০৭ মার্চ ২০২১
`

গ্রামভিত্তিক প্রত্যাবাসনে অসম্মতি মিয়ানমারের

জুনের আগেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সূচনা চায় বাংলাদেশ # গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চীনের আহ্বান
-

আগামী জুনের মধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় বাংলাদেশ। তবে এ ক্ষেত্রে আগের দুই ব্যর্থ প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের আস্থায় নিয়ে অগ্রসর হতে চায় সরকার। আর এ জন্য রোহিঙ্গাদের গ্রাম বা এলাকাভিত্তিক প্রত্যাবাসন, রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান, চীন, ভারত ও সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেসামরিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি চেয়েছে বাংলাদেশ।
আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিষয়ক বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের ত্রিপক্ষীয় ফোরামের মহাপরিচালক পর্যায়ের যৌথ কার্যকরী গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক এবং শেষ সপ্তাহে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সুবিধাজনক সময়ে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হবে। এ সব বৈঠকে রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ।
গতকাল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় ভার্চুয়াল বৈঠকে এ সব বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মিনিস্টার হু ডু সান। আর চীনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার লিও জাওহু। বেলা ২টা থেকে শুরু হওয়া বৈঠক চলেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের দেয়া ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, করোনা মহামারী ও মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হচ্ছিল না। বাংলাদেশের অনুরোধে চীন পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের আজকের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। তাই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হওয়াটাই একটা অগ্রগতি। কেননা এতে আলোচনা করে একটা সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, বৈঠকে নতুন কোনো ইস্যু অন্তর্ভুক্ত না করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির বাস্তবায়ন এবং দ্রুততার সাথে প্রত্যাবাসন শুরু করতে সব পক্ষ একমত হয়। এতে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে জেডব্লিউজির বৈঠক ভার্চুয়ালি আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জেডব্লিউজির বৈঠকে সাধারণত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এবং মিয়ানমার ও চীনের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা থাকেন। তবে আগামী মাসের বৈঠকে মিয়ানমার ও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকরাও থাকবেন।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকদের মধ্যে একটি হটলাইন চালু করা হবে। এ ছাড়া প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে মিয়ানমার।
এ দিকে গতকাল চীনের দূতাবাস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ভাইস মিনিস্টার লিও জাওহু জানিয়েছেন যে, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতা করছে চীন। বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে চীন আলোচনার বিভিন্ন পথ খুলে দুই দেশকে কাছে আনার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক, পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক এবং জেডব্লিউজি বৈঠক। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সুযোগ সৃষ্টিতেও চীন সহায়তা করছে। তিনি বলেন, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বিষয়টি মূলত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। এই সমস্যার টেকসই সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও সংলাপকেই অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বিষয়টি আরো জটিল না করে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা। উন্নয়ন হলো এই ইস্যু সমাধানের মৌলিক পথ। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ইতিবাচক ফল দেখে চীন আনন্দিত। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতার জন্য চীন রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের করোনা টিকা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন।
ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমারকে আগের চেয়ে কিছুটা নমনীয় মনে হয়েছে। এর পেছনে চীনের ভূমিকা থাকতে পারে। জুনের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার ব্যাপারে আমি সতর্কভাবে আশাবাদী। তিনি বলেন, রাখাইনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতির ব্যাপারে চীন গঠনমূলক ভূমিকার ওপর জোর দিলেও মিয়ানমার কোনো কথা বলেনি। কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে রোহিঙ্গারা রাখাইন যেতে আগ্রহী হবে না। প্রত্যাবাসনের ওপর আস্থা বাড়াতে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সাথে মতবিনিময়ের জন্য আমরা মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। মিয়ানমারকে আশ্বস্ত করা হয়েছে মতবিনিময়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রাখাইনে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
রাখাইনে অনুকূল পরিবেশের প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে মন্তব্য করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, কেননা স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের সাথে বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এ জন্য রোহিঙ্গাদের বোঝাতে হবে। কিছু স্বার্থন্বেষী মহল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় না। তাদের শক্তভাবে দমন করতে হবে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের চার পাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ শেষ হলে নিরাপত্তা আরো জোরদার করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, রাখাইনে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মিসহ (আরসা) অন্য গ্রুপগুলোর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছে মিয়ানমার। তারা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও চরমপন্থীদের তৎপরতার অভিযোগ এনেছে। এ জন্য তারা সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের উদারহণ দিয়েছে।
মাসুদ বিন মোমেন বলেন, রোহিঙ্গাদের আস্থায় আনতে বাংলাদেশ গ্রাম বা এলাকাভিত্তিক প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করলেও মিয়ানমার তাতে সম্মতি দেয়নি। তারা ইতঃপূর্বে যাচাই-বাছাই করে দেয়া ৪২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা থেকেই প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়। তবে চীন এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যুক্তিটা বুঝতে পেরেছে। জেডব্লিউজি বৈঠকে বিষয়টি আবার উত্থাপন করা হবে।
রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে চীন যাতে ভুল না বোঝে তার জন্য ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতের সাথে গত সোমবার তার আলাদাভাবে কথা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব।
সীমিত আকারে হলেও বাংলাদেশ যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় উল্লেখ করে মাসুন বিন মোমেন বলেন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। কিন্তু এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যা দ্রুততার সাথে বাড়ছে। গত তিন বছরে ক্যাম্পে ৯০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে।

 



আরো সংবাদ