১৮ এপ্রিল ২০২১
`

মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপের আহ্বান ঢাকার

-

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চাপ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত শুক্রবার মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক নিউলাইনস ইনস্টিটিউটে রোহিঙ্গা বিষয়ক এক আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সাথে সাম্প্রতিক টেলিফোন আলাপকালেও ড. মোমেন একই আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তরপর্বে করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিস্তারিত তুলে ধরেন ড. মোমেন। এছাড়া ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি। রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য বাইডেন প্রশাসনকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়ভাবে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নেয়ার জন্য মন্ত্রী অনুরোধ করেন।
মার্কিন প্রশাসনকে রোহিঙ্গা বিষয়ক একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এ ইস্যুতে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আশা করছে বাংলাদেশ।
এছাড়া কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির বিষয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ কিভাবে করোনা মহামারী সামাল দিচ্ছে তার ওপর আলোকপাত করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সাথে সম্প্রতি টেলিফোন আলাপের প্রসঙ্গ টেনে ড. মোমেন দুই দেশের বর্তমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সম্পর্ক কৌশলগতপর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তৈরী পোশাকে শুল্ক সুবিধা দাবি : এদিকে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সাথে জলবায়ু, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় বাংলাদেশ। এছাড়া মার্কিন ভোক্তা ও এদেশের নারী শ্রমিকদের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরী পোশাক রফতানিতে তিন বছরের শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়েছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্র সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন মার্কিন চেম্বারস অব কমার্সের সাথে আলাপকালে এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বাইডেন প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। সফরের তৃতীয় দিন গত বৃহস্পতিবার তিনি মার্কিন চেম্বারস অব কমার্স ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত জন ক্যারি ও মার্কিন আইন প্রণেতাদের সাথে বৈঠক করেন। মার্কিন চেম্বারস অব কমার্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (দক্ষিণ এশিয়া) নিশা দেশাই বিসওয়াল ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরেন। আলোচনায় আরো অংশ নেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের উপসহকারী মন্ত্রী লারা স্টোন। এছাড়া জ্বালানি, ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স, ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক সেবা, স্বাস্থ্য সেবা, প্রতিরক্ষা ও অ্যারোস্পেস খাতের করপোরেট নেতারা এতে যোগ দেন।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জোরালো অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানান। তিনি বাংলাদেশের পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প, আটোমোবাইল, হালকা প্রকৌশল, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকে স্বাগত জানান।
জন ক্যারির সাথে বৈঠক : জন ক্যারি জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত পরবর্তী বৈশ্বিক সম্মেলন কপ-২৬ লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সামনে শেষ সুযোগ। এই লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ক্যারি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তেমন পরিমাণে দায়ী নয়, এমন অনেক দেশকেই এর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আর্থিকপ্রতিষ্ঠানগুলোর আরো ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তুচ্যুত সওয়ার জন্যই গুরুতর নিরাপত্তা ইস্যু হয়ে দেখা দেবে- এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে একমত পোষণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা। উভয়ে কপ-২৬সহ বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ব্যাপারে একমত হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যারিস চুক্তিতে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জন ক্যারির ভূমিকা স্মরণ করেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে আসার নতুন মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান ড. মোমেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোসহ বর্তমান সরকারের হাতে নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন।
আইনপ্রণেতাদের সাথে বৈঠক : ওয়াশিংটন সফরকালে সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড মারকি (ডেমোক্র্যাট), কংগ্রেসম্যান মাইকেল ম্যাকুল (রিপাবলিকান) ও কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগোভার্নের (ডেমোক্র্যাট) সাথে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় ড. মোমেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মার্কিন আইনপ্রণেতারা ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের ভূমিকাকে সাধুবাদ জানান। বাংলাদেশের ওপর এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর চাপ নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সহায়তা চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আন্দামানে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য নই : আন্দামান সাগর থেকে ভারতীয় কোস্টগার্ডের উদ্ধার করা ৮১ জন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ বাধ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী নাগরিক নয়। তারা মিয়ানমারের নাগরিক। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানার এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে তাদের পাওয়া গেছে। আর এ কারণেই তাদের নেয়ার জন্য আমাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। গতকাল ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সব কথা বলেন।
ড. মোমেন রয়টার্সকে বলেন, বাংলাদেশ আশা করে উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভারত অথবা মিয়ানমার গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) উচিত উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেয়া। কারণ ওই নৌকার ৪৭ জনের কাছে বাংলাদেশে অবস্থিত ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের পরিচয়পত্র ছিল।



আরো সংবাদ