১৯ এপ্রিল ২০২১
`

চর দখলের মতো আইআইইউসি দখলের হীন প্রচেষ্টার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ সভাপতি
-

দেশের প্রচলিত আইনকানুুনের তোয়াক্কা না করে সংসদ সদস্য হওয়ার সুবাদে প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে চর দখলের মতো দেশের অন্যতম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইআইইউসি দখলের হীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক শিক্ষক। আইআইইউসির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নিয়ে গঠিত বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডই এই বিশ^বিদ্যালয়ের আইনসিদ্ধ বৈধ পর্ষদ বলে উল্লেখ করেন আইআইইউসি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি আ ন ম শামসুল ইসলাম।
গতকাল শনিবার বিকেলে আইআইইউসি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ওই শিক্ষকের এহেন বাড়াবাড়ির মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে দেশের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ^বিদ্যালয়কে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। একই সাথে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আইআইইউসির বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের সুদক্ষ পরিচালনায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় চট্টগ্রাম ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে দীর্ঘ ২৬ বছরে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে বিশ^বিদ্যালয়ে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে যার মধ্যে প্রায় ২০০ বিদেশী শিক্ষার্থী রয়েছে। এ বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামীদামি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। স্কোপাস ড্যাটাবেজ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণায় এ বিশ^বিদ্যালয় বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে পঞ্চম এবং চট্টগ্রামে প্রথম স্থানে রয়েছে। বর্তমানে এ বিশ^বিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন ৩৫০ জন শিক্ষকসহ পাঁচ শতাধিক শিক্ষক রয়েছেন, তন্মধ্যে ১০১ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। বিশ^বিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। বিগত দিনে এ বিশ^বিদ্যালয়কে সেশন জটের শিকার হতে হয়নি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে কখনোই বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ থাকেনি।
এতে বলা হয়, গত ৪ মার্চ বেশ কয়েকটি দৈনিকে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) এর নতুন ট্রাস্টি বোর্ড অনুমোদনে কৃতজ্ঞতা’ শিরোনামে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় চট্টগ্রাম ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দেশ বরেণ্য আলেম বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্মানিত পীর মরহুম মাওলানা শাহ মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার (র:) এর সুযোগ্য সন্তান বায়তুশ শরফের বর্তমান সম্মানিত পীর মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভীর নাম ব্যবহার করে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। আইআইইউসি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের পক্ষ থেকে আমরা ৫ মার্চ বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভীর নাম ব্যবহার করে প্রচারিত ওই বিভ্রান্তিকর ও বেআইনি বিবৃতির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছি। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী গতকাল শনিবার বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় দেয়া বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন বোর্ড অব ট্রাস্টিজ অনুমোদনের যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা সত্য নয়। আইনানুযায়ী গঠিত একটি ট্রাস্ট কর্তৃক এই বিশ^বিদ্যালয় পরিচালিত হয়ে আসছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস সময়ে সময়ে এ বিশ^বিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের সার্বিক কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। ট্রাস্ট দলিল, ট্রাস্ট আইন ১৮৮২, সোসাইটিজ রেজি: আইন-১৮৬০, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আইন ১৯৯২, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আইন ২০১০ এর বিধিবিধান পুরোপুরি মেনেই স্বনামধন্য এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সার্বিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। আইআইইউসির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নিয়ে গঠিত বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডই এই বিশ^বিদ্যালয়ের আইনসিদ্ধ বৈধ পর্ষদ।
সংবাদ সম্মেলনে শামসুল ইসলাম বলেন, প্রফেসর আবু রেজা নদভী তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, এত দিন স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে আইআইইউসি পরিচালিত হয়েছে। তিনি তো দীর্ঘদিন যাবৎ এই বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তিনি এই বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের পাশে বসে কাজ করেছেন। বিদেশ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্বে ছিলেন। যুক্তির খাতিরে আমাদের প্রশ্ন- তখন আমরা যদি স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর হয়ে থাকি, তাহলে তিনি কী ছিলেন? জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আবু রেজা এমপি প্রতিষ্ঠিত আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। ড. আবু রেজা নদভী জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আজম প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র নিয়ে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকে আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের জন্য অর্থ কালেকশন করেছেন। সুতরাং স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ ইস্যু এনে তিনি চাতুর্যের সাথে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছেন। এছাড়া আপনারা জানেন, প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী এই বিশ^বিদ্যালয়ে কর্মরত একজন শিক্ষক (এমপ্লয়ি)। একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ তথা ট্রাস্টি বোর্ডের দায়িত্বে আসার আইনগত কোনো সুযোগ নেই।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ক্লিয়ারেন্স, আইন ও বিধিবিধানের যথার্থ অনুসরণ করেই সরকার এই বিশ^বিদ্যালয় এবং বোর্ড অব ট্রাস্টিজের অনুমোদন দিয়েছে। বিগত ২৫ বছরে কোনো গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের কোনো মহল থেকে বিশ^বিদ্যালয় অথবা বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বিষয়ে কোনোরূপ অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। এছাড়া রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের মাধ্যমে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠন বা বিলুপ্তকরণের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হয়। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয়। যথাযথ আদালতের মাধ্যমেও তা হতে পারে। যেকোনো ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই কোনো রকমের প্রমাণিত অভিযোগ ছাড়া, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলেই কি জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য একটি বিশ^বিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ভেঙে দিতে পারে? বিবেকবান সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এটি আমাদের প্রশ্ন। বিগত দু-তিন দিন যাবৎ টেলিফোনে এবং বাসায় ডেকে নিয়ে ড. আবু রেজা বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদেরকে হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন, পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার ও হয়রানির ভয় দেখাচ্ছেন। তার এহেন বাড়াবাড়ির মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে দেশের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ^বিদ্যালয়কে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, এতে সরকারের ভাবমূর্তিই ক্ষুণœ হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। সংবাদ সম্মেলনে শামসুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ড. আবু রেজা নদভী সংসদ সদস্য হওয়ার সুবাদে স্বাধীনতাবিরোধী ইত্যাদি ধুয়া তুলে ন্যক্কারজনকভাবে প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জোর করে আইআইইউসি দখলে নিয়ে এটিকে ধ্বংস করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। প্রতিহিংসা ও লোভ-লালসার বশবর্তী হয়েই তিনি এরকম জঘন্য খেলায় মেতেছেন।
এভাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চর দখলের মতো দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি বিশ^বিদ্যালয় দখলের এই প্রচেষ্টা রুখতে চট্টগ্রাম তথা দেশ ও জাতীয় স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং চট্টগ্রামবাসীর প্রাণপ্রিয় আইআইইউসি’কে রক্ষায় আমরা সবার সহযোগিতা কামনা করছি।
প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন, ৮ শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্মজীবন রক্ষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়কে রক্ষার স্বার্থে আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের বক্তব্য জাতির সামনে তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছি।



আরো সংবাদ