১৮ এপ্রিল ২০২১
`

মিয়ানমারে রাতভর তল্লাশির পর ভোরে রাস্তায় লাখো মানুষ

আটকাবস্থায় সু চির দলের ২ মুসলিম সদস্যকে হত্যা
-

মিয়ানমারে জান্তা কর্তৃপক্ষের দমনপীড়ন উপেক্ষা করেই সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে গতকাল রোববার লাখো জনতা রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। ইয়াঙ্গুনে জান্তাবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের খোঁজে নিরাপত্তা বাহিনীর রাতভর অভিযান সত্ত্বেও গতকাল ভোর হতেই রাস্তায় লাখো প্রতিবাদকারী নেমে আসে। ফেসবুকে পোস্ট করা ভিডিও অনুযায়ী, দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শান প্রদেশের লাশিও শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদুনে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছুড়েছে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, ঐতিহাসিক মন্দিরের শহর বাগানে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ছুড়েছে পুলিশ; তবে তারা তাজা বুলেট না রবার বুলেট ব্যবহার করছে তা পরিষ্কার হয়নি। সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আরো আধ ডজন শহরে বিক্ষোভ চললেও সেখানে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ আছে বলে জানা গেছে। এ দিন সবচেয়ে বেশি লোক জমায়েত হয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে। ভিডিওতে দেখা গেছে, এখানে আন্দোলনকারীরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহতদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করার পর অবস্থান ধর্মঘট করছেন। রয়টার্স।
১ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনী নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে আটক করার পর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে প্রতিদিন বিক্ষোভ ও ধর্মঘট হচ্ছে আর তা দমনে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এ পর্যন্ত ৫০ জনেরও বেশি লোককে হত্যা করেছে বলে জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে। মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দাউইর একজন আন্দোলনকারী নেতা জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘তারা মানুষকে পাখির মতো হত্যা করছে। তাদের বিরুদ্ধে যদি বিদ্রোহ না করি আমরা তাহলে কী করব? আমরা অবশ্যই বিদ্রোহ করব।’ বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনের অন্তত তিনটি এলাকায় জান্তাবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। রাতে সৈন্য ও পুলিশ শহরটির বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রবেশ করে গুলি ছোড়ে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা কিয়াকতাদা এলাকা থেকে অন্তত তিনজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে বলে সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন। কী কারণে এসব গ্রেফতার তা জানেন না তারা। সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) দলের কর্মী একজন আইনজীবীর খোঁজও করেছিল সৈন্যরা, কিন্তু তাকে খুঁজে পায়নি বলে ফেসবুকে জানিয়েছেন বিলুপ্ত পার্লামেন্টের সদস্য সিথু মং।
এসব গ্রেফতারের বিষয়ে পুলিশের কোনো মন্তব্য নিতে পারেনি রয়টার্স। মন্তব্যের অনুরোধ জানিয়ে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি সামরিক জান্তার একজন মুখপাত্র। ‘অ্যাসিসটেন্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স’ গোষ্ঠী জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত সর্বমোট এক হাজার ৭০০ জনকে গ্রেফতার করেছে জান্তা কর্তৃপক্ষ। তবে শুক্রবার রাতে কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে সংখ্যাটি জানাতে পারেনি তারা।
মিয়ানমারের অনেক নাগরিক ভারতে আশ্রয় চাইছে : এ দিকে রয়টার্স আরো জানিয়েছে, মিয়ানমারের অনেক নাগরিক দেশটির রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে চাইছে। শনিবার ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে অন্তত ৫০ জন সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সীমান্ত পার হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ আছেন আরো বেশ কয়েকজন। আধা সামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামে মিয়ানমারের আট পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৪৮ জন প্রবেশ করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ভারতে প্রবেশের জন্য আন্তর্জাতিক সীমান্তে অন্তত ৮৫ জন বেসামরিক নাগরিক অপেক্ষায় আছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তারা মিয়ানমারের সীমান্ত অতিক্রম করা পুলিশ ও কর্মকর্তারা সামরিক শাসকদের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ভারতের কাছে আট পুলিশ সদস্যকে ফেরত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পালিয়ে আসা পুলিশ সদস্যদের ফেরত দেয়ার আহ্বান জানিয়ে মিয়ানমারের পাঠানো চিঠি ও সীমান্ত পার হয়ে আশ্রয় নেয়াদের বিষয়টি মিলিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সব পক্ষের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি চীন : প্রতিবেশী মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে দেশটির সব পক্ষের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি চীন। গতকাল রোববার চীন সরকারের শীর্ষ কূটনীতিক স্টেট কাউন্সিলর ওয়াং ইয়ি এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বেইজিং কোনো পক্ষ নিচ্ছে না।
মিয়ানমারে ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিকে ‘চীন যেমনটি চেয়েছিল তেমন নয়’ বলে উল্লেখ করেছে চীন। অভ্যুত্থানের চীনের সংশ্লিষ্টতাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বলে আখ্যায়িত করেছে বেইজিং। এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়াং বলেন, উত্তেজনা নিরসনে মিয়ানমারের সব পক্ষের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত চীন। এর মূলভিত্তি হবে মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ইচ্ছা। চীন গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়।
পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারে সামরিক শাসনের তীব্র নিন্দা জানালেও চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক। দেশটির মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। চীনা কূটনীতিক আরো বলেন, মিয়ানমারের সব দল ও গোষ্ঠীর সাথে চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতির যতই বদল হোক না কেন চীন-মিয়ানমার সম্পর্কের অবনতি হবে না। এই সম্পর্কে চীনের সহযোগিতা পরিবর্তন হবে না।
সু চির দলের ২ মুসলিম সদস্যকে আটকাবস্থায় হত্যা : সামরিক অভ্যুত্থানে মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) দলের দুই মুসলিম সদস্যকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে আটকাবস্থায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল রোববার ওই দুই এনএলডি সদস্যের পরিবার এ তথ্য জানায়। খবর আনাদোলু এজেন্সির। এর আগে শনিবার রাতে মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনের বিভিন্ন স্থান থেকে এনএলডির দলীয় বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে নিরাপত্তা বাহিনী। সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে এই গ্রেফতারি অভিযানে এনএলডি দলীয় মুসলিম সদস্য খিন মঙ লাট ও শেইন উইনকে গ্রেফতার করা হয়।
খিন মঙ লাট ইয়াঙ্গুনের পাবেডান টাউনশিপের এবং শেইন উইন হ্লাইঙ্গ টাউনশিপের এনএলডি দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রোববার সকালে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের পরিবারকে দু’জনেরই মৃত্যুর খবর জানিয়ে বলেন, তাদের লাশ ইয়াঙ্গুনের সামরিক হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
আনাদোলু এজেন্সির কাছে শেইন উইনের পরিবারের এক সদস্য জানান, নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আনাদোলুর সাথে ফোনালাপে তিনি বলেন, ‘তার পুরো শরীরে রক্ত মাখা ছিল। আমরা বিশ্বাস করছি, তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।’
২০২০ সালে নির্বাচনে জয়ী এনএলডি দলীয় মুসলিম পার্লামেন্ট সদস্য সিথু মঙ সামরিক হাসপাতাল থেকে খিন মঙ লাটের লাশ তার পরিবারের হাতে হস্তান্তরের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘তিনি শক্তসামর্থ্য ও স্বাস্থ্যবান লোক ছিলেন যিনি নির্যাতনে মারা গেছেন।’ রোববার ইয়াঙ্গুনে জানাজার পর খিন মঙ লাটকে দাফন করা হয়। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতায় দেশটিতে অন্তত ৬৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্য দিকে অভ্যুত্থানের পর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে।
ইমেজ উদ্ধারে ইসরাইলি লবিস্ট নিয়োগ : ইসরাইলের সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার। পশ্চিমে নিজেদের পরিচ্ছন্ন ইমেজ তুলে ধরা এবং সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমতাধর দেশগুলোর সাথে আলোচনা করাই হবে তার কাজ।
জান্তা সরকারে নিয়োগ পাওয়া লবিস্ট আরি বেন- মেনাশে ইসরাইলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। একই সাথে তিনি কানাডারও নাগরিক। মেনাশে বলেছেন, জেনারেলরা রাজনীতি ছাড়তে আগ্রহী। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটাতে চায়। একইসাথে চীনের সাথে দূরত্ব বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য যেসব দেশ জেনারেলদের ‘ভুল বুঝেছে’ তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য মেনাশে ও তার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জিম্বাবুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে এবং সুদানের সেনাশাসকদের লবিস্ট হিসেবে কাজ করা আরি বেন-মেনাশে নামে ইসরাইলের সাবেক ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো বলেছেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়া সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও মিয়ানমারের জেনারেলরা আগ্রহী।
গতকাল রোববার রয়টার্সকে দেয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বেন-মেনাশে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য যেসব দেশ মিয়ানমারের জেনারেলদের ‘ভুল বুঝেছে’ তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠান ডিকেন্স অ্যান্ড ম্যাডসন কানাডাকে নিয়োগ দিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জেনারেলরা।
রয়টার্স এ বিষয়ে জানতে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের এক মুখপাত্রকে ফোন করলে কোনো সাড়া পায়নি। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক জবাব আসেনি। বেন-মেনাশে আরো জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন নিয়ে সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনার ওপর সমর্থন পেতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে যোগাযোগ করার দায়িত্বও তাকে দেয়া হয়েছে। বেন-মেনাশের ভাষ্য অনুযায়ী জান্তা সরকার নাকি প্রমাণ করতে পারবে যে গত নভেম্বরের নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তবে তিনি এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি।



আরো সংবাদ