১২ এপ্রিল ২০২১
`

তপ্ত হাওয়ায় বিলীন গরিব কৃষকের স্বপ্ন

-

বিভিন্ন জেলায় আচমকা বয়ে যাওয়া তপ্ত হাওয়ায় বিস্তীর্ণ বোরো ধানের ক্ষেত পুড়ে যাওয়ার সাথে সাথে বিলীন হয়ে গেছে গরিব কৃষকের স্বপ্ন। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন স্থানের কৃষকদের ওপর হঠাৎ করে নেমে আসে এই অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাচ্ছেন। জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে দুই হাজার হেক্টর জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বরিশালের উজিরপুরে ৬০০ হেক্টর জমির ধান নষ্টের উপক্রম। ময়মনসিংহের ভালুকায় গরম বাতাসের পাশাপাশি ইটভাটার কালো ধোয়ায় বোরো ধানে ব্যাপকহারে চিটা পড়ছে। এতে কৃষকের মধ্যে হাহাকার চলছে।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কটিয়াদীতে গরম বাতাসে বিলীন হয়ে গেছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। হঠাৎ তপ্ত হাওয়ায় বোরো ধানের পরাগরেণু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হতাশার ছাপ পড়েছে কৃষকের মুখে। ৫০০ হেক্টর জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ১২ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৫১ হাজার ৪ শত মে. টন। এ দিকে হঠাৎ গরম বাতাসে প্রায় দুই হাজার ৩০০ হেক্টর জমির পরাগরেণু আক্রান্ত হয়েছে। যার ২৫ শতাংশের ৫৭৫ হেক্টর জমির ফসল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সম্প্রতি গরম বাতাসে উপজেলার আচমিতা, মুমুরদিয়া, করগাঁও, চান্দপুর, বনগ্রাম, মসূয়া ও সহশ্রাম ধূলদিয়া হাওর এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষক বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। এই ফসলের ওপর ভিত্তি করেই তাদের সংসার চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত ধান বিক্রি করেন। কিন্তু এবার কৃষকদের সোনালী স্বপ্ন ভেঙে গেছে। কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে বিগত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ জমিতে বোরো আবাদ করেন কৃষকরা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মুকশেদুল হক জানান, ‘গরম বাতাসে বিভিন্ন ইউনিয়নের দুই হাজার ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আক্রান্ত জমির ২৫ ভাগ ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।’
উজিরপুর (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, আচমকা বয়ে যাওয়া গরম বাতাসে বরিশালের উজিরপুরের সাতলা, জল্লা ও শোলক ইউপির অন্তত ৬০০ হেক্টর জমির বোরো (হাইব্রিড) ধান পুরোপুরি নষ্টের উপক্রম হয়েছে। এতে কমপক্ষে দেড় হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধূলিসাৎ হয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা ও রাত ১২টায় দুই দফায় হঠাৎ অধিক তাপমাত্রার গরম বাতাস বয়ে যায়। এতে উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের নয়াকান্দি, শিবপুর, পশ্চিম সাতলা, আলামদি; জল্লা ইউপির বাহেরঘাট, বামরাইল ইউপির ধামসর ও শোলক ইউপির শোলক গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার কমপক্ষে ৬০০ হেক্টর জমির বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক স্থানে ধানের ক্ষেত পুড়েও গেছে। যার ফলে ওইসব এলাকার কমপক্ষে এক হাজার ৮ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। সাতলা ইউনিয়নের আলামদি গ্রামের কৃষক মো. মহসিন হাওলাদার (৪৫) জানিয়েছেন, মাত্র ৫ থেকে ৬ মিনিটের ওই বাতাসে তার প্রায় দেড় একর জমির আবাদি ধানের শীষ পুড়ে গেছে। তিনি জানান, তার বয়সে এমন আবহাওয়ার বাতাস আর কখনো দেখেননি। এতে শুধু ধান নষ্ট হয়নি, বাতাস যেসব স্থান দিয়ে বয়ে গেছে সেখানকার অন্যান্য গাছপালার পাতা পর্যন্ত পুড়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: তৌহিদ জানান, গত মঙ্গলবার তিনিসহ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো: আবু সাইদ, মীর মো: মনিরুজ্জামান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ঐশ্বিক দেবনাথ ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রশান্ত হাওলাদারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, যেসব ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে বাতাস বয়ে গেছে সে জায়গার ধানের ফুলের রেণু বা শীষ পুড়ে গেছে। আবার অনেক জমির ধানের শীষ গাড়ো হয়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।
ভালুকা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার সর্বত্রই গরম বাতাস ও ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় বোরো ধানে ব্যাপকহারে চিটা দেখা দিয়েছে। এতে কৃষকদের মধ্যে চরম হাহাকার দেখা দিয়েছে। গত বুধবার ধীতপুর ইউনিয়নের টুংরাপাড়া গ্রামে গেলে কৃষক সাইদুল সরকার জানান, তার দেড় একর জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ চিটা হয়ে গেছে। তিনি এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারবেন না। এমন আরো অনেকের জমির ধান চিটা হয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া মল্লিকবাড়ি, ডাকাতিয়া, ধীতপুর, বিরুনীয়া, উথুরা, রাজৈসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধানে চিটা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ দিকে উপজেলার বিরুনীয়, ধলিয়া, মেদুয়ারী, মেদিলা, নীলেরটেক, উরাহাটি ও ভরাডোবাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা লাইসেন্সবিহীন ১৬টি ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গরম বাতাসের কারণে সব এলাকাতেই বোরো ধানের কিছুটা ক্ষতিসাধন হয়েছে। এগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জে হিটশকের পাশাপাশি পোকার আক্রমণ
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, দিরাই-শাল্লার হাওরে বেশ কিছু বোরো জমিতে তপ্ত হাওয়া ও পোকার আক্রমণে উঠতি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়ন, দিরাই উপজেলার রফিনগর ও শাল্লা উপজেলার বাহড়া ইউনিয়নরে অনেক জমিতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের অনেক কৃষক জানান, তারা সারা বছর কষ্ট করে এবার ঋণ করে ধানিজমি চাষ করেছেন। বছর শেষে বৈশাখে ধান কাটার অধীর আগ্রহে দিন পার করছেন তারা। ধান পাকার আগমুহূর্তে গিয়ে দেখেন ধানের মাঝে মধ্যে সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে। এ ছাড়া শাল্লার প্রতিটি গ্রামে, বাজারে, ক্ষেতে কয়েক দিন ধরে এক আলোচনা। পোকার আক্রমণে কপাল ভাঙছে কৃষকের। কৃষকরা বললেন, ব্রি-২৮ জাতের ধান, লালডিঙা, হাইব্রিড সুগন্ধা সবই খেয়ে শেষ করে দিচ্ছে পোকায়। জমিতে ১০-১৫ হাত পরে পরে ১০-১৫ হাতজুড়ে সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে ধানের শীষ। শীষের গোড়ার নরম স্থান কেটে দিচ্ছে পোকায়। শাল্লা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত দাশ বললেন, গত দুই দিন সরেজমিন উপজেলার কিছু গ্রাম ঘুরে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি।
এ দিকে জামালগঞ্জ উপজেলায় আচমকা তপ্ত হাওয়ায় সর্বনাশ হয়েছে শতাধিক কৃষকের ৫০০ একর বোরো জমি। বুধবার সন্ধ্যায় হঠাৎ ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা স্থায়ী গরম বাতাসে কৃষকের মাঝে শুরু হয় আতঙ্ক। গভীর রাতে বাতাস কমার পর আতঙ্ক কমে গেলেও সকালে উঠে কৃষকদের মাথায় হাত। সূর্যের প্রখরতা বাড়ার সাথে সাথে উঠতি বোরো ফসলের শীষ মরতে শুরু করেছে। মাঠের পর মাঠ একই অবস্থা। ফেনারবাঁক ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের বাবুল সরকার, শ্যামল সরকার, সুদিন সরকার ও শেখর সরকার জানান, বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শুধু গরম বাতাস ছিল। কোনোরকম ঝড়বৃষ্টি ছিল না। সকালে রোদ ওঠার পর হাওরে গিয়ে দেখি তোড় আসা ধান মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন সবার মাঝে আতঙ্ক ও হতাশা বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মাশরেফুল আলমের কাছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা জরিপ করছি। বিশাল হাওরে ক্ষতির বিষয়টি নিরূপণ করতে একটু সময় লাগবে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, এ বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা সরেজমিন তদন্ত করে উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে জানালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।



আরো সংবাদ