১৮ এপ্রিল ২০২১
`

প্রথমের ভীতি এখন স্বাভাবিক অনেকটাই

করোনা শনাক্তের এক বছরে আক্রান্ত সাড়ে ৫ লাখ, মৃত্যু সাড়ে ৮ হাজার
-

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের এক বছর আজ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের উদ্ভব চীনের উহানে হলেও বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২০২০ সালের ৮ মার্চ। ইতালিফেরত একজনের মাধ্যমে তার পরিবারের আরো দু’জনের করোনা শনাক্ত হয়। সে দিন থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৩৩০ জন করোনা শনাক্ত হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত পাঁচ লাখ তিন হাজার তিনজন সুস্থ হয়েছেন। দেশে প্রথম করোনায় মৃত্যু হয় প্রথম শনাক্তের ১০ দিন পর অর্থাৎ ১৮ মার্চ। সে দিন থেকে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন আট হাজার ৪৬২ জন। করোনা শনাক্ত সাপেক্ষে প্রতি ৬৫ জনের বিপরীতে একজনের মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে অথবা অন্য কোনোভাবে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশে তিনজন দন্ত চিকিৎসকসহ মোট ১২৯ জন চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা শনাক্তের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে চিকিৎসকের মৃত্যু কিছুটা বেশি হলেও পরে কমে আসে।
করোনা শনাক্তের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মহাখালীর আইইডিসিআর’র একটি মাত্র পরীক্ষাগারে করোনা শনাক্ত হলেও গতকাল রোববার পর্যন্ত বাংলাদেশে ২১৯ পরীক্ষাগার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধুনিক রিয়েল টাইম পিসিআর (আরটি পিসিআর) মেশিন রয়েছে ১১৮টি, ২৯টি জিন এক্সপার্ট মেশিন এবং ৭২টি অ্যান্টিজেন পরীক্ষাগার রয়েছে করোনা শনাক্তের জন্য।
করোনা শনাক্তের প্রথম দিকে বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকরাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে একেবারেই নতুন প্রকৃতির এই ভাইরাসটি মোকাবেলায় কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন অথবা এর ব্যবস্থাপনাটা কী রকম হবে তা যেমন বাংলাদেশের চিকিৎসকদের অজানা ছিল তেমনি আন্তর্জাতিকভাবেও চিকিৎসকরা জানতেন না কিভাবে ভাইরাসটির আক্রান্তদের ব্যবস্থাপনা করতে হবে। চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা জানা না থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা সীমিত হয়ে পড়ে। অল্প কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া বেশির ভাগই ছোট হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি হাসপাতালে জরুরি সেবার রোগী ছাড়া সাধারণ ভর্তি রোগীদেরও হাসপাতাল থেকে রিলিজ (ছেড়ে দেয়া হয়) দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারও। ফলে করোনায় আক্রান্ত না হলেও শুধু ভীতির কারণে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাননি।
করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে হলে ফেস মাস্ক, পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্টের (পিপিই) যথেষ্ট অভাব ছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশে সস্তায় পণ্য আমদানির নির্ভরযোগ্য দেশ ছিল চীন। সেখানেই করোনা প্রথম জানান দেয়ায় পিপিই সংগ্রহ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে পিপিই সরবরাহের নামে নকল পিপিই’র হিড়িক পড়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ক্রয় ও সরবরাহ কাজে নিয়োজিত কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) থেকে নকল পিপিই সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। কাগজে এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের কথা বললেও হাসপাতালে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হলে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে অন্যত্র বদলি করে দেয়া হয়। তার জেরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আসাদুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়া হয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদকে পদত্যাগ করতে হয়। তবে বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণে মানসম্মত পিপিই’র ব্যবস্থা হয়ে যায়। দেশীয় কোম্পানিগুলোই মানসম্মত পিপিই তৈরি করে দেশে সরবরাহ করার পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করে। এমনকি গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ নিজেদের জন্য ফেস মাস্ক তৈরি করে চীনা সরকারকেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কিছু মাস্ক পাঠানো হয়।
বাংলাদেশে জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণ শুরু হয়। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, ২ জুলাই সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হয়। সে দিন মোট করোনা শনাক্ত হয় চার হাজার ১৯ জন। এর আগে ২৯ জুন এক দিনে শনাক্ত হয় চার হাজার ১৪ জন। ১৫ জুলাই তিন হাজার ৫৩৩ জন করোনা শনাক্ত হন। সে দিন অবশ্য মৃত্যুবরণ করেন ৩৩ জন। অপর দিকে ১৮ আগস্ট তিন হাজার ২০০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও সে দিন মৃত্যুবরণ করেন ৪৬ জন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে যায়। মাঝখানে ৩ অক্টোবর এক হাজার ১৮২ জন শনাক্ত হলেও এরপর কয়েক দিন বেশ কমে যায় নতুন শনাক্ত। কিন্তু ৩০ নভেম্বর আবারো দুই হাজার ৫২৫ জন নতুন করে শনাক্ত হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের পর্যায় থেকে বলা হয় ডিসেম্বরের শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হতে পারে বাংলাদেশে; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ডিসেম্বরে করোনা ধীরে ধীরে কমে গেছে।
ডিসেম্বরের সংক্রমণ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক মোজাহেরুল হক জানান, সে সময়টায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদশের মানুষ বেশ সচেতন হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার একটি প্রবণতা দেখা যায়। বাইরে বের হওয়ার প্রবণতাও অনেকটা কম ছিল। ফলে জানুয়ারি মাসেও সংক্রমণ কম দেখা যায়। অপর দিকে ৭ ফেব্রুয়ারি দেখা এক দিনে ২৯২ জনকে করোনায়ভাইরাসে শনাক্ত পাওয়া যায়।
ফেব্রুয়ারিতে শনাক্ত ও মৃত্যু তুলনামূলক কম হলেও মার্চের শুরু থেকে ধীরে ধীরে এক দিনে শনাক্ত সামান্য করে বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল রোববার এক দিনে সারা দেশে ৬০৬ জন করোনা শনাক্ত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১১ জন।
করোনা শনাক্ত ও তা নিয়ন্ত্রণে রাখায় বাংলাদেশ সরকারের যেমন সাফল্য রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতা। কিন্তু ২৫ জানুয়ারি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত টিকা (ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি) নিয়ে আসায় করোনা নিয়ন্ত্রণে এক ধাপ এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো সমান অর্থনীতির অনেক দেশ এখন পর্যন্ত করোনার টিকা সংগ্রহই করতে পারেনি। গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশের ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫২ জনকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। অপর দিকে টিকা নেয়ার জন্য গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ৫০ লাখ ১৭ হাজার ৮০৪ জন নিবন্ধন করেছেন। আগামী ২৭ মার্চ প্রথম ৫০০ জনকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হবে বাংলাদেশকে। তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ তার মোট জনসংখ্যার একে শতাংশকে করোনাভাইরাসের টিকার আওতায় আনতে পেরেছিল। সে দিন বিশ্বের মাত্র ১৫টি দেশ তার জনসংখ্যার এক শতাংশকে টিকা দিতে পেরেছিল। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে রয়েছে।



আরো সংবাদ