০৭ মার্চ ২০২১
`

অভিবাসীদের বৈধ করতে ৮ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা বাইডেনের

অভিষেকের আগে অভ্যন্তরীণ হুমকির ইঙ্গিত নেই : পেন্টাগন প্রধান ; ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্পের নির্দেশ থাকছে না ; ফের ঐক্যের ডাক বাইডেনের ; ক্যাপিটল হিলের অদূরে আগুন ; ট্রাম্পের ফোন রেকর্ড শুনতে চান হিলারি
-

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনই জো বাইডেন নতুন অভিবাসন আইনের প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা করেছেন, যা বাস্তবায়িত হলে সে দেশে বসবাসরত এক কোটি ১০ লাখ অনিবন্ধিত অভিবাসীর আট বছরের মধ্যে বৈধ হওয়ার পথ খুলবে। আর এর মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি বদলে দিতে জো বাইডেনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে বলে এপি ও ওয়াশিংটন পোস্ট’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আজ বাইডেনের অভিষেকের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঝঞ্ঝামুখর চার বছরের মেয়াদের ইতি ঘটতে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব নীতি বদলে ফেলা হয়েছিল, সেগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর আগে থেকেই দিয়ে আসছিলেন বাইডেন। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিবাসনের নিয়ম বদলাতে তৎপর হন রিপাবলিকান ট্রাম্প। সে সময় সাতটি মুসলিম প্রধান দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে মোট ১৩টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র সফরে কড়াকড়ি চলছে। তার উত্তরসূরি বাইডেন দায়িত্বের প্রথম দিনই সাত মুসলিম দেশের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে নতুন নির্বাহী আদেশ দেবেন বলে তার হবু চিফ অব স্টাফ রন ক্লেইন আগেই জানিয়েছিলেন।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের যে কাজ শুরু করেছিলেন, তা আর এগিয়ে নেয়া হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাইডেন। তার বদলে সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাইডেন ‘স্মার্ট বর্ডার এনফোর্সমেন্টে’ অর্থ ব্যয় করবেন। বন্দর ও সীমান্তের প্রবেশ পথগুলোতে স্ক্রিনিং জোরদার করতে তহবিল জোগাবেন। বাইডেনের নতুন অভিবাসন আইনের প্রস্তাব আজই কংগ্রেসে পাঠানো হবে। মধ্য আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী অভিবাসনের মূল কারণগুলো খতিয়ে দেখার ওপর জোর দেয়া হবে সেখানে।
বাইডেন ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের নতুন অভিবাসন নীতির কেন্দ্রে থাকবে আট বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনিবন্ধিত তবে যোগ্য অভিবাসীদের পাঁচ বছরের জন্য একটি অস্থায়ী অনুমতি দেয়া হবে। এর মধ্যে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত কর দেয়াসহ অন্যান্য শর্ত পূর্ণ করা হলে পাঁচ বছর পর তাদের গ্রিন কার্ড দেয়া হবে। এর তিন বছর পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অন্তত চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে যারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তারাই ওই আবেদনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।
শৈশবে যারা যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন, তারা ড্রিমার্স অ্যাক্টের আওতায় এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বা দুর্দশায় থাকা দেশ থেকে আসা নাগরিকরা টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস প্রোগ্রামের আওতায় এখনই গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্পের নির্দেশ থাকছে না : ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশ আর খাটছে না। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশির ভাগ দেশ এবং ব্রাজিলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মুখপাত্র জেন সাকি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার আদেশ দিলেও বাইডেন প্রশাসন ওই নিষেধাজ্ঞা জারি রাখবে। গত সোমবার হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে এক ডিক্রি জারি করা হয়। ওই ডিক্রি অনুযায়ী, আগামী ২৬ জানুয়ারি অর্থাৎ বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় দিন পর ওই বিধিনিষেধ উঠে যাবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু বাইডেনের মুখপাত্র জেন সাকি এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সময় এখন নয়।
অভিষেকের আগে অভ্যন্তরীণ হুমকির ইঙ্গিত নেই : পেন্টাগন প্রধান : যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অভিষেকের আগে অভ্যন্তরীণ হুমকির কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির অস্থায়ী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস্টোফার মিলার। পেন্টাগনের (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়) এই অস্থায়ী প্রধান সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টে জো বাইডেনের অভিষেক ঘিরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলের সুরক্ষায় সহায়তা করতে ২৫ হাজারেরও বেশি ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের ব্যাকগ্রাউন্ড পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে আর এই কাজে এফবিআই সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করছে।
বিবিসি জানিয়েছে, বড় ধরনের নিরাপত্তা জোন ঘোষণা করে সেখানে জনসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বেয়ে ওঠা যাবে না এমন নিরাপত্তা বেড়া দিয়ে এগুলোর ওপর কাঁটাতার লাগানো হয়েছে। সোমবার ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম ডানপন্থী উগ্রবাদীরা ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য সেজে উপস্থিত থাকার বিষয়ে আলোচনা করেছে, এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে এফবিআই।
ক্যাপিটল হিলের অদূরে আগুন : যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা মহড়ার সময় সোমবার ক্যাপিট হিলের কিছুটা দূরে অবস্থিত একটি অস্থায়ী তাঁবুতে আগুন লাগে। এরপর সাময়িকভাবে ক্যাপিটল হিলকে বন্ধ রাখা হয়। নিউইয়র্ক পোস্ট ও বিবিসি নিউজের খবরে এ কথা জানানো হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত সতর্ক বার্তার কারণে আগেই প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানের মহড়া বাতিল করা হয়েছে। তবে এ অনুষ্ঠানের অন্যান্য অংশের মহড়া চলছিল। আগুনের খবরে মহড়ায় অংশগ্রহণকারীদের ক্যাপিটল থেকে বাইরে বের করে নিরাপদ জায়গায় নেয়া হয়। যদিও তাঁবুতে কেউ ছিল না। ওই আগুনে বিপুল ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়াশিংটন ডিসির অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলেন।
ঐক্যের ডাক বাইডেনের : ফের ঐক্যের ডাক দিলেন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সোমবার মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস উপলক্ষে বাইডেন এই আহ্বান জানান। বাইডেন নিজ শহর ডেলাওয়ার থেকে ফিলাডেলফিয়ায় দাতব্য কাজে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস পালন করেন। বলা হচ্ছে, চার বছরের বিভক্তি শেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াসের এটি একটি প্রতীকী উদ্যোগ। এ উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় বাইডেন বলেন, আমাদের ভালোবাসার দেশটিকে নিরাপদ, ঐক্যবদ্ধ ও পুনর্গঠন করার কাজ শুরুর এখনই উপযুক্ত সময়।
তবে ৭৮ বছরের জো বাইডেন যতই ক্ষত নিরাময় ও আশার কথা শোনান না কেন বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতার প্রথম দিন থেকেই তাকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কঠিন সঙ্কটগুলো মোকাবেলা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে, টিকা দান কর্মসূচি প্রতিনিয়ত হোঁচট খাচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চ্যলেঞ্জ। এ দিকে ৬ জানুয়ারি পার্লামেন্ট ভবনে সশস্ত্র হামলার ঘটনার পর থেকে অনেকটাই নীরব রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এখনো পর্যন্ত নির্বাচনে তার পরাজয় স্বীকার কিংবা জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানাননি। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্য অনুযায়ী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট নতুন প্রেসিডেন্টকে ওভাল অফিসে চা চক্রে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানান। ট্রাম্প এ ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙেছেন। এ ছাড়া বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে না থাকার ঘোষণাও তিনি আগেই দিয়েছেন। এ দিকে সোমবার প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার জনপ্রিয়তার রেকর্ড সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছেন। আর কোনো বিদায়ী প্রেসিডেন্ট এত কম জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেননি।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্পের সর্বশেষ কিছু সিদ্ধান্তের ঘোষণা মঙ্গলবার হতে পারে। তিনি বেশকিছু দোষী সাব্যস্ত অপরাধীকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন। এমনকি তিনি নিজে ও তার সন্তান যারা হোয়াইট হাউজে উপদেষ্টা ও নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেছেন তাদেরও ক্ষমা করবেন বলে জল্পনা রয়েছে। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ক্ষমা করা হবে এরকম এক শ’ লোকের তালিকা ট্রাম্পের কাছে রয়েছে। এ দিকে বুধবার সকালেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ছেড়ে ফ্লোরিডায় মার এ লাগো গলফ ক্লাবে তার নিজ বাড়িতে চলে যাবেন। বলা হচ্ছে ট্রাম্প সকালেই যাচ্ছেন। কারণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ মুহূর্তের সুযোগটুকু তিনি নিতে চাচ্ছেন।
ট্রাম্পের ফোন রেকর্ড শুনতে চান হিলারি : ক্যাপিটল ভবনে দাঙ্গার সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন আগে থেকেই জানতেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সাথে কথোপকথনে এমনটি বলেছেন হিলারি। এ সময় হিলারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোন রেকর্ড শোনার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের খবরে এসব কথা জানানো হয়েছে।

 



আরো সংবাদ