১৯ এপ্রিল ২০২১
`

নির্যাতন ও পলায়নে বিব্রত কারা প্রশাসন

চট্টগ্রামের জেলার ও ডেপুটি জেলার প্রত্যাহার; তদন্ত কমিটি গঠন
-

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘বন্দী নির্যাতনের’ রেশ না কাটতেই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হত্যা মামলার এক আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনে তোলপাড় চলছে। অল্প দিনের ব্যবধানে এই দু’টি ঘটনায় তারা কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পরই কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মোমিনুর রহমান মামুনের নির্দেশনায় খুলনা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্সের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গতকাল রোববার কারা অধিদফতরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো: মাঈন উদ্দিন ভুঁইয়া (প্রশাসন) এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্দী পালানোর ঘটনায় খুলনা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্স সগীর মিয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মো: ইকবাল হোসেন ও বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার ফোরকান ওয়াহিদ। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো: রফিকুল ইসলামকে ঢাকার কারা অধিদফতরে এবং ডেপুুটি জেলার আবু সাদ্দাফকে চট্টগ্রামের ডিআইজি প্রিজন্স অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে। যদি কমিটির সুপারিশে বন্দী পালানোর ঘটনায় সিনিয়র জেল সুপার মো: সফিকুল ইসলাম খানের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৬ মার্চ ভোরে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়মিত বন্দী গণনার সময় একজন হাজতি কম পান। বারবার গণনার পরও যখন একজন বন্দী কম হচ্ছিল তখনই বিষয়টি জানানো হয় ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তাদের। একই সাথে বন্দীর সন্ধানে শুরু হয় পুরো কারাগারে তল্লাশি। বাজানো হয় পাগলা ঘণ্টা। পরে কারাগারের রেজিস্টার দেখে কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন, নিখোঁজ অথবা পলাতক ওই বন্দীর নাম রুবেল। সে একটি হত্যা মামলার আসামি। ১৫ নম্বর কর্ণফুলী নামক সেলে থাকতেন। বন্দী পালানোর ঘটনাটি কারা অধিদফতরে জানাজানি হলে কারা প্রশাসন বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। এরপরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এর আগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো: শফিকুল ইসলাম খান ও জেলার মো: রফিকুল ইসলাম ও কারা ডাক্তারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একজন বন্দীকে ভয়াবহ নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে। ওই বন্দীর স্ত্রী তার স্বামীকে নির্যাতন করার অভিযোগ করে কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই।
গতকাল চট্টগ্রাম কারাগারের বরাত দিয়ে ঊর্ধ্বতন এক কারা কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্দী রুবেল পালানোর ঘটনার পর পুরো কারাগারের প্রতিটি এলাকায় তাকে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি। ঘটনার যেহেতু ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে সেই হিসাবে তারা ধরে নিয়েছেন, যেভাবেই হউক রুবেল কারাগার থেকে পালিয়েছে। এখন কিভাবে পালিয়েছে সেটি সিসি ক্যামেরার সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তার সাথে যারা সেলে থাকত, যেসব কারারক্ষী ডিউটি করত তাদের সাথে কথা বললেই বের হয়ে আসতে পারে রুবেলের পালানোর উদ্দেশ্য। পাশাপাশি পুলিশ কারা কর্তৃপক্ষের দায়ের করা জিডির সূত্র ধরে আলাদাভাবে ঘটনাটির তদন্ত করে দেখছেন।
এ দিকে বন্দী পালানোর মাত্র কয়েকদিন আগে একজন হাজতিকে ইলেকট্রিক শকসহ নানাভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার, জেল সুপার, চিকিৎসকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এখন এ ঘটনার নেপথ্যে কী রয়েছে সেটি জানতে আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই কর্মকর্তা ছাড়াও কারাগারের সহকারী সার্জন ও সাতকানিয়ার মৌলভীর দোকান এলাকার রতন ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন করার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে কারা বিশ্লেষক ও সাবেক ডিআইজি প্রিজন্স মেজর (অব:) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার অভিজ্ঞতায় আমি কোনো দিন কারাগারের অভ্যন্তরে কোনো বন্দীকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে এমনটি শুনিনি এবং দেখিওনি। তারপরও যেহেতু এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে সেহেতু ঘটনার তদন্ত করলেই প্রকৃত কারণটি বের হয়ে আসবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো: শফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলেছি। তিনি আমাকে বন্দী নির্যাতন প্রসঙ্গে বলেছেন, ওই বন্দী উচ্চ ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন। তার অণ্ডকোষে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তাররা বলেছেন, তার (বন্দী) একটি ছোট অপারেশন করানো লাগতে পারে। বিষয়টি তিনি বন্দীর পরিবারকেও জানিয়েছিলেন। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বন্দী নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর একই কারাগার থেকে ৬ মার্চ একজন হত্যা মামলার আসামির পালানোর ঘটনা জানাজানি হয়েছে। এসব ঘটনা ঘটলে কারা প্রশাসনকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, আমার জানা মতে, নতুন আইজি প্রিজন্স অত্যন্ত ভালো মানুষ। এই মুহূর্তে দরকার তাকে কারা প্রশাসনের সবার সহযোগিতা করা। পাশাপাশি যারা দক্ষ কারা কর্মকর্তা আছেন তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে যথাযথ স্থানে দায়িত্ব দেয়া। তাহলে অপ্রীতিকর ঘটনার সংখ্যা কমে আসবে।



আরো সংবাদ