১২ এপ্রিল ২০২১
`
ঢাকায় ডি৮ শীর্ষ সম্মেলন : মেগাব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এরদোগানের

রোহিঙ্গা ইস্যুর নিষ্পত্তি না হলে হুমকিতে পড়তে পারে আঞ্চলিক নিরাপত্তা : শেখ হাসিনা

-

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যুবসমাজের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ডি৮ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদি সঙ্কটের অবসান না হয়, এটি এ অঞ্চল এবং এর বাইরেও নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি রোহিঙ্গা সঙ্কটকে বাংলাদেশের জন্য জরুরি ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করে আরো বলেন, এ কারণে দেশের পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত ১০ম ডি৮ সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে এসব কথা বলেন। দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ তুরস্কের কাছ থেকে ডি৮-এর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, ১৯৯৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ডি৮-এর দ্বিতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সভাপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করেন বলে বাসসের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিকে তুর্কি দৈনিক সাবাহর খবরে বলা হয়েছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান বৃহস্পতিবার একটি ‘মেগাব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার ধারণা উপস্থাপন করে বলেছেন যে, এটি ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তারল্যের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর জন্য অর্থ সরবরাহ করতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ডি৮ গ্রুপের ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে এরদোগান উল্লেখ করেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে এই ধারণা ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের প্রয়োজন পূরণের সাথে সাথে মুসলিম দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো অর্থায়ন প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করবে।’
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে বিশদ ব্যাখ্যা দেননি, তবে বলেছেন যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ডি৮ সংস্থাটিকে বর্তমানের প্রয়োজনের সাথে আরো ভালোভাবে ফিট করার জন্য হালনাগাদ করা উচিত। আর এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি প্রকল্প এবং ফলাফলভিত্তিক কাঠামোয় এটিকে রূপান্তরিত করা উচিত।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে শুরু থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে তাদের (রোহিঙ্গাদের) নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং টেকসই ব্যবস্থায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের তিন বছরের বেশি পরেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারেনি।
সম্মেলনে শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি প্রশমন ও অভিযোজনে ডি৮ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা জন্য নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘ডি৮-এর মধ্যে কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন এখন অপরিহার্য যাতে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে একে অপরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করতে পারি।’
তিনি বলেন, কোভিড ১৯ মহামারী ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত বছর বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় আমফান এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় জিডিপির ১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। বর্তমান অবস্থার যদি পরিবর্তন না হয়, তা হলে আসছে দশকগুলোতে এই ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম-সিভিসির সভাপতি হিসেবে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন ইস্যুতে ডি৮ ভুক্ত দেশগুলোর সাথে কাজ করতে পারা বাংলাদেশের জন্য আনন্দদায়ক হবে।
ডি৮ দশম সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বৈশ্বিক রূপান্তরের জন্য অংশীদারিত্ব : যুব সম্প্রদায় ও প্রযুক্তি শক্তির মুক্তি’। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইস্তাম্বুুলে অনুষ্ঠিত প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে অংশ গ্রহণকারী ডি-৮-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শেখ হাসিনাও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। এগুলো হলোÑ দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যুবকদের শক্তিকে কাজে লাগানো, আইসিটির সম্পূর্ণ সম্ভাবনার সদ্ব্যবহার, প্রয়োজনীয় আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিকাঠামোগত রূপরেখা তৈরীকরণ এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে সংযোগ উন্নত করা।
ব্যবসায়িক ধারণা, মডেল তৈরি, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জনকারী যুবকদের ক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে যুক্ত করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডি৮ দেশের যুবকদের ব্যক্তিগত এবং এমনকি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে একত্রিত হতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ডি৮ বিজনেস ফোরাম প্রথম ডি৮ যুব শীর্ষ সম্মেলনের সাথে মিলে এই বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এক দশক ধরে রূপান্তরকারী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। এর ফলে দেশটি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ পরিণত হয়েছে। ছয় লাখেরও বেশি তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, ২৮টি উচ্চ হাইটেক পার্ক ও প্রযুক্তিবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুব ও প্রযুক্তির শক্তি ব্যবহার করে সর্বোত্তমভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ডি৮ সচিবালয় গ্রুপের মধ্যে সম্ভাবনার তথ্য সরবরাহ করতে পারে এবং ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’ সহযোগিতা চুক্তির সুযোগ অন্বেষণ করতে পারে। এ ধরনের তথ্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংলাপ বাড়াতে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
বাণিজ্য শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাত দ্বারা চালিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ব্যবসায়ীদের ভ্রমণের সুবিধা প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ; তাই ডি৮ সদস্য রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা পদ্ধতির সরলীকরণ অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ছয় ডি৮ সদস্যের সাথে যোগ দিয়েছে।
উন্নয়নশীল-৮ নামে পরিচিত ডি৮ অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য আটটি উন্নয়নশীল মুসলিমপ্রধান দেশ বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত হয়। ডি৮-এর সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা, ডি৮ মহাসচিব প্রতিনিধিরা ভার্চুয়ালি এ সম্মেলনে যোগ দেন।



আরো সংবাদ