাগের বাসা থেকে ৮ এপ্রিল সকাল ৯টায় উত্তরায় যাওয়ার কথা বলে বের হন। আনুমানিক দুপুর ১২টার দিকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জানান, তার ভাই তামজিদ র্যাবের হেফাজতে আছেন। থানা পুলিশ বা ডিবি পুলিশকে জানালে তার ভাইকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে- এ কথা বলে ফোন কেটে দেন ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি।
রাইয়ানা অভিযোগে বলেন, আমি পরে অনেকবার ফোন করলে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি রিসিভ করেননি। পরে আনুমানিক বেলা দেড়টায় ফোন রিসিভ করে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি জানান, আমার ভাইকে র্যাবের সিনিয়র অফিসাররা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তার নামে অস্ত্র ও মাদক মামলা হবে।
রাইয়ানা অভিযোগে বলেন, আমার ভাইকে র্যাবের কোন অফিসে, কোন সিনিয়র অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করছেন জানতে চাইলে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি জানান, এই মুহূর্তে সে কোথায় আছে তা বলা যাবে না। তাকে ক্রসফায়ারও দেয়া হতে পারে। যদি আপনার ভাইকে বাঁচাতে চান তাহলে দুই কোটি টাকা রেডি করেন। এর কিছুক্ষণ পর র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী সেই ব্যক্তি মোবাইল ফোনে আমার ভাইকে তাদের সহযোগীদের দ্বারা মারধরের শব্দ শোনান এবং আমার ভাইকে মোবাইল ফোন দিলে আমার ভাই কাঁদতে কাঁদতে জানায়, তাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে বেদম মারধর করছে। আমার ভাই কাঁদতে কাঁদতে বাঁচার আকুতি জানায়। পরে ওই নম্বর থেকে আরো অজ্ঞাত দুই-তিনজন ফোন করে টাকা জোগাড় করতে পেরেছি কি না জানতে চায়। আমি তাদের বলি, আমরা গরিব মানুষ। এত টাকা কোথায় পাব? একপর্যায়ে র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী সেই ব্যক্তি ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন। আমাদের কাছে কোনো টাকা নেই জানালে সেই ব্যক্তি ১২ লাখ টাকা নিয়ে রাজধানীর একটি অভিজাত মার্কেটে যেতে বলেন। থানা পুলিশ বা ডিবি পুলিশকে জানালে আমার ভাইকে প্রাণে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেন তিনি। আনুমানিক বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আমার ভাইয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে কল করে আমার সাথে ভাইয়ের কথা বলিয়ে দেয়া হয়। আমার ভাই তখন তাকে খুব মারধর করছে বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের দাবিকৃত টাকা দিয়ে দিতে বলে। আমরা তখন তার অবস্থান জানতে চাইলে সে পুনরায় জানায় তার হাত-পা ও চোখ বাঁধা। সে কোথায় আছে বলতে পারবে না।
চার র্যাব সদস্য গ্রেফতাদের বিষয়ে গতকাল শুক্রবার বিকেলে নিশ্চিত করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা: শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, অপহরণ করে মুক্তিপণ নেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার চারজনের মধ্যে তিনজন সেনাবাহিনীর এবং একজন বিমানবাহিনীর সদস্য। এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে টাকা আদায়ের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা হয়েছে। তবে চারজনকেই তাদের নিজ নিজ বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এদের বিচার নিজ নিজ বাহিনীর আইন অনুযায়ী হবে।
এ বিষয়ে র্যাব সদর দফতরের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, আমরা ঘটনাটি শুনেছি। ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। অভিযুক্তদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুই-চারজন সদস্যের জন্য র্যাবের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে, আর কেউ যাতে এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত না হয় সে জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি না- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাহিনীর কেউ অপরাধে জড়ালে এবং সেটির প্রমাণ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে র্যাবে শতভাগ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। অনৈতিক কাজ করলে শাস্তি পেতেই হবে, এ বার্তা সব সময় দেয়া হয়।



আরো সংবাদ